ডেস্ক নিউজ:

জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণে দেশের নারীরা এগিয়ে থাকলেও এ বিষয়ে অনীহা রয়েছে পুরুষদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জন্ম নিয়ন্ত্রণের সুফল ও পদ্ধতি নিয়ে নিয়মিত প্রচারের ফলে এ বিষয়ে নারীদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। এসব পদ্ধতি ব্যবহারে দিন দিন তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। কিন্তু সেই হিসেবে পুরুষদের অংশগ্রহণ ততটা আশাব্যঞ্জক নয়। তাদের মধ্যে এখনও জন্ম নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি গ্রহণে ব্যাপক অনীহা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা এটিকে নারীদের বিষয় বলে মনে করে নারীদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে দায় এড়াতে চান। এই পদ্ধতি গ্রহণে পুরুষের পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরুষের যৌন সক্ষমতা কমে যাওয়া নিয়ে অমূলক ভয় এবং অনাগ্রহই দায়ী।

জন্ম নিয়ন্ত্রণে পুরুষদের আগ্রহী করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পোস্টারসন্তান ধারণে সক্ষম নারী ও পুরুষদের জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণের সাতটি পদ্ধতি রয়েছে। পরিবার পরিকল্পনার আধুনিক পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে, খাবার বড়ি, কনডম, ইনজেকশন, ইমপ্ল্যান্ট, আইইউডি, টিউবেকটমি এবং এনএসভি। এগুলোর মধ্যে নারীদের জন্য পাঁচটি পদ্ধতি– খাবার বড়ি, ইনজেকশন, ইমপ্ল্যান্ট, আইইউডি, টিউবেকটমি এবং পুরুষের জন্য দু’টি পদ্ধতি– কনডম ও এনএসভি।

ঢাকা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ২০১৬ সালের জুলাই থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে আইইউডি সেবা নিয়েছেন ২০ হাজার ২০৮ জন নারী। ইমপ্ল্যান্ট করেছেন ২১ হাজার ২১৭ জন, ইনজেকশন নিয়েছেন এক লাখ ১ হাজার ৯৯ জন, খাবার বড়ি নিয়েছেন দুই লাখ ৭১ হাজার ৫২৯ জন এবং টিউবেকটমি (বন্ধ্যাকরণ) গ্রহণ করেছেন পাঁচ হাজার ২৩০ জন নারী। অন্যদিকে, পুরুষদের মধ্যে কনডম নিয়েছেন ৮১ হাজার ৬৯৬ জন এবং বন্ধ্যাকরণ করেছেন ১১ হাজার ৬৫১ জন।
পরিবার পরিকল্পনা ঢাকা কার্যালয়ের উপ পরিচালক মীর্জা কামরুন নাহার বলেন, ‘জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলোর মধ্যে খাবার বড়ি এবং কনডম সবসময় নেওয়া যায়। ইনজেকশন তিন মাস পরপর, ইমপ্ল্যান্ট ৩-৫ বছর পরপর, আইইউডি সেবা আট বছর পরপর নেওয়া যায়। এনএসভি সেবা নিতে পুরুষের খুব অল্প সময় লাগে। তেমন কোনও কাটা-ছেঁড়া হয় না। কিন্তু বেশিরভাগ পুরুষই এই সেবা নিতে চান না। তারা মনে করে যে, এটি করলে তাদের যৌনক্ষমতা হারিয়ে যাবে। এমনকি নারীরাও মনে করেন, তাদের স্বামীর যৌন সক্ষমতা কমে যাবে, তাই তারা স্বামীকে এই পদ্ধতিটি নিতে দিতে চান না।’

তিনি আরও বলেন, ‘টিউবেকটমি সেবা নিতে নারীদের অপারেশন করাতে হয়। এরপর তাদের রেস্ট নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। তাদের জন্য আইইউডি সেবাটি সবচেয়ে ভালো। কিন্তু প্রচারের অভাবে নারীদের এই সেবাটি গ্রহণের হার কম। এই সেবার মাধ্যমে আমরা ইউটেরাসে কপার তার পরিয়ে দেই। এতে স্পাম সঠিক জায়গা পর্যন্ত পৌঁছাতে বাধা পায়। এই সেবা নিলে হরমোনের কোনও সমস্যা হয় না। শিক্ষিত নারীরা বেশি আইইউডি সেবা নেন। প্রচারের অভাবে এই সেবা থেকে বঞ্চিত থাকে অনেকেই।’
তিনি বলেন, ‘গর্ভপাত করার চেয়ে খাবার বড়ি বা ইনজেকশন নিয়ে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা বেশি ভালো। আমরা অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সন্তান জন্মদানের জন্য কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করি। সেখান থেকে তাদের দুই বছর পর গর্ভধারণের ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়। একটি গবেষণায় দেখেছি, প্রতি ১০০ জন মায়ের মধ্যে ৯৯ জনই নিজের ও সন্তানের সুস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে দুই বছর পর গর্ভধারণ করতে আগ্রহী থাকেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের প্রতি ৩০ জন তিন মাসের মধ্যেই ফের গর্ভধারণ করেন। দুই বছর গ্যাপ দিয়ে সন্তান ধারণ করতে হলে অবশ্যই একজন মাকে সন্তান জন্ম দেওয়ার দেড় মাসের মধ্যে পদ্ধতি গ্রহণ করতে হয়। এমনিতেই তার দুটি সন্তানের মধ্যে সব মিলিয়ে ৫-৮ বছরের গ্যাপ তৈরি হয়। এটা মায়ের সুস্বাস্থ্য, সন্তানকে ছয় মাস মাতৃদুগ্ধ পান এবং পরবর্তী সন্তানের সুস্বাস্থ্যের জন্য কাজে দেয়।’

সামাজিক বাধার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরাসরি পরিবার পরিকল্পনা সেবার কথা বললে এদেশের অনেক মানুষই তা সহজে গ্রহণ করতে চায় না তাই, আমরা প্রথমে শিশুর স্বাস্থ্য, মায়ের স্বাস্থ্য এবং পরিবারের স্বাস্থ্যের কথা বলে পরে পরিবার পরিকল্পনার কথা বলি।’
স্ত্রী ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আফরোজা খানম রুমু বলেন, ‘আমাদের দেশে মূলত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকেই পুরুষরা জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিতে চান না। বেশির ভাগ পুরুষকে এই বিষয়ে বলা হলে প্রথমেই তারা বলে, আমি কেন করব? কোনও পুরুষের দেখা যাচ্ছে পাঁচটা সন্তান আছে, এরপরও সে পদ্ধতি নিতে চায় না। কোনও নারীর দেখা যাচ্ছে সিজারিয়ান তিনটা বেবি আছে তার জন্য পদ্ধতি নেওয়া কঠিন। তার পদ্ধতি নিতে চাইলে সেক্ষেত্রে স্বামীকে ভ্যাসেকটমি করতে হবে। কিন্তু স্বামী পদ্ধতি নেওয়ার ব্যাপারে দূরে থাকতে চায়। আবার স্ত্রীও দেখা যায় স্বামী কোনও সেবা গ্রহণ করুক, সেটা চায় না। অবশ্য ২/১ জন স্বামীকে দেখা যায় নিজে থেকে আগ্রহ নিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সেবা গ্রহণ করছে। সেই সংখ্যাটা আসলেই খুবই কম।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুরুষদের এই সেবা না নেওয়ার পেছনে কাউন্সিলিংয়ের অভাব, ধারণা ও সচেতনতার অভাব দায়ী। অনেক সময় স্বামী নিজেও পদ্ধতি নেন না, স্ত্রীকেও নিতে দেন না। অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রীকে গর্ভপাত করাতে হচ্ছে। এটা করতে গিয়ে স্ত্রী স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন। মূলত জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ভুল ধারণা থেকেই এই বিপদগুলো ঘটছে।’

নারীর জন্য পাঁচ ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি থাকলেও পুরুষের জন্য মাত্র দু’টি পদ্ধতি থাকার প্রসঙ্গে ডা. রুমু বলেন, ‘পুরুষদের জন্য এত পদ্ধতির দরকারও নেই। নারীর জন্য এই পদ্ধতিগুলো বেশি সংখ্যক বের করা সোজা। মেয়েদের জন্য বড়ি, হাতের মধ্যে হরমোন দেওয়া, ব্যারিয়ার হিসেবে কপার ‘টি’ ব্যবহার করা যায়। পুরুষের ক্ষেত্রে স্পার্ম ঢুকতে বাধা দিতে কনডম ব্যবহার করলেই হয়। এছাড়া স্থায়ী পদ্ধতি নিতে চাইলে ভ্যাসেকটমি/এনএসভি করতে পারে।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •