ডেস্ক নিউজ:
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে এক ধরনের ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ২৩ নভেম্বরের চুক্তি অনুযায়ী দুমাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পুরোপুরি শুরুর ‘বাধ্যবাধকতা’ রয়েছে। কিন্তু প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর পূর্বশর্ত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের বিষয়টিই এখন পর্যন্ত ঠিক হয়নি। এর ফলে ঠিক সময়ে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়টি অনেকটা ঝুলে গেছে। কারণ জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের পরই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কী হবে, ঠিক করবে ওই গঠিত গ্রুপ।
রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে গত ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের তিন সপ্তাহের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের কথা থাকলেও এখনো সে বিষয়ে অগ্রগতি নেই। এমনকি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের কাঠামো এখনো ঠিক হয়নি বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।

আগামীকাল মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের একটি দল বাংলাদেশে আসছে। মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলটির সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকের নেতৃত্বে বৈঠক হবে। ওই বৈঠকের আলোচ্যসূচি ঠিক করতে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়। বৈঠকে পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, আগামী ১৯ তারিখ বৈঠকে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হবে। বাংলাদেশ চাইছে, জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ পূর্ণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত হোক। জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ যদি পূর্ণক্ষমতাপ্রাপ্ত না হয়, তা হলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত ও সময়সাপেক্ষ হবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ। বৈঠকে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের নেতৃত্বে কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা রাখা হবে, বিষয়টিও বাংলাদেশ উন্মুক্ত রাখবে। মিয়ানমার যদি সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাকে প্রধান করে, তা হলে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপে বাংলাদেশের নেতৃত্বে থাকবেন পররাষ্ট্র সচিব। না হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মর্যাদার কোনো কর্মকর্তা যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের নেতৃত্বে থাকবেন। ওই বৈঠকেই প্রত্যাবাসনের শর্তাবলি বা টার্মস অব রেফারেন্সের (টিওআর) খসড়া চূড়ান্ত হবে।
সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমনে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও এর বাস্তবায়নে দেশটির আন্তরিকতা নিয়ে শুরু থেকেই সংশয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। আন্তর্জাতিক চাপ কিছুটা কমে আসাই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পুরোপুরি শুরু করার ‘বাধ্যবাধকতা’ নিয়ে গড়িমসি করছে মিয়ানমার। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিয়েও বাংলাদেশের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে মিয়ানমারের। দেশটি রোহিঙ্গাদের নাগরিক মানতে নারাজ। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত রাখাইন বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী মনে করে। বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গারা বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ামারের নাগরিক।
চুক্তি স্বাক্ষরেরও পরও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা অব্যাহত রয়েছে। ফলে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রোহিঙ্গা যোগ হচ্ছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে। এ বছর ২৫ আগস্টের পর সাড়ে ৬ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর দপ্তরের মন্ত্রী তিন্ত সোয়ে অক্টোবরে বাংলাদেশ সফরকালে আন্তর্জাতিক চাপে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে তিনি শর্ত দেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ১৯৯২ সালের চুক্তির ভিত্তিতেই রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়া হবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আপত্তি করে বলা হয়, ওই সময় চ্যালেঞ্জ এবং অবস্থার সঙ্গে বর্তমান চ্যালেঞ্জ এবং বাস্তবতার মিল নেই। ওই সময় রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পোড়ানো হয়নি। তার পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নতুন চুক্তির খসড়া মিয়ানমারের মন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর পর দুপক্ষের ব্যাপক দরকষাকষির পর ২৩ নভেম্বর চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ১৯৯২ সালে সম্পাদিত সমঝোতাকেই এবারের চুক্তির ভিত্তি ধরা হয়।
চুক্তিতে ২০১৬ সালের পরে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তাদের ফেরত নেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু ২০১৬ সালের আগে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে, তাদের বিষয়ে কোনো কথা বলা হয়নি। দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার কথা থাকলেও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া শেষ করার জন্য একটা সময়সীমা চুক্তিতে উল্লেখ রাখার চেষ্টা করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু মিয়ানমার রাজি হয়নি। চুক্তি না মানলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে কোনো ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ নেওয়া যাবে কিনা, চুক্তিতে তা নিয়েও স্পষ্ট কোনো ক্লজ বা ধারা নেই।
তা ছাড়া জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা বাংলাদেশের ছিল। মিয়ানমার তাতেও রাজি হয়নি। মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয়ভাবেই সমস্যা সমাধানের কথা বলেছে। ফলে আন্তর্জাতিক কোনো পক্ষ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকতে পারবে না।
আমাদের উখিয়া প্রতিনিধি জানান, উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে পরিদর্শনে এসেছেন ১৫ দেশের ১৯ জন দূত। দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনের বিশেষ আমন্ত্রণে তারা বাংলাদেশে এসেছেন। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেনের সঙ্গে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় বসেন। এ সময় জেলাপ্রশাসক রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য-বস্ত্র, বাসস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, স্যানিটেশন, নিউট্রিশনসহ বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করেন রাষ্ট্রদূতদের। তারা এসব অগ্রগতি সম্পর্কে জেনে সন্তুষ্টি প্রকাশ এবং বাংলাদেশ সরকারে প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। পরে দুপুর দেড়টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এ সময় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিভিন্ন ব্লক ঘুরে দেখেন এবং নির্যাতিত কিছু রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •