২৩টি প্রস্তাবনায় শেষ হলো দুইদিনের জাতীয় নদী কনফারেন্স

Coxs-bazar-river-confarenc-04.jpg

বিশেষ প্রতিবেদক:
২৩টি প্রস্তাবনা তুলে ‘কক্সবাজার ঘোষণা’র মধ্যদিয়ে শেষ হয়েছে দুইদিনের জাতীয় নদী কনফারেন্স। দেশের পর্যটন রাজধানীখ্যাত পৃথিবীর দীর্ঘতম বালুকাময় সমুদ্র সৈকতের পাড়ে এই কনফারেন্সের আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল।
শনিবার বিকালে কক্সবাজার শহরের অভিজাত একটি আবাসিক হোটেলে ওই ঘোষণা পাঠ করেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মো. আতাহারুল ইসলাম।
‘কক্সবাজার ঘোষণা’য় বলা হয়েছে, আগামি ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সকল নদ-নদী ও জলাশয়ের সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করে নদ-নদী রক্ষার জন্য সকলকে সম্পৃক্ত করে দখল-দূষণ প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে টেকসই ব্যবস্থাপনায় নদী কেন্দ্রিক সুষ্টু পরিবেশ সৃষ্টি এবং নদীর উন্নয়নের মাধ্যমে প্রকৃতিবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সামাজিক কার্যক্রম ও গণমাধ্যমকে স্ব স্ব অবস্থান থেকে নদী রক্ষা কার্যক্রম আরও বেগবান করা হবে।
‘স্বাস্থ্যকর পর্যটন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক এই সেমিনারের সমাপনী অনুষ্টানে ‘কক্সবাজার ঘোষণা’য় যে ২৩টি প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয় সে গুলো হলো, (১) নদী, জলাভূমি বিষয়ক আইন নীতি ও পরিকল্পনা পূর্ণমূল্যায়ণ ও হালনাগাদ করা, (২) দেশের সকল নদ-নদী, খাল-বিল, হাওড়, বাউড়, হৃদ ও মোহনার জলজ সম্পদ এর ইনভেক্টরী করে যথার্থ পরিসংখ্যানসহ প্রকাশ করা, (৩) নদীভিত্তিক পর্যটন ও জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা, (৪) নদী পর্যটন বিষয়ে শিক্ষা ও নদী সংরক্ষন সচেতনতা কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, নদী সংরক্ষণ শিক্ষা কেন্দ্রস্থাপন এবং এতদবিষয়ে পাঠ্যক্রম (প্রথম শ্রেণী-অষ্টম শ্রেণী) নদী পর্যটন অন্তর্ভূক্ত করা, (৫) নদী ও জলাভূমি দুষণ ও দখল রোধে এতদসংক্রান্ত আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা, (৬) নদী ও তীরবর্তী এলাকায় ব্যবহারবিধি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা, জোনেশন (Zonation) করা যেমন শিল্প, আবাসন, বন্দর ও পর্যটন ইত্যাদি, (৭) জাতীয় রক্ষা কমিশনকে নদী সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নের জন্য যুগোপোযোগী করে তোলা, (৮) পরিবেশ নীতি, পানি নীতি এবং শিল্প জাতীয় যথাযথ সমন্বয় ও নদী দুষণ রোধে কার্যকরী ব্যবহারের পদক্ষেপ গ্রহণ করা, (৯) নদী পর্যটনকে পরিবেশবান্ধব করার জন্য বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড কর্তৃক River Ecotourism প্রকল্প গ্রহণ করা, (১০) চট্টগ্রামের শংখ ও হালদা নদীকে চট্টগ্রামের জাতীয় নদী হিসেবে ঘোষণা ও সংরক্ষণ করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, (১১) জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কর্মপরিধি বিস্তৃতকরণ ও বহুমাত্রিক কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা, (১২) নদী ও জলজ জীববৈচিত্র সংরক্ষনের জন্য সকল নদীর জীববৈচিত্র ও প্রাকৃতিক অভয়াশ্রম তৈরি করা, (১৩) নদী সংরক্ষণ, সুষম উন্নয়ন এবং নদীভ্রমণকে বেগবান করার জন্য সরকারি কর্মোদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগকে পৃষ্টপোষকতা প্রদান করা, (১৪) নদী পর্যটন কার্যক্রম উন্নয়নে যুবক ও নারীদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা, (১৫) আন্তর্জাতিক কনভেনশন যেমন MARPOL, RAMSAR, CBD, UNFCCC ও SDG’র জীববৈচিত্র্য, প্রকৃতি বিষয়ক নদী ও জলজভূমির প্রাকৃতিক গুণাবলি রক্ষা করা এবং নদী পর্যটন উন্নয়ন করা, (১৬) টেকসই নদী ব্যবস্থাপনায় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা ও সমন্বয় বৃদ্ধি করা, (১৭) নদী রক্ষায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ফোরামের ভূমিকা কার্যকর করে তোলা, (১৮) উদ্ধারকৃত নদীগুলো আন্তরিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং বেদখলের হাত থেকে রক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করা, (১৯) নদী রক্ষার জন্য নদী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্টান ও ব্যক্তির মাধ্যমে নদী বাঁচাতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা, (২০) সরকারের এবং সরকারের আওতাধীন সকল সংস্থার নদী বিষয়ক কাজ কর্ম আরও প্রতিশ্র“তিশীল করে তোলা, (২১) নদী বিষয়ে কাজ করে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থার সাথে বেসরকারি সংস্থার সমন্বয় নিশ্চিত করা, (২২) নদীর স্বার্থে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নদী কমিশনের মাধ্যমে সকলের নিকট তুলে ধরা এবং সিদ্ধান্ত মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং (২৩) নদী রক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য সংস্থা বা ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই সেমিনারে দুইদিনে দেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা ও গবেষক তাদের গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
শুক্রবার বিকালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মো. আতাহারুল ইসলাম প্রধান অতিথি হিসেবে এই সেমিনারের উদ্বোধন করেন। দুইদিন শেষে শনিবার বিকালে সমাপনী সেশনের সভাপতি হিসেবে মো. আতাহারুল ইসলামই সেমিনারের ‘কক্সবাজার ঘোষণা’ পাঠ করেন।
এই দুইদিনে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ড. অপরূপ চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়া, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আখতারুজ্জামান খান কবির, পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের প্রটেক্টেড এরিয়া প্ল্যানার ড. আনিসুজ্জামান খান, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সার্বক্ষনিক সদস্য মো. আলাউদ্দিন, মালয়েশিয়ার টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ও পিএইচডি রিসার্চ স্কলার মো. ওমর ফারুক অতিথি ও রিসোর্সপার্সন হিসেবে বক্তব্য রাখেন।
সেমিনারের উদ্বোধনী সেশনের প্রধান অতিথি ও সমাপনী সেশনের সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মো. আতাহারুল ইসলাম বলেন, ‘নদীকে বাঁচাতে পারলে ট্যুরিজম এমনিতেই এগিয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘তাই আমরা নদীকে ফিরিয়ে দিতে চাই তার জীবন।’
তিনি বলেন, ‘নদীই পৃথিবীর সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। জীবনের ছবির প্রাণকেন্দ্র এই নদী। কিন্তু আমরা আমাদের অস্থিত্বকে ভুলে গেছি, সভ্যতাকে ভুলে গেছি। তাই তো আমরা নদীকে বাঁচতে দিচ্ছি না। আমাদের অজ্ঞতা, আমাদের লোভ নদীকে বাঁচতে দিচ্ছে না।’
বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল পর্যটন শহর কক্সবাজারে এই কনফারেন্সের আয়োজন করেছে। দুইদিনের এই কনফারেন্স শেষে নদীকে বাঁচাতে ‘কক্সবাজার ঘোষণা’ প্রকাশ করা হয়।
প্রধান অতিথি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘নদী রক্ষা কমিশন সৃষ্টি হয়েছে একটি বিশ্বাস নিয়ে। মানুষের ঘুমন্ত, সুপ্ত চিন্তাকে জাগিয়ে দেয়ার জন্য। আর জাগিয়ে দিতে পারলে তরুণ প্রজন্ম এগিয়ে আসবে। তরুণ প্রজন্মের হাতে আমরা আগামি প্রজন্মের জন্য নদী রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে যেতে পারবো।’ নদী রক্ষায় বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কক্সবাজার শহরের একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত জাতীয় নদী কনফারেন্সের উদ্বোধনী সেশনে সভাপতিত্ব করেন পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের প্রটেকটেড এরিয়া প্ল্যানার ড. আনিসুজ্জামান খান।
এই উদ্বোধনী সেশনে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ড. অপরূপ চৌধুরী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া।
উদ্বোধনী সেশনে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের সভাপতি মো. মনির হোসেন। এছাড়াও শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ফুলটাইম মেম্বার মো. আলাউদ্দিন ও হোটেল সী ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান বাশার।
উদ্বোধনী সেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করার কথা ছিল মালয়েশিয়া সায়ন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চেন গাই ওয়েংয়ের। কিন্তু তিনি শেষ মুহুর্তে বাংলাদেশে আসতে না পারায় তাঁর পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনাটি উপস্থাপন করেন মালয়েশিয়া টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক মো. ওমর ফারুক।
বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ড. অপরূপ চৌধুরী বলেন, ‘শুধু পানি নয়, নদী আমাদের পুষ্টির আধার। বাংলাদেশের নদী জীববৈচিত্রে ভরপুর। নদীর প্রবাহ হিসেবে বাংলাদেশকে পৃথিবীতে তৃতীয় স্থানে বলা যায়। আমাজন নদী এক নাম্বার ও কঙ্গো নদী দুই নাম্বারে রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিটি পর্যটনই দূষণ তৈরি করে। সেই তুলনায় নৌ পর্যটন কম দূষণের।’ তাঁর মতে, ‘একজন নৌ পর্যটকের কারণে ৭ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়।’ তিনি পর্যটনের বিকাশে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের বেশ কিছু উদ্যোগ ও প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন।

অনুষ্টানে বিশেষ অতিথি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া চট্টগ্রামের হালদা নদী নিয়ে তাঁর গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

সেমিনারের দ্বিতীয় দিনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আখতারুজ্জামান খান কবির। সেশন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মো. আতাহারুল ইসলাম। এই দিনের বিজনেস সেশনে কী-নোট উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিশনের সার্বক্ষনিক সদস্য মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের প্রটেক্টেড এরিয়া প্ল্যানার ড. আনিসুজ্জামান খান, মালয়েশিয়ার টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক মোহাম্মদ ওমর ফারুক এবং কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আবদুর রহমান। এই সেশনের শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি সরওয়ার সাঈদ।

জাতীয় নদী কনফারেন্সের উদ্বোধনী সেশনের আগে বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের সাংগঠনিক সেশন অনুষ্টিত হয়। ওই সেশনে পরিবেশবাদী এই সংগঠনটির ৫১ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির ঘোষণা দেয়া হয়।
এবারের কনফারেন্সে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ১২০ জন নদীপ্রেমী অংশ গ্রহণ করছেন।

Top