জঙ্গিরা কি মাদ্রাসা থেকেই আসে?

ডেস্ক নিউজ:
মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাই সচরাচর জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে— এমন একটি ধারণা সমাজে প্রচলিত। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের তুলনায় সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার হার বেশি।
দেশে জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়া তদন্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য, সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সাধারণত ইসলাম সম্পর্কে জানাশোনা অনেক কম থাকে। ফলে জঙ্গিবাদের ইন্ধনদাতারা ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে খুব সহজেই তাদের দলে ভেড়াতে সক্ষম হয়। পুলিশ বলছে, নতুন করে জঙ্গিবাদে দীক্ষিত ব্যক্তিদের অধিকাংশই তরুণ ও আত্মকেন্দ্রিক। এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক জঙ্গিদের মধ্যে ৮০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ২২ বছরের মধ্যে।
যদিও বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আসা ব্যক্তিরাই জঙ্গিবাদের পথিকৃৎ হিসেবে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শাফি মো. মোস্তফা। তিনি বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের ওপর পিএইচডি করছেন। তিনি বলেন, ‘মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার হার কম হলেও দেশে জঙ্গিবাদের সূচনা তাদের হাত ধরেই এবং তারাই জঙ্গিবাদে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে।’ জঙ্গিবাদ বিষয়ে তার এ পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই তিনি এসব কথা বলছেন।
কুখ্যাত জঙ্গি নেতা শায়খ আব্দুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের জসিম উদ্দিন রহমানিয়াসহ আরও অনেক জঙ্গি নেতাই পড়ালেখা করেছেন মাদ্রাসায়। জঙ্গিবাদে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করে থাকে যে জঙ্গি নেতারা, তারা সাধারণত মাদ্রাসা থেকে আসা উল্লেখ করে শাফী বলেন, ‘এসব ব্যক্তি কোরান-হাদিস সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখে। তারা জানে, কীভাবে এর ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে অন্যদের মগজ ধোলাই করা যায়।’
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চিফ ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘একজন মানুষ কোন পরিবেশে বেড়ে উঠছে, সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত যারা রক্ষণশীল সমাজে বেড়ে ওঠে, তারাই জঙ্গিবাদের সহজ শিকারে পরিণত হয়।’
এ পর্যন্ত আটক হওয়া জঙ্গিদের মধ্যে কওমি মাদ্রাসা থেকে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম। তারপরও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা যেন জঙ্গিবাদে জড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়টি নজরদারিতে রাখা উচিত বলে মনে করছে পুলিশ। যদিও কওমি মাদ্রাসা ও এর পাঠ্যসূচি সম্পর্কে পুলিশের তেমন কোনও ধারণা নেই। এসব মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমে কাউকে জঙ্গিবাদে আগ্রহী করে তোলার মতো কোনও উপাদান রয়েছে কিনা, সেটাও জানা নেই পুলিশের।
পুলিশের অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম নিয়ে আমরা কওমি মাদ্রাসার বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, তাদের পাঠ্যক্রমে ক্ষতিকর কিছু নেই।’ জঙ্গিবাদ কমানোর জন্য প্রয়োজনে মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হবে এবং এই পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে, তাদের পরিবার ও শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই করে এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে কিছু বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেয়েছে পুলিশ। বাংলাদেশ পুলিশের সদর দফতরের একটি সূত্র জানিয়েছেন, উগ্রবাদে দীক্ষিত হওয়ার জন্য অন্য যেকোনও কিছুর তুলনায় পরিবেশ, বন্ধু ও পরিচিতজনরা তরুণদের বেশি প্রভাবিত করে থাকে। এর পেছনে শিক্ষার ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম, সেটা সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থাই হোক আর ইংরেজি মিডিয়ামই হোক আর মাদ্রাসাই হোক।
পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, আটক জঙ্গিদের প্রায় ৩৫ শতাংশ সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আসা। এসব জঙ্গিদের ৩০ শতাংশ মাদ্রাসা থেকে ঝরে পড়া এবং ২০ শতাংশের পড়ালেখা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। বাকি ১০ শতাংশ জঙ্গি নিরক্ষর। অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান শফিকুল ইসলাম অবশ্য বলেন, ‘এটা পুরো চিত্রকে ধারণ করে না। কারণ, জঙ্গিদের অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময় আত্মসমর্পণ না করে মৃত্যুকে বেছে নিয়েছে।’
জঙ্গিবাদ নিয়ে গবেষণার পরিকল্পনার জন্য পুলিশ এখন গবেষক, জঙ্গিবাদবিরোধী বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ নিচ্ছে। জঙ্গিদের মোকাবিলা করার জন্য তারা আটক ও নিহত ৫শ জঙ্গির জঙ্গিবাদে দীক্ষিত হওয়ার প্রবণতা ও মানসিকতাসহ যাবতীয় বিষয়ে গবেষণার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
ইংরেজি মাধ্যমের কয়েকজন শিক্ষক জঙ্গিবাদ ছড়াচ্ছেন
ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই ধনী বা সচ্ছল পরিবার থেকে আসা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এসব স্কুলের কিছু শিক্ষক প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট করতে ভূমিকা রাখছেন। শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা দেখেছি, বেশকিছু শিক্ষক রাজনৈতিকভাবে উদ্বুদ্ধ এবং জঙ্গিবাদের প্রতি তারা সহানুভূতিশীল। তাদের জন্য শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট করা অনেক সহজ।’
এ বিষয়ে পুলিশের কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য না থাকলেও পুলিশ মনে করছে, শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করতে এসব শিক্ষক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে যোগ দিয়ে থাকতে পারেন। কিছু কিছু স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটিতেও জঙ্গিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তি থাকতে পারেন বলে করছে পুলিশ।
জঙ্গিবাদে ভূমিকা রয়েছে পরিপার্শ্বের
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও শিক্ষাবিদরা জানিয়েছেন, জঙ্গিবাদের দিকে কাউকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে শিক্ষা বা প্রাতিষ্ঠানিক অন্য কোনও উপাদানের চেয়ে পারিপার্শ্বের ভূমিকা অনেক বেশি।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান, ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘একজন মানুষ কোন পরিবেশে বেড়ে উঠছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। রক্ষণশীল সমাজ থেকে উঠে আসা ব্যক্তিদের ভুয়া বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভুল বুঝিয়ে জঙ্গিবাদের প্রতি আকৃষ্ট করা সহজ। কিন্তু আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট করা কঠিন।’
সিটিটিসি ইউনিটের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কোনও বিষয় অন্তর্ভুক্ত নেই। তিনি বলেন, ‘এ কারণেই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা দেশপ্রেম ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ সম্পর্কে অসচেতন।’
সিটিটিসির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদেরও বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে পড়ানো হয় না। তারা মাতৃভূমির তুলনায় পশ্চিমা দেশগুলো সম্পর্কে বেশি জানে। ফলে তারাও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসলামের ইতিহাস, সংস্কৃতি কিংবা পশ্চিমা ইতিহাস ও সংস্কৃতির শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীকে দেশপ্রেমিক হিসেবে তোলার জন্য যথেষ্ট নয়। তারা (শিক্ষার্থীরা) যদি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিষয়ে না-ই জানে, তবে তাদের মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা গড়ে উঠবে কীভাবে? এ ধরনের শিক্ষার্থীদেরই জঙ্গিবাদে সহজে উদ্বুদ্ধ করা যায়।’
জঙ্গি প্রতিরোধে নতুন পরিকল্পনা
জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন গোপনে জঙ্গিবাদে দীক্ষিত করার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে অভিযানে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জঙ্গিদের শীর্ষ ও মধ্যম সারির আস্তানাগুলো আমরা প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছি। কিন্তু জঙ্গি নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় তারা তৃণমূলে আবারও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।’
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জঙ্গিদের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ায় বা শনাক্ত করে ফেলায় জঙ্গিরা এখন তাদের পরিবারের সদস্যদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে ফেলছে। তারা যখন অন্যদের জঙ্গিবাদে দীক্ষিত করতে ব্যর্থ হয়, তখনই তারা এভাবে পরিবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে।’ চট্টগ্রামে আত্মঘাতী ভেস্টসহ আটক দুইজন কিশোর জঙ্গি এ ধরনের চর্চারই ফল বলে উল্লেখ করেন তিনি। জঙ্গিদের নির্মূলে তাই এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিবারের দিকে বেশি মনোযোগী বলে জানান তিনি।
অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান বলেন, ‘পরিবারের কোনও সদস্যের আচরণ দেখে তার পরিবার সহজেই বুঝতে পারে যে কেউ নতুন করে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছে কিনা। জঙ্গিবাদে এমন নতুন দীক্ষা পাওয়া কোনও সদস্য পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ধর্ম নিয়ে আগের তুলনায় বেশি কথা বলবে। বাবা-মায়ের সঙ্গে ধর্ম নিয়ে কথা কাটাকাটিও হতে পারে তাদের।’
তিনি আরও বলেন, এর পরের পর্যায়ে সাধারণত নতুনভাবে দীক্ষিত জঙ্গিরা ঘুরতে যাওয়া বা পড়ালেখার নামে কয়েকদিনের জন্য বাড়ি থেকে দূরে থাকে। পরে তারা নিখোঁজ হয়ে যায়। জঙ্গিরা একে বলে ‘হিজরত’।
কোনও পিতামাতা তার সন্তানের মধ্যে এ ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করলে তাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করার পরামর্শ দিয়েছেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘পিতা-মাতার উটিত তার সন্তানদের সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও ধর্মীয় বই নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা করা। কারণ এসব ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা বই সন্তানদের চিন্তা-ভাবনা বদলে দিতে সহায়ক হতে পারে।’

কক্সবাজার নিউজ সিবিএন’এ প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।

সর্বশেষ সংবাদ

বাংলাদেশি স্বামী পেয়ে সুখী মালয়েশীয় নারীরা

টেকনাফে পুলিশের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুইজন নিহত

জিএম রহিমুল্লাহর প্রথম জানাযা সম্পন্ন, শোকাহত জনতার ঢল

সৌদিআরবে জিএম রহিমুল্লাহর গায়েবানা জানাজা

মহাজোটের মনোনয়নে ইলিয়াসসহ জাপার ৯ এমপি বাদ!

বৃহস্পতিবারের মধ্যে চূড়ান্ত হতে পারে মহাজোটের আসন বণ্টন

ভোটের আগে ওয়াজ মাহফিল বন্ধ

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আজ

নড়াইলে মাশরাফির প্রচারণা শুরু

৬৪ আসনে মনোনয়ন তুলেছে জামায়াত

বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম মিয়া গ্রেফতার

তিন মাস পর কারামুক্ত শহিদুল আলম

কাবুলে ঈদে মিলাদুন্নবীর জমায়েতে বোমা হামলায় নিহত ৪০

হেফাজত কাউকে সমর্থন দেবে না : আল্লামা শফী

কক্সবাজার শহরে যানজট নিরসনে জেলা পুলিশের চেকপোস্ট স্থাপন

নির্বাচনী সমীকরণ : আসন কক্সবাজার-৪

জিএম রহিমুল্লাহর ইন্তেকালে নেজামে ইসলাম পার্টি ও ইসলামী ছাত্রসমাজের শোক

আদর্শ নেতৃত্ব সৃষ্টির জন্য সৎকর্মশীলদের সান্নিধ্য অপরিহার্য

শেষ মুহূর্তে তারুণ্যের শক্তি দেখাতে চান সফল উদ্যোক্তা আনিসুল হক চৌধুরী সোহাগ

রামুতে মাসব্যাপী পণ্য প্রদর্শনী মেলা উদ্বোধন