জীবন একটাই, মাদক মুক্ত জীবন চাই

অধ্যাপক ডা. এম এ বাকী

মাদকের কথা যদি বলতে হয়, তাহলে কবে থেকে মাদকের ব্যবহার শুরু হয়েছিলো তার সঠিক কোন হিসেব কারও কাছে নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞানের হিসাব থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে বলা হয়েছে যে, খ্রীষ্ট জন্মের ১০ হাজার বছর পূর্বে মাদকের ব্যবহার হয়ে এসেছে। ৪ হাজার বছর আগে ভারতবর্ষে মদ, গাঁজা, তাড়ী ভাং ইত্যাদির ব্যবহার হতো এবং এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিলো খুবই কম।

মদ, গাঁজা তাড়ী সেই প্রাচীন কাল থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। আর সেই প্রাচীনকালের তিনটি মাদক বংশবিস্তার করতে করতে আরও অর্ধশত মাদকের জন্ম দিয়েছে। মাদকের প্রতি আকৃষ্ট করেছে কোটি কোটি মানুষকে। সময় কাল ও যুগের আবর্তণে এই মাদকই ভিন্ন ভিন্ন নামে উপস্থিত হচ্ছে মানুষের সামনে। আর সেই নতুনভাবে নতুন নামে উপস্থিত হওয়া মাদকে আকৃষ্ট হয়ে ঝরে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ তরুণ প্রাণ। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে যুবসমাজের ওপর! তরুণ সমাজের ওপর! আর এই তরুণ সমাজই যদি বিপথে চলে যায়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে মাদকদ্রব্য শুধু ব্যক্তির নয়, একটি সমাজ, একটি জাতির এবং একটি দেশের বিশাল ক্ষতি সাধন করে থাকে। তাই আজ বিশ্বের প্রতিটি দেশে মাদকাসক্তি একটি বৃহৎ ও জটিল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর সমাধানে বিভিন্ন কার্যক্রম গুরুত্ব পাচ্ছে।

মাদকদ্রব্য ও এর বিস্তৃত ভয়াল গ্রাস আজ সারা বিশ্বের অন্যতম এক জটিল সমস্যা। এ সমস্যা ক্রমবর্ধমান ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিস্তৃত হচ্ছে এবং শক্তিশালী হচ্ছে। বড় বড় অপরাধী চক্র মাদকদ্রব্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং দেশে দেশে মাদকের চোরাচালানের মাধ্যমে বাজারজাতকরণ ও বিপণনের মধ্য দিয়ে ধ্বংস করে চলেছে মানব সমাজ। এবং এর চরম প্রভাব ফেলেছে মানব সভ্যতার ওপরে। মাদকের ভয়াল থাবা দেশের যুবসমাজকে গ্রাস করে তাদেরকে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে এবং দেশের অর্থনিতি হুমকির মুখে ফেলছে। মাদক নির্মূল আজ সময়ের অন্যতম দামী হয়ে দাড়িয়ে। মাদকের ব্যাবহার কমিয়ে না আনতে পারলে ভবিষ্যতে দেশের চরম ক্ষতি স্বাধন করবে এই মাদক ব্যবসায়ি ও মাদক সেবীরা।

বর্তমান বাংলাদেশের তরুণ কিশোর ও যুব সমাজের বিরাট একটা অংশ আজ মাদকাসক্ত। ফলে তারা বিভিন্ন ধরণের অপরাধ প্রবণতায় জড়িয়ে পড়েছে। মাদকের ভয়াল থাবা মাদকাসক্ত ব্যাক্তিদেরকে ক্রমান্বয়ে গ্রাস করে দেশ ও জাতিকে একটি বিরাট সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত করছে, এর ফলে পারিবারিক ও সামাজিক মুল্যবোধ মারাতœক ভাবে বিনষ্ট হতে চলেছে। বিভিন্ন ধরনের নেশার ভয়াবহ রূপ ও ফলাফল সম্পর্কে রাস্ট্রিয় ও সামাজিক ভাবে তেমন কোন জনসচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে না, সে কারনেই আমাদের বিশাল জনগোষ্টির বিরাট একটি অংশ এতটা অপরাধ ও দূর্নীতির মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনেকের পারিবারিক জীবন ধ্বংসের মুখে অন্যদিকে দেশ ও জাতি গঠনে তরুণ সমাজের ভূমিকা আজ মারাতœক ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। তরুণ সমাজ হচ্ছে জাতি গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। অথচ তারাই আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

মাদক বিরোধী অভিযান

চলতি বছর মে মাস থেকে সরকারের পক্ষ থেকে যে মাদক বিরোধী কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে এই কর্মসূচিকে আমি সাধুবাদ জানাই। ভবিষ্যতেও এ ধরনের কর্মসূচি বহাল থাকলে মাদকের ব্যাবহার কমে আসবে। পুরোনো মাদকাসক্তদের বিরাট একটি অংশ মাদক সেবন ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জিবনে ফিরে আসবে। আবার নতুন করে মাদকের পথে পা বাড়াবে না তরুণ যুবকেরা। মাদক বিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে বিভিন্ন যায়গা থেকে শতাধিক ফোন এসেছে। ভালো রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের সন্ধানে। মাদকাসক্তি চিকিৎসা পূণর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করাতে ইচ্ছুক অনেক মাদকাসক্ত সন্তানের অভিভাবক। অনেক অভিভাবকই জানতেন যে তার সন্তান মাদকাসক্ত, সময় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। বা বুদ্ধি হলে স্বাধাবিক হয়ে যাবে এই চিন্তা থেকে অনেক পরিবার থেকে তেমন ব্যবস্থা নেয়া হতো না। অনেক পরিবার ছিলো সন্তানের বেপরোয়া আচারণের কাছে নিরুপায় হয়ে করার কিছু ছিলোনা। কিন্তু মাদক বিরোধী অভিযান শুরুর পর যেমন সতর্ক হয়েছে মাদকসেবিরা তেমনি সতর্ক হয়েছে মাদকাসক্তের পরিবার। চিহ্নিত মাদক ব্যাবসায়িরা তো এলাকা ছেড়ে অন্য নিরুদ্দেশ হয়েছে। মাদকের ব্যাবহার কমিয়ে আনতে হলে মাদকের বিরুদ্ধে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর এই কঠোর কর্মসূচি দীর্ঘদিন বহাল রাখতে হবে।

ভালোমানের পূণর্বাসন কেন্দ্রের প্রয়োজন

আমাদের ১৪৭৫৭০ বর্গকিলোমিটারের এই দেশে ১৬ কোটি ২০ লাখ মানুষের বসবাস, এর মধ্যে চার কোটি শিশু, বাকি ১২ কোটির মধ্যে ৮০ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। সেই হিসেবে পূর্ণবয়স্কদের মধ্যে প্রতি ১৪ জনে একজন মাদকাসক্ত। অথচ চিকিৎসা পূণর্বাসনের বেহাল দশা। সরকারি ভাবে সারা দেশে ১২শ থেকে ১৫শ মানুষ এক সাথে চিকিৎসা নিতে পারবে সেটাও আবার দীর্ঘমেয়াদি। বেসরকারি চিকিৎসা পূনর্বাসন কেন্দ্রর গুলোর মধ্যে অধিকাংশই গড়ে উঠেছে বানিজ্যিক কেন্দ্রিক। হাত বাড়ালে মাদক মিললেই সহজে মেলেনা ভালো মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের সন্ধান। মাদক নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত ১৮৮ টি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে সারা দেশে থাকলে, সবগুলোর চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নতমানের না। বা একজন মাদকাসক্তকে সুস্থ্য করতে যথেষ্ট না। আবার এই ১৮৮ টির বাইরেও আছে অনেক মাদকাসক্ত পূণর্বাসন কেন্দ্রে। সন্তান মাদকাসক্ত হলে পরিবারের অন্যরা চিন্তিত তাকে স্বাভাবিক জিবনে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু চিন্তাটা আরও বেড়ে যায় ভালো নিরাময় কেন্দ্রের সন্ধান না পেয়ে।

মাদক নয়, চাই প্রাণবন্ত তারুণ্য।

যে তারুণ্যে আকাশসম স্বপ্ন থাকবে, সীমাহীন খুশি থাকবে, ছোটদের জন্য ¯েœহ থাকবে, বড়দের জন্য শ্রদ্ধা থাকবে, আর বন্ধুদের জন্য থাকবে ভালোবাসা। দেশ দশ এবং নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, থাকবে প্রাণচ্ছল! আমি সে তারুণ্যের কথা বলছি। যে তারুণ্য দেশকে উচ্চ থেকে উন্নয়নের উচ্চশিখরে নিয়ে যাবে, দেশের ব্যবসা-বানিজ্য, শিক্ষা-চিকিৎসা স্বাস্থ্য, অর্থনীতির চাকা ঘুরানোর দায়িত্ব নিবে আমি সেই তারুণ্যের কথা বলছি। যে তারুণ্য দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য, স্মৃতি কথা ও স্বরণীয় বরণীয়দের আদর্শ বুকে নিয়ে তাদের স্বপ্ন চোখে নিয়ে এগিয়ে যাবে আমি সেই তারুণ্যের কথা বলছি। কিন্তু এই তারুণ্য এখন খুবই দূর্লভ। তরুণ তুমি কেনো মাদকের কবলে পড়বে? কিসের আশায় কোন হতাশায়? কি নেই তোমার? একটি স্বাধীন দেশ আছে, পতাকা আছে, গর্ব করে বলার মতো ভাষা আছে, বিশ্ব নেতা ও কবি আছে, ছবির মতো দেশ আছে। তোমার হতাশা দুর করার জন্য নদী আছে, পাহাড় আছে, সাগর আছে, সুন্দরবন আছে, এবং শত শত জলপ্রপাত আছে, ছয়টি ঋতু আছে, হাজার লেখকের লেখা বই আছে, তাহলে কোন হতাশায় কিসের আশায় মাদকের কবলে পড়া? কেনো নিজের জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনা?

লেখক

প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি

সোসাইটি ফর এন্টি এডিকশন মুভমেন্ট, সম্পাদক, মাদক বিরোধী পত্রিকা “নেশা” । অধ্যাপক, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। ০১৮১৯ -২৪ ১৭ ৩৬/ ০১৭৯৯-৯২৪৭৬৯

কক্সবাজার নিউজ সিবিএন’এ প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।

সর্বশেষ সংবাদ

একান্ত সাক্ষাৎকারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসাইন অপরাধীর সাথে আপোষ নয়

প্রসঙ্গ : প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলতি দায়িত্ব

বৃহত্তর ঈদগাঁওয়ের প্রায় ১শ কি.মি সড়ক চলাচলের অনুপযোগী, সেতুমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ

টেকপাড়ায় মাঠে গড়াল বৃহত্তর গোল্ডকাপ ফুটবল টূর্ণামেন্টের ৫ম আসর

মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিদর্শনে গেলেন বিভাগীয় কমিশনার

নতুন বাহারছড়ার সেলিমের অকাল মৃত্যু: মেয়র মুজিবসহ পৌর পরিষদের শোক

জেলা আ’ লীগের জরুরী সভা

মাদক কারবারীদের বাসাবাড়ীতে সাঁড়াশি অভিযান, ইয়াবাসহ আটক ৩

সৈকতে অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় উন্নয়ন মেলা কনসার্ট

পেকুয়ায় অটোরিকশা চালককে তুলে নিয়ে মারধর

পুলিশ সুপারের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ

ফেডারেশন অব কক্সবাজার ট্যুরিজম সার্ভিসেস এর সভাপতি সংবর্ধিত

কাউন্সিলর হেলাল কবিরকে বিশাল সংবর্ধনা

কলাতলীতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, দুইজনকে জরিমানা

আ. লীগের কেন্দ্রীয় টিমের জনসভায় সফল করতে জেলা শ্রমিকলীগ প্রস্তুত

মানবপাচারকারী রুস্তম আলী গ্রেফতার

দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার নেই, পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে : শাহজাহান চৌধুরী

১২দিনেও খোঁজ মেলেনি মহেশখালীর ১৭ মাঝিমাল্লার

শেখ হাসিনার উন্নয়নের লিফলেট বিতরণ করলেন ড. আনসারুল করিম

কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশের অভিযানে গ্রেফতার-১০