আদুরে শব্দের ‘আহমদ ছফার সংসার’

মুহাম্মদ নুরুল আলম আযাদ

গ্রন্থ: আহমদ ছফার সংসার
লেখক: মোহাম্মদ আলম চৌধুরী
গ্রন্থের ধরণ: গবেষণামূলক
প্রকাশক: আলী প্রয়াস
প্রকাশনী: তৃতীয় চোখ
৬১, কনকর্ড এম্পোরিয়াম শপিং কমপ্লেক্স, ২৫৩-৪ এলিফ্যন্ট রোড, কাটাঁবন, ঢাকা।
পরিবেশক: বাতিঘর, ঢাকা ও চট্টগ্রাম। পৃষ্ঠা: ১৪৪, মূল্য: ২৮০ টাকা।
বাংলা সাহিত্যের বিস্ময়কর প্রতিভাবান ব্যতিক্রমধর্মী লেখক আহমদ ছফার (১৯৪৩-২০০১) মেটাফোরিক লেখা ‘পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ এর আত্মোপলব্ধিমূলক তফসীর গ্রন্থ- ‘আহমদ ছফার সংসার’। প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য্যে পরিপূর্ণ পাহাড়-নদী-সাগর বেষ্টিত ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রামে জীব বৈচিত্রে ভরপুর। আদিকাল থেকে এই জনপদের মানুষ উদ্ভিদ, প্রাণী, পাখ-পখালির সাথে মিতালী করে আসছে। তারই প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে এই মাটির সন্তানদের চিন্তা, চেতনা, সংস্কৃতি ও দর্শনে। চট্টগ্রামের চন্দনাইশের ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, ব্যতিক্রমধর্মী কথাশিল্পী আহমদ ছফা-এর বিচিত্র শিল্পকর্মের উল্লেখযোগ্য একটি-‘পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’। বইটিতে ছোট ছোট অনেক ঘটনার সরস ও সতর্ক বয়ান রয়েছে। একজন সমব্যথী পাঠক হিসেবে যে উপলব্ধি পাঠকমনে রেখাপাত করেছে তারই সরল পাঠোন্মোচন-‘আহমদ ছফার সংসার’। বইটির লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। জন্ম ককসবাজার জেলার রামুতে, বেড়ে উঠেছেন উখিয়াতে। শৈশব সহজাত গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতায় পরিপূর্ণ। কৈশোরিক দুরন্তপনা, বাগ-বাগিচায় বৃক্ষ, দ্রাক্ষলতা, পুষ্প ও পাখির স্মৃতি লেখকের মাঝে রয়েছে অফুরন্ত। আহমদ ছফার ‘পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ পড়তে পড়তে লেখক যেন নিজের অজান্তে নিজের চিন্তার মাঝে ঘুরে বেড়িয়েছেন। একই এলাকা ও সমমানসিকতার কারণে আহমদ ছফার রূপকাশ্রিত চিত্রকল্পগুলো হৃদয়ঙ্গম করেছেন এবং তা প্রকাশ করেছেন সহজ, প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায়।
¬¬¬¬¬¬
লেখক গবেষক মোহাম্মদ আলম চৌধুরীর লিখন শৈলীতে নিজস্বতার ছাঁচ চোখে পড়ার মতো। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ব্যবহৃত আরবি-ফার্সি মিশ্রিত আদুরে শব্দগুলো সযতনে প্রয়োগ বইটিকে দিয়েছে অনন্যতা। খাসলত, পুত, হাবিজাবি, বদ্দা, ধাইজাম-পুঁতিজাম, তেজারত, দইজ্জার গইর, শিথান-পৈথান, ধেচ্ছুরু, দুতিয়ালি, ডেকচি, পাখিঅলা, বাড়িঅলা, সেয়ানা, খাইস্যা, ফুইন্না, বঅউনি ছুয়া, আছারগাছের গিল, বেচ্যুত ও বরকেতা ইত্যাদি শব্দের অপূর্ব প্রয়োগ বইটির মৌলিকত্ব ও লেখকের নিজস্ব ঢঙের বহিপ্রকাশ। গ্রন্থটি গবেষণাধর্মী লেখা হলেও লেখকের চিন্তা ও ভাষায় চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন। বইটির পরতে পরতে আঞ্চলিক শব্দ, প্রবাদ-প্রবচন ও লৌকপুরাণ চিত্রিত করেছেন সুনিপূন শব্দমালায়। ‘নেকের খেয়ে নাঙের গা টেপা’, ‘নাঙের আশায় নেক হারানো’, ‘মাগি বুড়া হলে পানের দোকান দেয়’, ‘কলা চুরের ফাঁিস, ডাকাতের অট্টাহাসি’, ‘ফাটা বাঁেশ অন্ডকোষ আটকানো’, ‘যে দেখে তার শরম, নাকি যে করে তার শরম’ এমন অনেক শব্দগুচ্ছ ব্যবহারে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। আহমদ ছফার অনবদ্য সৃষ্টিতে এতো মুগ্ধ ও মোহিত যে বইয়ে বিভিন্ন জায়গায় নামের আগে ‘হযরত আহমদ ছফা’, ‘আল্লামা আহমদ ছফা’, ‘মহাত্মা আহমদ ছফা’ ও ‘প্রকৃতির পুত্র হযরত আহমদ ছফা’ ব্যবহার করেছেন। এত দিন ঐ ভক্তিবাচক শব্দগুলো কেবল ইসলামী প্রজ্ঞাসম্পন্ন মনীষীর ক্ষেত্রে ব্যবহার দেখা যেত। জ্ঞানগুরুর প্রতি এই সম্বোধন বাংলা সাহিত্যে নতুনমাত্রা সংযোজন করেছে।
বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে বুদ্ধিজীবীদের আদর্শিক দেওলিয়াপনা ও নতজানু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সুক্ষ্ম ও তীক্ষ্ম সমালোচনাও রয়েছে পশু, পাখি, বৃক্ষ ও পুষ্পের চরিত্র দিয়ে চিত্রকল্প তৈরির মধ্য দিয়ে। মানব প্রকৃতি ও চরিত্রে পশুবৃত্তির প্রভাব ও আলামতের বিষয়ের যুৎসই আলোচনা করেছেন তীর্যক উপমায়। লেখক এক জন ছফাভক্ত হিসেবে আহমদ ছফার ‘পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ পাঠকালে যে অনুভূতি অন্তর থেকে খাতার পাতায় জমা করেছেন তা-ই বেবাক লোকের কাছে জানিয়ে দেয়ার কোশেশ গবেষণাধর্মী এই ‘আহমদ ছফার সংসার’ নামক গ্রন্থটি। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী আহমদ ছফার লেখার মর্ম ও মূল্য তার জীবদ্দশায় অনেকে বুঝতে পারেনি। তাঁর জবানিতেই এই আক্ষেপ ও অপেক্ষার বাণী বর্ণিত হয়েছে-‘আজ থেকে যদি দশ বছর, বিশ বছর, একশ পঞ্চাশ বছর বাদে, আমার মৃত্যুরও পরে কোন প্যাশনেট তরুণ যদি আমার কাজের কোন একটা অর্থ খুজতে চেষ্টা করে, তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করা উচিত।’ ছফার মৃত্যুর বিশ বছরের ভিতরে সেই আকাক্সিক্ষত তরুণ গবেষকের ভূমিকাই পালন করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক মোহাম্মদ আলম চৌধুরী।

আহমদ ছফা ব্যক্তিগত জীবনে প্রথাগত ঘর-সংসার করেন নি। কিন্তু প্রকৃতির নানা উপাদানের মধ্যে নিজের সংসার পেতেছিলেন অবলীলায়। গবেষক মোহাম্মদ আলম চৌধুরী মনে করেন, ছফার চিন্তা আগামী দিনের স্বপ্নবাস্তবায়নে, সংকট মোকাবেলায়, সুস্থচিন্তার লালনে-অনুপ্রেরণার অনাবিল আলোর উৎস হিসেবে থাকবে। বইটি অনুসন্ধিৎসু মনের খোরাক যোগাবে। যেসব গবেষক আগামী দিনে আহমদ ছফার সৃষ্টিকর্ম থেকে পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করবেন তাদের জন্য এটি মূল্যবান একখানা রেফারেন্স বুক হিসেবে সমাদৃত হবে। বইটি বিগত ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের আড়ত ‘বাতিঘর’-এ প্রকাশিত হয়েছে। বাতিঘরসহ সারা দেশের অভিজাত বই বিপনীতে বইটি পাওয়া যাবে।

লেখক: মুহাম্মদ নুরুল আলম আযাদ, প্রভাষক, দেওয়ানহাট সিটি কর্পোরেশন কলেজ, চট্টগ্রাম।

সর্বশেষ সংবাদ

ভারুয়াখালীতে স্কুলছাত্রকে অপহরণের চেষ্টা  ‘ভাই গ্রুপের’

আজ আন্তর্জা‌তিক মাতৃভাষা দিবস

মুজিবুর রহমান ও এমপি জাফরের দোয়া নিলেন ফজলুল করিম সাঈদী

মাতৃভাষার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে রাখাইনদের নতুন প্রজন্ম

শুদ্ধ সংস্কৃতির চর্চার মধ্য দিয়ে অপশক্তিকে রুখতে হবে- মেয়র মুজিব

একুশে ফেব্রুয়ারি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

টেকনাফে সাড়ে ১৫ লক্ষ টাকার স্বর্ণালংকার উদ্ধার

চকরিয়ায় শিশু ও নারী নির্যাতন মামলার ৫ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামী গ্রেপ্তার

২০ হাজার ইয়াবাসহ দুইজন আটক

এডভোকেট রানা দাশগুপ্তের সাথে কক্সবাজার জেলা নেতৃবৃন্দের মতবিনিময়

ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ঈদগাঁওতে পুজা কমিটির সম্মেলন নিয়ে সংঘাতের আশংকা

কক্সবাজার সিটি কলেজে শিক্ষকদের জন্য আইসিটি প্রশিক্ষণ শুরু

উখিয়ায় হাতির আক্রমণে রোহিঙ্গা যুবকের মৃত্যু

এস আলম গ্রুপের ৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকার কর মওকুফ

মালয়েশিয়ায় ভবনে আগুন : বাংলাদেশিসহ নিহত ৬

মহেশখালীতে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে মোস্তফা আনোয়ার

চকরিয়ায় ইয়াবাসহ দুই ব্যবসায়ী আটক

চকরিয়ার চেয়ারম্যান পদে ২ জনসহ ৫ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল

কোর্টরুমে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে : প্রধান বিচারপতি