cbn  

শাহেদ মিজান, সিবিএন:
পুরো মহেশখালীর বুক চিরে গেছে লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) লাইন। অত্যধিক শক্তিশালী এই পাইপ লাইনটির মূল স্টেশন মহেশখালীর সোনাদিয়ায়। হোয়ানকে স্থাপন করা হয়েছে সাব স্টেশন। বড় বড় জাহাজে করে বিদেশ থেকে তরলীকৃত গ্যাস মহেশখালী দিয়ে আনোয়ারা যাচ্ছে। সেখানে জাতীয় গ্রীডে যোগ করে সারাদেশে সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিদিন ৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি মূল গ্রিডে দেওয়া হচ্ছে। তবে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মূল গ্রিডে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।

এই গ্যাস লাইনের স্টেশন ও পাইপ স্থাপন করতে গিয়ে বিপুল ক্ষতি হয়েছে মহেশখালীর মানুষের। ছাড়তে হয়েছে জমি, ঘরবাড়ি, পানের বরজ, ধানক্ষেতসহ নানা স্থাপনা। এতে অনেক মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এত ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করেও মহেশখালীর মানুষ গ্যাস পাচ্ছে না। ভবিষ্যতেও পাবে এমন কোনো সংকেত নেই। এই প্রেক্ষাপটে মহেশখালীর মানুষের মাঝে দাবি উঠেছে- মহেশখালীর মানুষ গ্যাস লাইন স্থাপনে এত ত্যাগ স্বীকার করেছে; তারা গ্যাস সংযোগ কেন পাবে না? তাই মহেশখালীতে গ্যাস সংযোগ দেয়া এখন সর্বস্তরের মানুষের গণদাবি হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন-প্রতিমুহূর্ত এই দাবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই দাবি নিয়ে মহেশখালীর সব প্লাটফর্মের আজ একাট্টা।

জানা গেছে, দেশের চাহিদা মেটানোর বিদেশ থেকে মাদার ভেসেলে (পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জাহাজ) করে লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) এনে উদ্যোগ নেয় সরকার। মহেশখালীর সোনাদিয়ার সমুদ্র বন্দর গভীরতাসহ সব ধরনের সুযোগ থাকায় সোনাদিয়াকে ব্যবহার কর এলএনজি আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ২০১৬সাল থেকে তার প্রক্রিয়া শুরু হয়। মহেশখালীর পশ্চিম উপকূল থেকে সাড়ে সাত কিলোমিটার দূরে গভীর সমুদ্রে এই ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছে। টার্মিনালে স্থাপিত ভাসমান স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন পহ্ম্যান্টের মাধ্যমে এলএনজিকে গ্যাসে পরিণত করে সঞ্চালন লাইনে সরবরাহ করা হচ্ছে। এলএনজি সরবরাহর জন্য সোনাদিয়া থেকে পুরো মহেশখালীরে মাঝ বরাবর স্থাপন গ্যাসের বড় বড় পাইপ। এই পাইস স্থাপন করতে অধিগ্রহণের জন্য মানুষকে ছাড়তে হয়েছে হাজার হাজার একর জমি। একই সাথে অনেক ঘর-বাড়ি, পান বরজ, ধানক্ষেত,ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা ছাড়তে হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, জমি অধিগ্রহণ ও স্থাপনাসহ বিভিন্ন অবঠামোর উপযুক্ত ক্ষতিপূরণও পায়নি ক্ষতিগ্রস্তরা। ইতিমধ্যে মাদার ভেসেল থেকে গ্যাস খালাস হয়ে জাতীয় গ্রীডে যুক্ত হয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত অনেক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ তাদের জমি ও অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ পায়নি। তারপরও দেশের বৃহত্তর উন্নয়নের স্বার্থে মহেশখালীর মানুষ নিজেদের ক্ষতি মেনে নিয়েছেন। তবে এত ক্ষতির বদলে মহেশখালীতে গ্যাস সংযোগ দেয়া দাবি জানাচ্ছেন।

মহেশখালীর সর্বস্তরের মানুষের দাবি, এত ক্ষতি স্বীকার করে আমাদের বুকের উপর দিয়ে গ্যাস লাইন বসানো হয়েছে। এই গ্যাসের প্রথম দাবিদার মহেশখালীর মানুষ। সরকার মাতারবাড়িতে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র বাস্তবায়ন করছে। মাতারবাড়ি ও মহেশখালী আরো দু’টি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নের মুখে। মহেশখালীকে বাংলাদেশের একমাত্র ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড’ও ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনার মহেশখালীকে সিঙ্গাপুর গড়ারও ঘোষণা দিয়েছেন। এত কিছুর পরও পর মহেশখালীর বুক চির যাওয়া গ্যাস পায়নি এখানকার মানুষ- এটা অত্যন্ত দুঃখের ও কষ্টের বলে মনে করেন সেখান মানুষ।

জানা গেছে, মহেশখালীতে গ্যাস সংযোগ দেয়ার দাবিতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্লাটফর্ম তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমক কেন্দ্রিক একাধিক প্লাটফর্ম হয়েছে। ফেসবুক ব্যবহারকারী মহেশখালীর প্রতিটি মানুষ প্রায় সময় গ্যাস সংযোগ দাবি করে স্ট্যাটাসটা দিচ্ছেন। সম্প্রতি ‘গরু পালছি আমরা, দুধ খাচ্ছে নর্থ বেঙ্গলের লোকেরা। চট্টগ্রামের বচন- ঘরের চিন্নি পরে হার, হোছাইন্না হদ্ধা লই বেরার। ফ্যাক্ট: মহেশখালীতে গ্যাস সংযোগ চাই।’ স্ট্যাটাসটি ভাইরাল হয়েছে। এমনতর আরো নানা ধরণের স্ট্যাটাস দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও সামাজিকভাবেও নানাভাবে সামগ্রিকভাবে গ্যাস সংযোগ দাবি করছে মহেশখালীর মানুষ। প্রশাসনের কাছেও নানাভাবে গ্যাস দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মহেশখালীতে গ্যাস সংযোগ দেয়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে মহেশখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব হোসাইন ইব্রাহিম বলেন, সরকারের সাথে গ্যাস কোম্পানী চুক্তিনামা করে মহেশখালীর মাটির উপর এলএনজি গ্যাস টার্মিনাল স্থাপন করে সারাদেশে গ্যাস সরবরাহ করছে। অথচ আমরা মহেশখালীবাসী গ্যাস সংযোগ থেকে বঞ্চিত। এটা কী চেরাগ, মামবাতি, হারিকেনের নিচে অন্ধকার থাকে’ কথাটির মতো চিরন্তন সত্য। আমরা মহেশখালী বাসী গ্যাস সংযোগ চাই। জোর দাবি জানাচ্ছি।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সদ্য বিদায়ী মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, ‘এটা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একান্ত বিষয়। বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর বুঝবে। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে চাইলে বিষয়টির একটি সুরাহা হতে পারে।’

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এড. সিরাজুল মোস্তফা বলেন, ‘আমার কথা হচ্ছে মহেশখালী জনপ্রতিনিধির জনগণের পক্ষ হয়ে এই দাবিটি জানানো উচিত ছিলো। কি কারণে জানিনা, সে দাবি তিনি তুলেনি। আমাদের সাথে দুয়েকবার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জনের সাথে কথা হয়েছে। সেখানে আমি বলেছি যে, আমার ঘরের দুয়ার দিয়ে গ্যাস লাইন যাবে, আমার মাটি ব্যবহার করে, আমার ঘর, পানের বরজ, ধানক্ষেত সব কিছু ক্ষতি করে সেই গ্যাস লাইন আমার বুকের উপর দিয়ে যাবে; আমি পাবো না কেন? মহেশখালীবাসীর গ্যাস পাওয়া যৌক্তিক অধিকার। আইনত বা যেভাবেই বিবেচনা করুন, মহেশখালীবাসীর গ্যাস পাওয়ার অধিকার আছে। আমি শুরু থেকে তীব্রভাবে দাবি জানিয়েছি, এখনো জানাচ্ছি। সরকারের কাছে আবেদন-নিবেদন আমরা করছি, গ্যাস সংযোগ যেন মহেশখালীবাসীকে দেয়া হয়। এটা যদি আমরা সঠিকভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করতে পারি তাহলে অবশ্যই তিনি দেবেন।’

মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক বলেন, ‘গ্যাস লাইন স্থাপন হওয়ার শুরু হওয়ার পর থেকেই মহেশখালীতে গ্যাস সংযোগ দেয়ার জন্য আমি নানাভাবে চেষ্টা করছি। সংশ্লিষ্টরা আমাকে আশ^স্ত করেছেন- মহেশখালীতে গ্যাস সংযোগ দেয়া হবে। এটার জন্য সময়ের দরকার। গ্যাস লাইনটি স্থাপন হলো মাত্র। সব কিছু গুছিয়ে উঠলে আশা করি মহেশখালীবাসী গ্যাস সংযোগ পাবেন।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •