ডেস্ক নিউজ:

পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের সংঘাতময় পরিস্থিতি নিরসনে শান্তিচুক্তি সইয়ের ২০ বছর পার হলেও মূল সমস্যার সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা। তিনি বলেন, ‘চুক্তির অধিকাংশ ধারা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।’

জানা গেছে, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে এই শান্তিচুক্তি সই হয়েছিল। আজ (২ ডিসেম্বর) শান্তিচুক্তি সইয়ের ২০ বছর পূর্তি। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন শেখ হাসিনা সরকার শান্তি চুক্তির মাধ্যমে তিন পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে এনেছিল। সরকার তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির পক্ষে আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা চুক্তিতে সই করেন।

দিবসটি সম্পর্কে জানতে চাইলে সন্তু লারমা বলেন, ‘চুক্তি সইয়ের দুই দশক হতে চললেও মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার সরকার বলেছিলেন, চুক্তির প্রতিটি ধারা বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্তু গত ৯ বছর ধরে তারা ক্ষমতায় থাকলেও চুক্তির মৌলিক বিষয় বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। বরং বর্তমান সরকার শান্তি চুক্তিবিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী কাজ করছে।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য এলাকা থেকে অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়নি, পাহাড়ে সেনাশাসন বন্ধ করা হয়নি, তিন পার্বত্য জেলার সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা, পুলিশ, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, বন ও পরিবেশ, পর্যটন, মাধ্যমিক শিক্ষা, উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়গুলো এখনও জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন কার্যকর করা হয়নি, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়নি, সেটেলার বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে এবং ভারত থেকে আসা শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তুদের নিজ নিজ জায়গায় পুনর্বাসন করা হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ১৮৬১ সালের পুলিশ অ্যাক্ট, পুলিশ রেগুলেশন আইন, ১৯২৭ সালের বন আইন ও ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনসহ ওই এলাকার জন্য প্রযোজ্য অন্যান্য আইন সংশোধনের দাবি জানানো হয়। কিন্তু সরকার আজও এসব আইন সংশোধনের কোনও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। অথচ নিজেদের স্বার্থে সরকার দ্রুত তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন-২০১৬ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন-২০১৪ জাতীয় সংসদে পাস করেছে।’

জানতে চাইলে সন্তু লারমা বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয় শান্তি চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণভাবে, ১৫টি আংশিক এবং বাকি ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান আছে। কিন্তু সরকারের এ বক্তব্য ঠিক নয়। কারণ এখনও পর্যন্ত মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে।’

এদিকে, পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতির আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে উল্লেখ করেছেন, ‘তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান এবং রাঙ্গামাটি নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপার আধার। যুগযুগ ধরে পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বর্ণিল জীবনাচার, ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি এ অঞ্চলকে বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। পার্বত্য জেলাগুলোর আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তি চুক্তি সইয়ের ফলে পার্বত্য জেলাসমূহে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটে।’

বাণীতে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে। পার্বত্য জেলাসমূহের উন্নয়ন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এবং প্রিয় মাতৃভূমির উন্নয়নে আমি দলমত নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানাই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন সবার মিলিত প্রচেষ্টায় তা বাস্তবায়ন সম্ভব বলে আমি মনে করি।’

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বাণীতে উল্লেখ করেছেন, ‘১৯৭৫-পরবর্তী অগণতান্ত্রিক সরকারগুলো পার্বত্য অঞ্চলের সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থে বাঙালি ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। খুন, রাহাজানি, অত্যাচার-অবিচার, ভূমি জবরদখল এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার এ অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে। শান্তিচুক্তির মাধ্যমে এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জাতিগত হানাহানি বন্ধ হয়। অনগ্রসর ও অনুন্নত পার্বত্য অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয় শান্তি ও উন্নয়নের ধারা। ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার অর্জন এই চুক্তির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির স্মারক।’

প্রধানমন্ত্রী বাণীতে আরও উল্লেখ করেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন করেছে সরকার। এ অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, অবকাঠামো, মোবাইল নেটওয়ার্কসহ সবখাতের উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সরকার রাঙ্গামাটিতে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছে। ভূমি বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বোর্ডের কার্যক্রম আরও গতিশীল ও সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে আমাদের সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন-২০১৪ প্রণয়ন করেছে। পার্বত্য জেলাগুলোর নৈসর্গিক সৌন্দর্য সমুন্নত রাখা ও পর্যটন শিল্পের প্রসারেও নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপের ফলে আজ পার্বত্য জেলাগুলো কোনও পিছিয়ে পড়া জনপদ নয়। দেশের সার্বিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় এ অঞ্চলের জনগণ সম-অংশীদার।’

প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, ‘বিএনপি-জামাত জোট সরকার ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে ঐতিহাসিক এই শান্তি চুক্তির চরম বিরোধিতা করে। তারা পার্বত্য অঞ্চলকে পুনরায় অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল। তাদের সেই হীন উদ্দেশ সফল হয়নি। আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সর্বত্র শান্তি বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •