শিশু শিক্ষায় আদর্শ শিক্ষকের ভূমিকা

jalal-uddin-lohagara.jpg

মো: জালাল উদ্দিন:

একটি ছোট্ট ঘটনা দিয়ে আমার আজকের লিখাটি আরম্ভ করতে চাই।নাসরিন আপা দ্বিতীয় শ্রেণীর ক্লাস টিসার। তার ক্লাসের আনোয়ার বেশ হাসিখুশি চঞ্চল।শ্রেণীর যাতীয় পঠনপাঠন কার্যক্রমে তার আচরণ অংশগ্রহণমূলক ও সন্তোষজনক।কিন্তু তিনি কিছুদিন পর লক্ষ করলেন আনোয়ার শ্রেণীতে প্রায় অন্যমনস্ক থাকে।তার পোশাক- আশাক ও আচরনে বেশ অগুছালো ভাবলক্ষ করলেন, তাছাড়া তার শ্রেণীর পঠনপাঠন কার্যক্রমেও বেশ অমনোযোগী বলে মনে হল।তার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলও খুব একটা সন্তোষজনক হলনা ।
এরই মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণীর ক্লাসপার্টি দিন ধার্য করা হল।নির্ধারিত দিনে শিক্ষার্থীরা তাদের নাসরিন আপার জন্য উপহার নিয়ে আসলেন।তাদের প্রত্যকের উপহার গুলো রঙ্গিন কাগজে মোড়ানো।একে একে নাসরিন আপাকে সবাই এসে উপহার অর্পণ করলেও আনোয়ার তার ছোট্ট বদন খানি মলিন করে পেছনে বসেই রইল।নাসরিন আপা তাকে ডাকলেন,তখন আনোয়ার তার জামার ভেতর থেকে পুরাতন কাগজে মুড়ানো একটি প্যাকেট বের করে নাসরিন আপাকে দিলএবং বলল এগুলো( এক জোড়া রূপার বালা) আমার মার।একথা বলে সে চল চল নয়নে অন্যদিকে চেয়ে রইল।তা দেখে নাসরিন আপার বুঝতে বাকি রইনা যে,আনোয়ারের মা নেই।তখন সানরিন আপাও কিছুক্ষণের জন্য আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন এবং নিজেকে সংযত করে বলনে,এটিই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার।আর আনোয়ারের পড়ালিখার দায়দায়িত্ব আমিই নিলাম। নাসরিন আপার মধ্যে আনোয়ার মাতৃত্ব খোঁজে পেলে।এর পর নাসরিন আপারপ্রেরনায় সে প্রতিটি পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হতে লাগল।পরে এস,এস,সি রেজাল্টের পর নামরিন আপাকে সে ফোন করে জানাল,” আমি আপনার প্রেরনায় এস,এস,সিতে গোল্ডেন এ+ পেয়েছি।”৬/৭ বছর পর সে আবার ফোন করে জানাল,” আজ আমার জীবনের চুড়ান্ত লক্ষ্য ইউনির্ভাসিটির সেরা ছাত্রটি আমিই হয়েছি এবং আমার বিভাগে কতৃপক্ষ আমাকে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগদান করেছেন। আপনিই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।”
উপরোক্ত গল্প থেকে একটি বিষয় পাঠক অনুধাবন করতে পেরেছেন নিশ্চয়,একজন শিক্ষকের আন্তরিকতা,সহযোগীতা, সহানুভূতি সততা ও প্রেরনা একজন পথ হারা শিশুকে জীবনের চুড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে। এরকম ভোরি ভোরি আনোয়ার আমাদের গ্রাম বাংলার শ্রেণী কক্ষ গুলোতে পাওয়া যাবে; কিন্তু তাদের খুঁজে বের করে পথের সন্ধান দেওয়ার নাসরিন আপার আজ বড়ই অভাব।
তাই নবীন শিক্ষক ও যারা শিক্ষকতা পেশায় আসার মনস্থির করেছেন তাদের প্রতি কিছু পরামর্শ রেখে আমার আজকের লিখার ইতিটানব—
১| ভাল শিক্ষক হতে হলে আপনাকে বিষয় জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে।আপনার বিষয়ে আপনার জ্ঞানের গভীরতা থাকা চাই।

২| একজন ডাক্টারকে যেমন চিকিৎসা দেওয়ার আগে রোগ নির্ণয় করতে হয়, ঠিক তেমনি আপনারকে আপনার শিক্ষার্থীর মানসিকতা বোঝে পাঠদান করতে হবে।তাই আপনার শিক্ষামনোবিজ্ঞানের উপর দখল থাকা চাই।

৩| আপনাকে কাজে,কর্মে,কথাবার্তায় সৎ হতে হবে।কারণ,আপনি আদর্শহীন হলে,আদর্শ জাতি গঠন আপনার দ্বারা হবে না।মনে রাখবেন আপনি আপনার শিক্ষার্থীর আদর্শ।

৪|আপনাকে সময়জ্ঞান সম্পন্ন হতে হবে।আর সব সময় সময়ের কাজ সময়ে শেষ করার মানসিকতা থাকতে হবে।

৫| পরিকল্পনা অনুযায়ি পাঠদান করতে হবে।তার মানে আপনি আজ শ্রেণী কক্ষে কি পড়াবেন? এবং কি ভাবে পড়াবেন তার একটি পরিকল্পনা থাকা চাই।নচেৎ পাঠকে আপনি আনন্দদায় করতে পারবে না।মনে রাখবেন শিশুদের কে আনন্দের মাধ্যমে শেখাতে পারা শিক্ষকতা জীবনের বড় সফলতা।

৬|এপেশায় যথেষ্ট ধৈর্য থাকা চাই।অনেক মেধাবী শিশুরা একটু দুষ্ট টাইপের হয়,এ ক্ষেত্রে আপনাকে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে পরিস্থতি মোকাবেলা করতে হবে।দেখবেন এক সময় আপনার সে দুষ্ট ছাত্রটি সেরা ছাত্রে পরিনত হয়েছে।
পরিশেষে বলব উপরোক্ত বিষয় গুলো কোন উপদেশ নয়, আমি আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে শিয়ার করলাম মাত্র।
(চলবে)….

লোখক:- সিনিয়র শিক্ষক, আধুনগর আখতারিয়া দাখিল মাদ্রাসা, লোহাগাড়া।

Top