আলমগীর মাহমুদ::

জীবনীর অপ্রিয় সত্যটি ধারন করেছি মুনীর চৌধুরীর রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকের ইব্রাহিম কার্দির জবানীতে ”মানুষ যে জীবন চায়, তাহা পায় না। যাহা চায় না সেই জীবনীর জিঞ্জির পরে পিঞ্জারায় আবদ্ধ পাখির মত ডানা ঝাপটাইতে ঝাপটাইতে হয় তার মরণ”।

নিয়তির নির্মমতায় এখন কেউ ফোন করলেই ভয় পাই, না জানি আবার কোন দু:সংবাদ মোর! বন্ধুদের কাছে রটে আছে। সে ফোন ধরে না। এই অভিদোষও মাথা পেতে নেয়া ছাড়া উপায় নেই !!

পৃথিবীতে যাদের ভালবাসা পরীক্ষার সুযোগ এসেছে, তাদের আমি ভাগ্যবানই মনে করি। যারা জীবনে ছেলে সন্তান, আদরের মানুষটির কাছে আদরের গভীরতার পরীক্ষা নিয়েছে, জেলখানায় অথবা হাসপাতালের বিছানায়,তারঁ আর পৃথিবীর প্রতি মোহ থাকার কথা নয়। ‘চানকুয়াইল্লা’ মানুষের এ পর্যন্ত মিলল না দেখা।

ভালুকিয়া পালং। উখিয়া উপজেলার প্রাকৃতিক শোভায় দৃষ্টিনন্দন গ্রামে পূর্ব পুরুষের খামার বাড়িতেই আমরা তিনভাই দু’বোনের জন্ম।বড়ভাইয়ের পৃথিবীর বয়স ছিল চল্লিশদিন মাত্র।

মা ‘বড়ভাইয়ের নাম রেখেছিলেন জাহাঙ্গীর। সে মারা যাবার পর আর কোন সন্তানের দেখা না মিলায় মন্দভাগ্য নির্বাসনে ‘মা’ অহরাত্রি আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতে রইলেন। সাথে বিভিন্ন রকম মানতের দারস্ত।

মায়ের জবানীতে শুনলাম। একদিন মা’ জায়নামাজে কান্নাকাটিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লেন আঁচ করতে পারেননি। হঠাৎ কে যেন একজন আমার মা’র আঁচলে ক’টি স্বর্ণের তাবিজ বেঁধে দিয়ে বলে যায় তোর উপর আল্লাহর রহমত হয়েছে।এরপর জন্ম নিলাম আমি,শাহজাহান, শাহেন আরা,জাহানারা।

জাহানারা জন্মের পর মা’অসুস্থতায় মৃত্যু শয্যায়।আমার চাচী লায়লা লালনের দায়িত্ব নেন।মাকে ভারে তুলে কক্সবাজার চিকিৎসার জন্য নেবার কালে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে শুনলাম,”অ আল্লাহ পৃথিবীর আখেরাতের কর্ণধার, তোর দান, দেয়া নেয়ামত, আমি সম্রাট শাহজানের মেয়ের জীবনীর সাথে মিলিয়ে নাম রেখেছিলাম ‘জাহানারা’।

আমিতো মৃত্যু পথিক।সেতো পৃথিবীতে কষ্ট পাবে।জাহানারার মত বেড়ে উঠা হবে না তার।তোমার দান আজ আমি তোমার কাছে ফেরত দিলাম। তোমার ফুল বাগানে আমার মেয়েটারে তুমি গ্রহন করো বলে নীরবে ছেড়ে দিলেন দু’চোখের জল।

তখন মা’র শরীরে পানি জমে ফুলে গেছে। হাঁটতে পারেন না।মা’র এই দোয়ায় নিকটতম সময়ে বোনটি মারা যায়।আমার চাচী যথেষ্ট ব্যথিত হয়ে খবর পাঠায়। তখন মা’কে নিয়ে আমরা হাসপাতালে। আমরা দু’ভাই দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় শ্রেনীতে।

মা’কে হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই বড় করে বলতে শুনলাম “আলহামদুলিল্লাহ “ইন্নালিল্লাহে ওয়াইন্নাহ ইলাহি রাজেউন।চোখে জলের ধারা। তখন শুধুই বুঝতাম মা’ কষ্ট পেয়েছে।আমরাও উনার সাথে কাঁদতাম।

আমার দাদা মহলুছুর রহমান মাষ্টার মারা যাবার কালে উনার পিতা আবদুর রশীদ মাষ্টার জীবিত ছিলেন।

দাদার আগে বাপ মারা গেলে ছেলেরা সম্পত্তি হতে আইনি করনে বঞ্চিত হতো মুসলিম আইনী বিধানে। বাবারা তিনভাই পড়ে বঞ্চিতের খাতায়।উনাদের চাচা সুলতান মাষ্টার ইয়াতীম ছেলেদের দয়াপরবশ হয়ে দেখভাল করতেন।

এরপরের ইতিহাস কারবালা।আমরা দু’ভাই জীবনের কঠিন বাস্তবতা পেরিয়ে দাঁড়াই। ভাই নেপাল সরকারের সাথে চুক্তির ভিত্তিতে নেপাল দেশে গার্মেন্টস চালু করে।দেশে ফিরে নিজে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালীক বনে। শিল্পেরপতি হয়।ষোলকলায় পূর্ণ জীবন।বড়ছেলে শাহরাজ দশমশ্রেণির ছাত্র।তওসিফ পঞ্চম।মেহেনাজ প্রথম শ্রেণিতে।

১৭ই রমজান বদর দিবসে রোজা নিয়ে সম্পূর্ন সুস্থতায় নিজের গোসল নিজে সেরে নিজ বিছানায় বসে বালিশে হেলানে বাবা নেন বিদায়। বিরাশি বছর ছিল সেদিন উনার বয়স।

শাহজাহান বাবার বদলি হজ্বে গিয়ে চৌদ্দ /৯/১৭ দিবাগত রাতে হেরেমশরিফে তাহাজ্জুদ আদায় শেষে তওয়াফ রত।ফজরের আজান হলে ফরয নামাজের দ্বিতীয় রাকাতের প্রথম সিজদায় পড়ে আর উঠেনি

বিশমিনিট পর পুলিশ এসে শরীরে হাত দিতেই সে সিজদা থেকে পড়ে যায়।মৃত্যু নিশ্চিত হয়।সেদিন শুক্রবার আসর নামাজের পর হেরেমশরিফে জানাযা শেষে তার শেষ ইচ্ছানুযায়ী ওখানেই করা হয় সমাহিত।

যাবারকালে স্ত্রী,সফর সাথী খোরশেদ,মোয়াল্লেমকে বলে যায় মৃত্যু হলে তাকে যেন ওখানেই সমাহিত করা হয়।চতুদিকে শোকের মাতম।

আমি এসেছি ছেলেগুলোরে চট্টগ্রাম তাদের বাসায় সময় দিতে।ভাইবোন সবাই ছেকে ধরেছে..শাহজানের ছোট মেয়ে মেহেনাজ দৌঁড়ে এসে বলতে রয়..বড়বাবা,বড়বাবা ফেইসবুকে আপনি শুধু আমার বাবাকে নিয়ে লিখবেন।

জানতে চাইলাম তর বাবা কোথায়? কেন জানেন না,ইশারায় দেখায় কবরের ভেতর।

কে বলেছে?. .চেহেরা মলিন করে কয়, কেন আমি ভিডিও তে দেখছি না,আমার আব্বুরে কবরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে।

বললাম যাবার সময় কথা হয়েছে? আব্বু গেছে রাতের তিনটায় অতক্ষণ আমি না ঘুমিয়ে থাকতে পারিনি।আমার আম্মুর কাছে শুনেছি, আব্বু ঘুমের মধ্যে আমারে সমস্ত শরীর চুমুর পর চুমু দেয়।আদর শেষে যাবার সময়ে হাতে একটা কামঁড় দিয়ে বাসা থেকে বেরুয়।

পাশে বিছানায় শুয়ে মেজছেলে তওসিফ বেদনার চেহেরায় ছিল অপলক দৃষ্টিতে…হঠাৎ বোনের দিকে তাঁকিয়ে আক্ষেপেই কইল…’শেষ আদরটাতো তুমিই পেয়ে গেলে ! !

লেখক : উখিয়া কলেজের সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষক।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •