মো: আকতার হোছাইন কুতুবী ॥


প্রসঙ্গ বিশ্ব সুন্দরী উলঙ্গ হয় লক্ষ নারী হায়রে সংস্কৃতি এই দুনিয়াটা আসলেই আজব কারখানা। একজন বিশ্ব সুন্দরী নির্বাচিত করার জন্য উলঙ্গ হতে হয় লক্ষ লক্ষ নারীকে। তেমনি আমাদের স্বাধীন সার্বভৌমত্ব দেশ, যে দেশটিতে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলায় ভরপুর সেই দেশের সুদর্শন নারীরাও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বিশ্ব সুন্দরী নির্বাচিত হওয়ার জন্য তাতে আমার কোন আপত্তি নেই, থাকার কথাও না। আমি নিজেও সংস্কৃতিমনা একজন রোমান্টিক চিন্তুক। সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিই অনেকটা বেশি। কারণ লেখালেখির অভ্যাসও আছে তো? আগে বলতে ভালবাসতাম, পড়তেও ভালবাসতাম বিখ্যাত সাহিত্যিকদের লেখা। এখন কেমন জানি কিছু সত্য কথা লিখতে মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠে। তবে এই নয় যে, যে মায়ের গর্ভ থেকে আমরা জন্ম নিয়েছি সে নারী জাতিকে অশ্রদ্ধা, অসম্মান ও কটু দৃষ্টিতে এ জাতি সমাজ দেখবে। আমরা একটা স্বকীয়তার মাঝে বেড়ে উঠেছি। সবাই চাই ধাপে ধাপে নিজের মেধা, সৌন্দর্য ও যোগ্যতাকে কাজে লাগানোর জন্য। কেউ সফল হয়, আবার কেউ পিছিয়ে পড়ে সবকিছু থাকার পরও। নিন্দুকরা সেটাকে ভিন্নভাবে দাঁড় করানোর জন্য বলে থাকেন নিজের দেহকে বিলিয়ে দিয়ে অনেকেই উচ্চাসনে আসীন হওয়ার জন্য। আমি সেটাতে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করি। কারণ সব নারী কিন্তু এক নয়। কিছু নারী হয়তো রাতারাতি বিশ্ব সুন্দরী ও নায়িকা হওয়ার জন্য নিজের দেহকে মানুষরূপী কিছু বাঘ, ভাল্লুক, কুকুর, বিড়ালকে বিলিয়ে দেয়, তা তো মেনে নেয়া যায় না। সভ্য সমাজে অসভ্যদের রং তামাশা দেখলে শরীরটা কেমন জানি শিউরে উঠে। অনায়াসে উপরে উঠার সিঁড়িকে টপকিয়ে মুকুট পড়ার জন্য অনেকেই আবার তার সবকিছু বিলিয়ে দিচ্ছে ওই মানুষরূপী হায়েনাদেরকে। পুরুষ শাসিত এই সমাজে অনেক পুরুষই আছেন সুন্দরীদের পুজারী।
সংস্কৃতির কতটা নৈতিক অধঃপতন হলে, শুধুমাত্র অন্তর্বাস পরে সমগ্র পৃথিবীর ৬শ কোটি মানুষের সামনে উলঙ্গ হতে হয় এদেশের নারীকে। তরুণীরা রেজিস্ট্রেশন করে ! এই তরুণীদের পরিবার চান, তাদের মেয়ে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করুক! তাদের মেয়ে পণ্যদাসী হিসেবে বিক্রীত হোক। সংক্ষিপ্ত রাস্তা ধরে খ্যাতি আর অর্থ উপার্জন করার জন্য কর্পোরেট যৌন দাসী হোক ! বাংলাদেশে এদের লাইফস্টাইল, পার্টি, বিয়ে, ডিভোর্স, বিলাসী জীবন আর সবশেষে বেশিরভাগেরই আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়া দেখেও কোটি মেয়ের লালিত স্বপ্ন এখন মিডিয়ার রঙ্গমঞ্চে নিজেকে অন্যের বিনোদনের খোরাক বানানো।

গত বছর বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল জান্নাতুল নাঈম এভ্রিল নামধারী (আমেনা)। তাকে ৮ কোটি বাঙালি নারী আর ২৫ হাজার আগ্রহী প্রার্থী থেকে বাছাই করে জান্নাতুল নাইম এভ্রিল নামের এই মেয়েকে বিজয়ী বানিয়ে পাঠানো হচ্ছিল বাংলাদেশের পতাকা বিশ্বের দরবারে বহন করার জন্য !! এই মেয়ের তো গুণের সীমা পরিসীমা লিখে শেষ করা যাবে না ! – মিসেস হয়ে অংশ নিয়েছিল মিস বাংলাদেশ হবার জন্য -তার সাথে দরিদ্র বাবা-মা কিংবা এই কৃষক পরিবারের সাথে কোন সম্পর্ক ছিল না। এভ্রিল বিভিন্ন ভাবে প্রচুর টাকার মালিক হলেও পরিবারের খবর নেয়নি। তার বাবা গত বছর বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতার সময় বলেছিলেন, এই মেয়ের সাথে সম্পর্ক রাখেননি এবং ভবিষ্যতেও রাখবেন না। তাকে মেয়ে হিসাবে স্বীকার করেন না। – মিস বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় ফর্ম পূরণ করেছিল নিজের পরিচয় লুকিয়ে। বাবা সিঙ্গাপুরে থাকেন, ঢাকায় বাড়ি গাড়ির মালিক আর ভাই বড় ব্যবসায়ী এই মিথ্যা তথ্য দিয়ে। – ম্যাট্রিকের পর সৎ কাপড়ের ব্যবসায়ীকে বিয়ে করলেও উচ্চাকাক্সক্ষী এভ্রিল সংসার করেছে মাত্র আড়াই মাস। নিজেই বাবার বাড়ি যাবার নাম করে পালিয়ে গিয়েছিল। তারপর একটা ১৭/১৮ বছর বয়সী মেয়ে স্বামীকে চাপ প্রয়োগ করে নিজেই ডিভোর্স নিয়েছিল। এই ৩/৪ বছর ঢাকায় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে মিডিয়াতে প্রতিষ্ঠিত হবার জন্যই এতসব চেষ্টায় মেতে উঠেছিল। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী বিয়ের আগে পরে বহু অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছে স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সাক্ষ্য অনুযায়ী চট্টগ্রামের একটা হোটেল রেইডে অনৈতিক কাজে গ্রেফতার হয়েছিল। জানাজানি হবার পর সাংবাদিকরা বিয়ের গুজব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে এভ্রিল বলেছিলেন, সব মিথ্যা। বিয়ে হয়নি। এদিকে বিয়ের ছবি, ভিডিও আর কাবিননামা সব পত্রিকায় ভাইরাল। একজন মিথ্যাবাদী, প্রতারক, উচ্চাভিলাষী, অল্প শিক্ষিত আর চরিত্রহীন মেয়ে হল কিনা বাংলাদেশের সেরা মেয়ে !! আর তাকে নির্বাচিত করতে চেয়েছিলেন এদেশের বিখ্যাত সব কর্পোরেট হাউজ আর বাছাই করা সেলিব্রেটি বিচারকরা! মিস বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা আসলেই কি বাংলাদেশের সংস্কৃতি, আচার আচরণ আর শিল্পকে প্রতিনিধিত্ব করে? পত্রিকায় ছাপা হওয়া পোশাকে ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় দেখানো হয়। তাতে বাংলাদেশের কোন ছাপ নেই, অনেক খোলামেলা, উন্মুক্ত শরীরের প্রদর্শনী। ফাইনালের ফলাফলেও উল্টাপাল্টা ঘোষণা করে অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলো আয়োজক অন্তর শো বিজ আর অমিকন এন্টারটেইনমেন্ট। মনে হয়েছিল এভ্রিলকে বিজয়ী করার জন্যই যেন সব ওলট-পালট করা হয়েছিল। সে সময় বিচারক শম্পা রেজা বলেছিলেন, বিচারকদের ফল উলটে দেয়া হয়েছে। আয়োজকরা ৩ মাস সময় পেয়েও বাছাই করা মেয়েদের ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফাই করতে পারেননি এটা অবিশ্বাস্য। এই প্রতিযোগিতা তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। পুরো প্রোগ্রামটাকেই বাতিল ঘোষণা করা উচিত। এগুলো নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করার হাতিয়ার মাত্র। এই ২৫ হাজার মেয়ের ফ্যামিলি চান তাদের মেয়ে শর্টকাট রাস্তা ধরে নিজেকে বিসর্জন দিয়ে হলেও একবার মুকুটটা পড়ুক, আর ভোগের বাজারে ডিমান্ডটা আরও বাড়ুক ! এরা কেউই চায় না, – মেধা কাজে লাগিয়ে শিক্ষিত হবে আর পরিশ্রম করে নিজ পায়ে দাঁড়াবে। – নিজের একটা সৎ ব্যক্তিত্ব আর পরিচয় গড়ে তুলবে। পরিবার, সমাজ আর দেশকে ভাল কিছু দেয়ার চেষ্টা করবে। সবার ফোকাস – খ্যাতি, বিত্ত, বৈভব, ক্যামেরা, লাইট… একশ্যান!! যেভাবেই হোক আর যে পথেই আসুক না কেন!! পরিশেষে একটি কথা বলবো, মা বাবার অবহেলা ও ভালোবাসারা মানুষ থেকে বঞ্চনার শিকার এবং বিদেশী চ্যানেলের দৌরাত্ম্যের কারনে আজ কিছু তরুণী সমাজে অধপতনের পথে… ফলশ্রুতিতে, রাস্তা ও নালা-নর্দমায় পাওয়া যায় পলিথিনে মোড়ানো পরিচয়হীন নবজাতক শিশু! আমরা কেউ কি পারি না, এসব অন্যায় কাজকে কে অন্যায় বলতে? বিদেশী নোংরা সংস্কৃতির আগ্রাসনকে বন্ধ করতে?? আসুন, আবার ফিরে যাই আমাদের চিরায়ত বাংলামাতৃকার সামাজিক ঐতিহ্যে, মিশে যাই প্রাণের বাঙালির পারিবারিক সংস্কৃতির লালিত অতীতে !! আমরা কী ওরা? আমরাতো আমরাই !
গত বছর বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতায় জাগো নিজউ ২৪ ডট.কম সূত্রে দেখলাম পুরুষদের সুন্দরী লাগে, তাই আমেনারা ‘এভ্রিল’ হয়। ‘৩৬-২৪-৩৬’ এটিই তোমার পরিচয়। এই মাপের বাইরে চুল পরিমাণ গেলেই তুমি সুন্দরী নও। তোমার সুন্দর একটা মন থাকতে পারে, তাতে পুরুষের মন গলবে না। বুকের মাপ ৩৬ ইঞ্চি হলেই তোমাতে সৌন্দর্যের আয়না মেলে ধরবে পুরুষ। তোমার কোমর ২৪ ইঞ্চি হলেই তুমি কেবল আবেদন রাখতে পার। পশ্চাৎদেশের বেড় ৩৬ ইঞ্চির বেশি হলেই নারী তুমি পুরুষের কাছে অযোগ্য।
সুন্দরী প্রতিযোগিতা নিয়ে ওঠা সাম্প্রতিক বিতর্ক প্রসঙ্গে কথা হয়েছিল নারীবাদী লেখক, কলামিস্ট জব্বার হোসেনের সঙ্গে। একটি বিশেষ মানদ-ে এমন সুন্দরী প্রতিযোগিতার বিরোধিতা করেন জব্বার হোসেন।
এভ্রিল ঝড়ে কাঁপছে মিডিয়াপাড়া। এভ্রিল খবরে অস্থির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোও। যেন এভ্রিলের রূপে দুনিয়ার সব নারীর রূপই উবে গেছে। তৎসময়ে এভ্রিলের কান্নায় রোহিঙ্গা কান্নাও যেন চাপা পড়েছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। নানা বিতর্ক সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ‘অন্তর শোবিজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। চূড়ান্ত ফলাফলে বিচারকদের উপেক্ষা করে জান্নাতুল নাঈম এভ্রিলের নাম ঘোষণা করে ব্যাপক সমালোচনায় পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। এমন সমালোচনায় ঘি ঢালে যখন এভ্রিলের বিয়ের কথা ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। আত্মপক্ষ সমর্থন করে এভ্রিলও ফেসবুক লাইভে এসে কান্না করেছিল। বাল্যবিয়ের বিপক্ষে অবস্থান নেন তিনি। ‘অনেকে বলেছে, আমার বিয়ে হয়েছে, কেন আমি এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছি? এটা একটা প্রতারণা। কিন্তু আমি মনে করি না, আমার বিয়ে হয়েছে। যেখানে আমি একটা দিনও ছিলাম না। তখন আমি অনেক ছোট ছিলাম’- বিয়ে নিয়ে প্রতারণার বিপক্ষে এমন মন্তব্য এভ্রিলের। তবে তার (এভ্রিল) আত্মপক্ষ সমর্থন নিয়েও আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে নানা মহলে। তখনকার সময়ে বিশ্ব সুন্দরীদের প্রতিযোগীদের নিয়ে দেশবিদেশে কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছিল।
এই ‘প্রতারণার ফাঁদ’ কি এভ্রিলের একার গড়া-এমনটি মনে করেননি রাজনীতিক ও নারীনেত্রী আমেনা কোহিনুর। তিনি বলেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ফাঁদে পড়া আর দশজন নারীর মতোই একজন এভ্রিল। তবে এভ্রিলও তার প্রতারণার দায় এড়াতে পারেন না।
তিনি মনে করেন, বাল্যকালে যদি এভ্রিল বিয়ে করে থাকেন, তাহলে সেটাও পুরুষের (তার বাবা) মতে হয়েছে। আমেনার নাম যদি জান্নাতুল নাঈম এভ্রিল হয়, তবে সেটাও পুরুষের চাহিদার কারণে। আবার বিচারকদের মতামত উপেক্ষা করে এভ্রিলকে চ্যাম্পিয়ন করা হয়েছে, সেই পুরুষের ইচ্ছাতেই। আমার মনে হয় না, এভ্রিলকে এভাবে চ্যাম্পিয়ন করার ক্ষেত্রে কোনো নারীর হাত আছে!
এই নারীনেত্রী সুন্দরী প্রতিযোগিতার বিরোধিতা করে বলেছিল, ‘পুরুষের সুন্দরী লাগে। আর এমন সুন্দরী হয়ে উঠতে পুরুষের পাতা ফাঁদেই নারীরা পা দেয়। এভ্রিল যদি প্রতারণা করে থাকেন সেটাও কোনো না কোনো পুরুষের প্ররোচনাতেই।’
নারীবাদী লেখক জব্বার হোসেন বলেছিল, এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা, যেটা সমাজের দৈন্যতাই প্রকাশ করে। নারীর যে কোনো স্বাধীনতা নেই, তারই প্রমাণ মেলে এসব প্রতিযোগিতায়। সুন্দর পুরুষ নির্বাচনে এমন কোনো আয়োজন নারীরা করে বলে আমার জানা নেই।
‘নারী কতটুকু পোশাক পরবে আর কতটুকু খুলবে, তা সম্পূর্ণ পুরুষের ইচ্ছাতেই হয়। আর বোকা নারীরা পুরুষের এসব লালসার শিকার হন।’
তিনি বলেছিলেন, একজন নারীর কুমারিত্বই (ভার্জিনিটি) এখন সৌন্দর্যের বা সম্মানের মাপকাঠি। রূপ প্রকাশের একমাত্র কারণ যেন অবিবাহিত থাকা। বিবাহিত হলে তার আর রূপ থাকে না, তাই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়াও তার জন্য পাপ হয়ে দাঁড়ায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন নারীকে কখনই মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। এ কারণেই সুন্দরী প্রতিযোগিতায় আমেনারা এভ্রিল হয়ে ওঠে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দৈনিক সময় সংবাদের সম্পাদক ও প্রকাশক ২৯ সেপ্টেম্বর, সন্ধ্যা ৬.৩২ পিএম পোস্ট করে অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন “সুন্দরী প্রতিযোগিতা চায় মেয়েদের কর্পোরেট বেশ্যা বানাতে!” এ কেমন প্রতিযোগিতা, যার বিভিন্ন ইভেন্টে শরীরের মাপ দিতে হয়, তাও সে মাপ আবার পুরুষদের নির্ধারিত মাপের ছকেই। স্তনকে বাধ্য করতে হবে ৩৬ ইঞ্চি থাকতে, কোমর হতে হবে ২৬ ইঞ্চি, নিতম্বকেও বেপরোয়া হলে চলবে না, ঠিক ৩৬ ইঞ্চিই চাই তোমার। সভ্যতার এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসে, বস্ত্র সভ্যতার এতকাল পেরিয়ে, মঞ্চে হাঁটতে হবে আধ নেংটো হয়ে। ফটোস্যুটের জন্য পোজ দিতে হবে, তাও অর্ধ-উলঙ্গ হয়েই। ব্রা-পেন্টি পরে। দুনিয়াজুড়ে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় এমনটাই রীতি, যা পুরুষেরা তৈরি করেছে।
আমার ত্বক উজ্জ্বল, চোখ বাদামী, ঠোঁট আকর্ষণীয়- নিজের সম্পর্কে লোকের মুখে এমন মন্তব্য শুনে আমি অভ্যস্থ অনেককাল। নারী-পুরুষ অনেকেই আমার চেহারাও শারীরিক গঠনের সৌন্দর্যে আকর্ষণবোধ করেন, প্রশংসা করেন। এই সৌন্দর্যে আমার কোনো হাত নেই, ভূমিকা নেই। প্রকৃতিপ্রদত্ত। প্রকৃতি একেক মানুষকে একেক রকম করে তৈরি করেছে। এই যে বৈচিত্র্য, এটাই সৌন্দর্য। আমি তো মনে করি, প্রতিটি মানুষই সুন্দর। স্রষ্টার অপরূপ সৃষ্টি। এই সৌন্দর্য নিয়ে প্রতিযোগিতায় কী আছে? যাতে আমার কোনো অর্জন নেই, ভূমিকা নেই, তা কেন হতে যাবে প্রতিযোগিতার বিষয়।
মানুষ নিজে চর্চার মধ্যে দিয়ে যা অর্জন করে, জ্ঞান, মেধা, প্রজ্ঞা, প্রত্যুৎপন্নমতিতা তা নিয়ে প্রতিযোগিতা হতে পারে, এমনটাই হওয়া উচিত সভ্য দুনিয়ায়।
আমি সবসময় সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা, সুন্দরী প্রতিযোগিতার ঘোর বিরোধী। আমি কোর্ট প্যান্ট পরা একটি মানুষ। হঠাৎ করে আমাকে যদি শরীরের প্রায় সব কাপড় খুলে, শুধু ‘আন্ডারওয়ার’ পরে লোকের সামনে, আলো ঝলমলে মঞ্চে হাঁটতে হয়, নিজেকে আকর্ষণীয় প্রমাণ করতে, কখনও কখনও সেই আন্ডারওয়ারকে যদি আবার ডানে বামে, উপরে নিচে নামিয়ে ছবি তুলতে হয়, ভাবা যায় ব্যাপারটা কী ভয়ঙ্কর! পণ্য সভ্যতার বিকট থাবা থেকে মুক্তি নেই মানুষের। পণ্য মানুষকেও পণ্য করে তোলে তার স্বার্থে। বিক্রি হতে হবে প্রসাধন সামগ্রী। সাবান, শ্যাম্পু, লোমনাশক ক্রিম। সে সব বিক্রি করতে নারীকেও পণ্য করে তোলা হচ্ছে দুনিয়াব্যাপী। নির্ধারিত মাপ দিয়ে দেয়া হচ্ছে মেয়েদের জন্য। স্তনের মাপ, নিতম্বের মাপ।
নির্দিষ্ট ছাচে পড়লেই তুমি সুন্দরী। বিশ্ব সুন্দরী। বোকা বুদ্বু মেয়েরাও ছুটে ‘সেই ফিগার’ গড়ে তুলতে। ‘জিরো ফিগার’ চাই। যে করেই হোক, মাপে আসতে হবে ফিগারকে। প্রয়োজনে ডায়েটিং করো, না খেয়ে থাক। ইউরোপেও যে কত মেয়ে না খেয়ে ‘এনিমিয়া’, ‘বুলিমিয়ার’ মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। পশ্চিমে গত কয়েক বছরে বেশ ক’জন মডেল ওভার ডায়েটিংয়ে মারাও গেছেন। মেয়েরা ছুটছে পার্লারে, জিমে। পার্লার থেকে বেরিয়ে আসা মেয়েগুলোকে দেখতে মনে হবে, সবাই একই ছাচে গড়া। সুন্দরী প্রতিযোগিতার ‘গ্রুমিং সেশনের’ মেয়েদের মতো, গ্রুমিং শেষে সবাই একই রকমভাবে হাঁটে, বসে, কথা বলে, মনে হয় ‘পাপেট’ এই মেয়েরা সবাই।
মিডিয়া সুন্দরী প্রতিযোগিতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও প্রচারে বিভোর সবসময়ই। মিডিয়া ভীষণ নারীবান্ধব, মানবিক সবসময় এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বাণিজ্যিক মিডিয়ার প্রভু পুঁজি। ফলে সে যাকে বিকোতে পারে, যা বিকোনো যায়, তা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে স্বাভাবিক। পণ্য হিসেবে, নারীর চেয়ে কম বিনিয়োগে অধিক মুনাফা আর কোন পণ্যের নিশ্চয়তা আছে? ফলে বাণিজ্যিক মিডিয়া মেধাবী, প্রতিভাবান মেয়েদের চেয়ে অমেধাবী, অপ্রতিভাবানদেরই খোঁজে বেশি। ফলে শুধুমাত্র খোলামেলা হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে নায়লা নাইম তারকা হয়। মিডিয়ায় ‘সাহসী মেয়ে’ বলে একটি টার্ম চালু রয়েছে। প্রায়ই দেখা যায়, শরীরসর্বস্ব, গা খোলা মেয়েদের সাহসী বলে সমর্থন জোগাতে।
দাঁত উঁচু, লিকলিকে, স্তনহীন এমন মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ফলাফল করলেও তার চেয়ে মেধাশূন্য গা খোলা, ভরাট শরীরের মেয়েদেরই মিডিয়া প্রচার দেয়, দু’দিনেই তারকা বানাতে অস্থির হয়ে ওঠে। আর এই মেয়েরাও খোলামেলা হয়ে, অর্ধ নেংটো হয়ে পোজ দিয়ে, ছবি তুলে নিজেকে ‘কথাকথিত তারকা’ ভেবে এক ধরনের মিথ্যা আত্মতৃপ্তিতে ভোগে। পর্ন তারকাদেরও যেমন ‘তারকা’ বলে ধারণা দেয়া হয়, নেহাত বাণিজ্যিক কারণে। তারাও যেমন কে কত বেশি যৌন হেনস্থা, যৌন নির্যাতিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে, সেই নিরিখে ‘বড় তারকা’ ভাবে নিজেকে, এই মেয়েরাও তেমনি নিজেকে মূল্যবান ভাবতে থাকে, পুরুষতান্ত্রিকতার ফাঁদে পড়ে।
একটি বারের জন্যও সে ভাবে না, মানুষের মূল্য আসলে কিসে? সে যে একটি যৌনবস্তু হয়ে উঠছে, ভোগ্য বস্তু হয়ে উঠছে, তাতে তার কোনো ভাবাবেগ নেই। প্রতিটি সুন্দরী প্রতিযোগিতা, আয়োজন, আয়োজক কোন না কোন নারী বাণিজ্যের নেটওয়ার্কেও সঙ্গে যুক্ত, এ কথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য। পণ্য হতে আসা, কাপড় খুলতে আসা, পতিতা হতে আসা মেয়েদের পুরুষতন্ত্র চিরকালই বুঝিয়েছে- ‘এটা তোমার স্বাধীনতা, এটা নারী স্বাধীনতা, তুমি অনেক বেশি স্বাধীন, তুমি চাইলেই খুলতে পারো, ছুতে পার, শুতে পারো যে কারও সঙ্গে।
স্বাধীনতা ও নারীবাদের অসম্ভব ভুল ব্যাখ্যা এই মেয়েদের মস্তিষ্কের নিউরনে বিল্ট-ইন করে দেয়া হয়েছে নেহাত বাণিজ্যিক স্বার্থে।
এ বছরও সেরা ১০ সুন্দরী পাওয়া গেছে মর্মে মিডিয়াতে সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে রীতিমতো।
চলছে ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ-২০১৮’ এর সেরা সুন্দরী বাচাই পর্ব। দ্বিতীয়বারের মতো হচ্ছে আয়োনজনটি। গতবারের মতো এবারও এটি আয়োজন করছে অন্তর শোবিজ। ইতোমধ্যে ত্রিশ হাজারের বেশি প্রতিযোগী থেকে সেরা দশ সুন্দরীকে নির্বাচন করেছেন বিচারকরা। এই দশ জন এবার লড়বেন চীনে অনুষ্ঠিত হওয়া বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতার মূল পর্বে যাওয়ার জন্য। এদের মধ্যে সেরা হওয়া একজন যাবেন চীনের মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগীতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে।
এফডিসিতে ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ ২০১৮’ এর সুন্দরী বাছাইয়ের কার্যক্রম। এবারের সুন্দরী বাছাইয়ের কাজে বিচারক হিসেবে রয়েছেন কণ্ঠশিল্পী শুভ্রদেব, অভিনেত্রী তারিন আহমেদ, অভিনেতা খালেদ সুজন, মডেল ইমি ও ব্যরিস্টার ফারাবী।
২৬ সেপ্টেম্বর ডিজে সনিকা ও আরজে নিরবের উপস্থাপনায় রাত ৯টা থেকে এটিএন বাংলায় সেরা দশ প্রতিযোগীদের বাছাই পর্ব শুরু হয়েছে। সেখান থেকে সেরা সুন্দরী চলতি বছরের ৭ ডিসেম্বর চীনে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রতিযোগিতার মূলপর্ব অংশ নিবেন। সেখানে বিভিন্ন দেশের সেরা সুন্দরীরা লড়বেন বিশ্ব সুন্দরী হওয়ার প্রতিযোগিতায়।


লেখক পরিচিতি : মো: আকতার হোছাইন কুতুবী, সহ-সম্পাদক জাতীয় দৈনিক আমার কাগজ ও দি গুড মর্নিং, প্রধান সম্পাদক জাতীয় ম্যাগাজিন জনতার কণ্ঠ, উপদেষ্টা সম্পাদক জাতির আলো এবং রোমান্টিক চিন্তুক ও সমালোচক, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১২১৮০২৬৩।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •