সৈয়দ শাকিল :


অনিয়মিত হালনাগাদ, ভুলে ভরা ও অস¤পূর্ণ তথ্য দিয়ে কক্সবাজার জেলা তথ্য বাতায়নের কার্যক্রম চলাচ্ছে। ওয়েবসাইটটিতে যে তথ্য রয়েছে তাও হালনাগাদ করা হয় না নিয়মিত। তথ্য সেবাকে উন্নত করতে জেলার তথ্য দিয়ে জাতীয় তথ্য বাতায়ন ওয়েবসাইট তৈরি করেছে সরকার। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের ডিজিটাল কার্যক্রমের অন্যতম একটি হলো ‘জেলা তথ্য বাতায়ন’।
কক্সবাজার জেলা তথ্য বাতায়ন চলছে দায়সারাভাবে। ফলে তথ্যভা-ার হিসেবে খুব একটা কার্যকর হয়ে উঠতে পারেনি জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারি ওয়েবসাইটটি।
তথ্য বাতায়ন আপডেট করার জন্য সরকারি বেতনভোগী থাকলেও রহস্যজনক কারণে তথ্য বাতায়নে তথ্যবিভ্রাট লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তরের পাশাপাশি সরকারি সেবা ও তথ্য জনগণের কাছে সহজে পৌঁছে দেয়ার জন্য ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই একসঙ্গে ২৫ হাজার ওয়েবসাইটের সমন্বয়ে চালু হয় জাতীয় তথ্য বাতায়ন ওয়েব পোর্টাল।
কক্সবাজারের তথ্য বাতায়নে রয়েছে নানা ভুল ও অসম্পূর্ণ তথ্য। জেলার জনগুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যও হালনাগাদ করা হয় না নিয়মিত।
এছাড়া অনেক তথ্যই রয়েছে, যা হালনাগাদ হয়নি দীর্ঘ বছরেও। ফলে, বাতায়নে নতুন তথ্য হালনাগাদ না করায় পুরনো তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়। এ কারণে তথ্য বাতায়ন জেলাবাসীর তথ্য ভা-ার হয়ে উঠতে পারেনি। জেলা তথ্য বাতায়ন (http://coxsbazar.gov.bd) কতটা নিয়মিত হালনাগাদ হয় তার প্রমাণ মেলে হোম পেজেই।
জেলা তথ্য অফিস গণযোগাযোগ অধিদপ্তর, তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারের একটি প্রচারমূলক প্রতিষ্ঠান।
ভিশন ও মিশন- তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ নির্ভর তথ্যসেবা সর্বত্র ও সকলের। সরকারের নীতি ও কার্যক্রমের সাথে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে তথ্যসেবার মাধ্যমে সচেতন, উদ্বুদ্ধ এবং উন্নয়নের ধারায় সম্পৃক্তকরণ। জেলা তথ্য অফিসের পেজের নাজুক অবস্থা। কর্মকর্তা এক জন ও কর্মচারী তিন জনের তথ্য রয়েছে উক্ত পাতায়। তথ্য প্রযুক্তির সেবা বলতে গুটি কয়ে ছবি রয়েছে।
সরকারী এই ওয়েবসাইটের কক্সবাজার পৌরসভার পেজটি হালনাগাদ হয়নি। এতে এখনো মেয়র হিসেবে মাহমুদুর রহমানের(মাহাবুবুর রহমান) নাম রয়েছে। যদিও পদটিতে পরিবর্তন এসেছে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮। তবে বর্তমান মেয়র মুজিবুর রহমান। পরিবর্তন হয়নি প্যানেল মেয়রের পাতাটিও। কাউন্সিলরগণ তথ্যের একই অবস্থা। একইভাবে জেলার জনপ্রতিনিধিদের তালিকায়ও রয়েছে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য। বিজয়ী অনেক ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য, মেয়র ও কাউন্সিলরের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়নি এখানো।
ভুল তথ্যের কারণে নিয়মিত বিভ্রান্তিতে পড়ছে শিক্ষার্থীরাও। জেলা তথ্য বাতায়নের কলেজের তালিকায় এখনো অন্তর্ভুক্ত হয়নি কক্সবাজার সিটি কলেজ, টেকনাফ ডিগ্রি কলেজসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে আবার অনেকগুলোরই অধ্যক্ষের নামের স্থান খালি রয়েছে। আবার কয়েকটি কলেজের প্রতিষ্ঠাকাল ও ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা নিয়েও কোনো তথ্য নেই। একই অবস্থা দেখা গেছে স্কুল, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পেজেও।
জেলা শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস পাতা রয়েছে ভুলে ভরা। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন কক্সবাজার এর পেজ আছে আর কিছু নেই। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল্ কোম্পানী লিমিটেড (বিএসসিসিএল) কক্সবাজার ২০০৯ সালের তথ্য দিয়ে চলছে এখনো। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটির তথ্য হালনাগাদ নেই। কক্সবাজার বিমান বন্দর পরিচিতি ছাড়া তথ্য নেই। ব্যাংকের পেজ হালনাগাদ হয়নি।
জেলা পরিষদ কক্সবাজার পাতায় প্রশাসক মোস্তাক আহমদ চৌধুরী ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছাড়া কোন কর্মকর্তার তথ্য নেই।
ওয়েবসাইটের আইনশৃঙ্খলা বিভাগে কক্সবাজার পুলিশ সুপার কার্যালয়ের পেজে পুলিশ সুপার হিসেবে রয়েছে এ কে এম ইকবাল হোসেন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে আফরুজুল হক টুটুলের নাম। অথচ কক্সবাজার পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসাইন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসাইন। নেই জেলা পুলিশের থানাগুলোর তথ্য।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার পেজে হালনাগাদ তথ্য নেই। নেই গণপূর্ত বিভাগের সম্পূর্ণ তথ্য। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজার পেজ হযবরল। কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একই অবস্থা।
কক্সবাজার সিভিল সার্জন পাতায় জেলা অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পরিচিতি রয়েছে। তবে উপজেলার তথ্য নেই।
জেলা সদর হাসপাতাল এক নজরে- ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতাল কক্সবাজার ১৮৮১ সালে ২২ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করে। তত্বাবধায়কের পরিচয় দিয়েই তথ্য শেষ।
কক্সবাজার বিআরটিএ পাতাতে সংক্ষিপ্ত অফিস পরিচিতি রয়েছে।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কর্মকর্তাবৃন্দে সহকারী পরিচালক ছাড়া কোন কর্মকর্তা নেই। কর্মচারী তালিকায় এমন নাম রয়েছে যিনি অবসরে গেছেন।
কক্সবাজার জেলা কারাগার পাতাতে জেল সুপারের তথ্য নেই। অথচ তিনি জেলা কারাগার প্রধান।
পাসপোর্ট অফিস কক্সবাজার পাতাতে সহকারী পরিচালক ছাড়া কোন কর্মকর্তার তথ্য নেই।
কক্সবাজার ডাক বিভাগে জেলা অফিসের কর্মচারীবৃন্দ ছাড়া কোন তথ্য নেই।
কক্সবাজার বেতার কর্মকর্তা, কর্মচারী ও যোগাযোগ ছাড়া তথ্য নেই।
জেলার সড়ক জনপদ অধিদপ্তর, জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, বিটিসিএল, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, ঔষধ তত্বাবধায়কের কার্যারলয় কক্সবাজার, জেলা পরিসংখ্যান অফিস, জেলা হিসাব রক্ষণ অফিস পেজে রয়েছে অসম্পূর্ণ তথ্য।
তথ্য নেই বল্লেই চলে উত্তর বন বিভাগ, দক্ষিণ বন বিভাগ,উপকূলীয় বন বিভাগের পেজে।
বাস্তবের সাথে তথ্যের মিল নেই পরিবেশ অধিদপ্তর, আবহাওয়া অফিস ও জেলা নির্বাচন অফিস।
টেকনাফের সংবাদকর্মী মো. জাবেদ জানান, আমাদের বসবাস সীমান্তে তাই বিভিন্ন তথ্য আমরা পাই না। তাই অনেক সময় জেলা তথ্য বাতায়ন নির্ভর করতে হয়। জেলা তথ্য বাতায়নের তথ্য ব্যবহার করে বিতর্কিত হতে হয়।
কক্সবাজার সিটি কলেজের অধ্যাপক আকতার চৌধুরী জানান, জেলা তথ্য বাতায়নে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিভাগে সিটি কলেজের মতো চট্টগ্রামের অন্যতম বেসরকারী কলেজের নাম না থাকা অত্যন্ত লজ্জাজনক।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(আইসিটি) মুহাম্মদ আশরাফ হোসেনের সাথে ২৬ সেপ্টেম্বর বেলা ১২টা ২৭মিনিটে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রতিবেদকের পরিচয় ও বিষয় শুনে তিনি মিটিংয়ে আছেন বলে ১ঘন্টা পরে ফোন করতে বলেন। দুপুর ২টা ২১মিনিটে পুনোরায় ফোন দেয়া হলে তিনি এখনো মিটিংয়ে আছেন এবং অফিসে দেখা করতে বলেন। বিকেল বেলায় অফিসে গিয়ে ওনাকে না পেয়ে ৪টা ৩১ মিনিটে ফোনে রিং করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেন নি। ফলে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জেলা তথ্য অফিসার নাছির উদ্দিনকে কার্যালয়ে গিয়ে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে বিষয় শুনে তিনি ঢাকায় মিটিংয়ে রয়েছেন বলে জানান।
উল্লেখ্য, ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নকারী প্রকল্প একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রাম। “একসেস টু ইনফরমেশন এন্ড নলেজ ক্যাটাগরিতে” জাতীয় তথ্য বাতায়ন ‘ওয়ার্ল্ড সামিট অন ইনফরমেশন সোসাইটি (WSIS)’ পুরস্কার ২০১৫ অর্জন করেছে। ওয়ার্ল্ড সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি (WSIS) পুরস্কার তথ্য-প্রযুক্তি ক্ষেত্রে উদ্যোগ ও বাস্তবায়নের বড় ধরণের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। এটুআই প্রকল্প কর্তৃক জনগণের দোরগোড়ায় সেবা প্রদানের লক্ষ্যে স্থাপিত “ডিজিটাল সেন্টার” WSIS পুরস্কার ২০১৪ অর্জন করেছিল।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •