জসিম মাহমুদ, টেকনাফ:
মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর হাতে নিপীড়নের শিকার হয়ে অন্তত ২০ হাজার রোহিঙ্গা টেকনাফের লম্বাবিল সীমান্তবর্তী নাফ নদীর ওপারের কুইরখালী এলাকায় অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় আছে। তারা সেখানে বৃষ্টিতে ভিজছে, রোদে পুড়ছে বলে জানিয়েছেন অনুপ্রবেশকারি সুলতান মিয়া।

তিনি শুক্রবার সকালে নাফনদী পার হয়ে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে টেকনাফের লম্বাবিল পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। তিনি জানালেন, মিয়ানমারের নাফনদী ঘেষা মংডু ও মাঝখানের পাহাড় পূর্বে বুচিডং (বুথেডং) টাউনশিপ। এ পাশ থেকে বুঝার উপায় নাই মংডুতে কি হচ্ছে। পাচঁ দিন পায়ে হেঁটে পাহাড় ঢেকিয়ে পৌছি মিয়ানমার মংডুর কুইরখালী এলাকায়। আসার পথে দেখা মিলেনি কোন মানুষ, নিশ্চুপ নির্জন সব গ্রামগুলো। যেন মনে হয় মরভুমি। ঘরবাড়ি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে আছে। রয়েছে শুধু মানুষের গন্ধ। কুইরখালীতে এসে দেখা মিলে হাজারো রোহিঙ্গাদের ঢল, যারা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষা করছে। অনুমানিক সেখানে ২০ হাজার মতো হতে পারে। তারা নৌকা না পেয়ে সেখানে সবাই কান্নাকাটি করছে। শিশুদের অবস্থা গুরুতর। তারা বৃষ্টিতে ভিজছে, রোদে পুড়ছে। তার বাড়ি মিয়ানমার বুচিডং (বুথেডং) টাউনশিপ সিন্ডিপাড়া গ্রামে।

তিনি বলেন, বুচিডং (বুথেডং) গত দুই দিন আগে আবারো নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে আগুন দিচ্ছে সেনাবাহিনী। ফলে আবারো অনেকে ভয়ে মানুষ বাংলাদেশমুখী হওয়া শুরু করেছে। এপারে এক মাস আগে আমার এক চাচতো ভাই চলে আসছিল। তার মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা দিয়ে একটি নৌকা ভাড়া করে এপারে থেকে নিয়ে পরিবারের ২০ সদস্যসহ ৩০ জনের একটি দল টেকনাফের লম্বাবিল নামক এলাকা দিয়ে এপারে প্রবেশ করি। নৌকা করে চলে আসার সময় সেখানে থাকা রোহিঙ্গা আমার উপর হুড়াহুড়ি করে বলতে শুরু করে শশু খুব অসুস্থত একটু নৌকায় করে নিয়ে যান। সবার একই অবস্থা, কাকে রেখে কাকে আনবো। চিন্তু খুল কিনারা পাচ্ছিলাম না। অবশেষে অসুস্থত আর ১০ জন নিয়ে চলে আছি। এইভাবে তারা সেখানে পরে থাকলে না খেয়ে এবং চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যু হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। মিয়ানমার বুচিডং (বুথেডং) টাউনশিপ সিন্ডিপাড়া বাজারে আমার একটি মোবাইল ফোনের দোকানছিল। সেনারা আমার দোকান লুট করে আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

তার দলের সঙ্গে আসা দিল বাহার (৩৫) নামে এক রোহিঙ্গা নারী বলেন, তিনি বুচিডং (বুথেডং) টাউনশিপ পুমালি গ্রামের বাসিন্দা। তিনিসহ ৫ গ্রামের মানুষ ৭ হাজার রোহিঙ্গা গত সপ্তাহে ভিটেমাটি ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার জন্য রওনা দিয়েছিল। পাহাড় পর্বত, বনজঙ্গল, খাল-বিল, নদী নালা পেরিয়ে ক্ষুধাতৃষ্ণায় তারা কাতর হয়ে পড়েন। গত বুধবার মিয়ানমারের মংডু কুইরখালী এলাকায় পৌছি। কিন্তু নৌকা না পাওয়ার কারনে এতোদিন আসতে পারেনি। গতকাল বিনীতি করে আরেক জনের একটি নৌকা করে এপারে প্রবেশ করি। কেননা আমা ছোট মেয়ে সমিলা খুবই অসুস্থত হয়ে পড়ে। কারণ সেখানে দুই বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছিল। তার মোট ৮ ছেলে মেয়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, তার স্বামী নুরুল আলমকে সেনাবহিনীর সদস্য ধরে নিয়ে হত্যা করেছে। এরপর থেকে সন্তানদের নিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। সেনাবাহিনী ও রাখাইনারা যেসব গ্রামে এখনো রোহিঙ্গা অবস্থান করছে তাদেরকে বর্মী ভাষায় লেখা ‘বাঙালি কার্ড’ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। কেউ তা নিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছেন। এ কারণে রোহিঙ্গা দলে দলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন।

গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে পুলিশের নিরাপত্তা তল্লাশি চৌকিতে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর কঠোর সেনা অভিযান শুরু হয়েছে রাখাইনে। জাতিসংঘ বলছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে জাতিগত নিধনের চেষ্টা করছে। এদিকে স্যাটালাইটে পাওয়া নতুন তথ্য বিশ্লেষণ করে ২৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ২৮৮টি গ্রাম সম্পূর্ণ অথবা আংশিকভাবে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

টেকনাফ হোয়াইক্যং পুথিন পাহাড়ের রোহিঙ্গা শিবিরের নেতা মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘শুক্রবার ভোর ও সকালে সীন্ত দিয়ে প্রায় পাচঁ হাজার মতো রোহিঙ্গা প্রবেশ করে এ ই পাহাড়ে আশ্রয় খুজছেন। এছাড়া প্রবেশের অপেক্ষা রয়েছে আরও ২০ হাজারের মতো, তারা সেখানে বৃষ্টিতে ভিজছে, রোদে পুড়ছে, যেকোন সময় ঢুকতে পারে বলে জানান তিনি।’

তিনি বলেন, সীমান্তে প্রবেশের অপেক্ষায় রোহিঙ্গাদের ঢল অবস্থান করছে বলে শুনেছি। অনুপ্রবেশকারি রোহিঙ্গা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার কোন সুযোগ নেই, সবাইকে এক জায়গায় রাখা হচ্ছে।

মিয়ানমারে রাখাইনে সেনাবাহিনীর সহিংসতার মুখে গত ২৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ৫ লাখ ৮২ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বলে জাতিসংঘ হিসাব দিয়েছে। তবে এ সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে ধারনা স্থানীয়দের।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •