লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই ১৩৩৮ অনুপ্রবেশকারী

Teknaf-pic-28.11-1.jpg

হাফেজ মুহাম্মদ কাশেম, টেকনাফ:
টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই (স্থানীয় ভাষায় টাল) অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৩৩৮ জন। তম্মধ্যে ধর্ষিতা, গুলিবিদ্ধ ও নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাও রয়েছে। প্রতি রাতেই ঢুকছে দলে দলে রোহিঙ্গা। একইভাবে উখিয়ার কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প, টেকনাফের শামলাপুর অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতি রাতে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা ঢুকছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এদের তালিকা এখনও করা হয়নি।

২৮ নভেম্বর দুপুরে সরেজমিন পরিদর্শনকালে জানা গেছে এতথ্য। ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা ডাঃ দুদু মিয়া উক্ত তথ্য নিশ্চিত করে জানান লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৬টি ব্লক রয়েছে। ২৮ নভেম্বর সকাল পর্যন্ত ক্যাম্পে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার তালিকা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে শুধু লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই (স্থানীয় ভাষায় টাল) অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৩৩৮ জন। এরা বর্তমানে আতœীয়-স্বজনের আশ্রয়ে রয়েছে। উখিয়ার কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প, টেকনাফের শামলাপুর অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা এখনও নিরুপন করা হয়নি। তাছাড়া সমুদ্র উপকুলবর্তী ঝাউবাগান, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, কক্সবাজার, মহেশখালী, উখিয়া, নাইক্ষংছড়িসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়া অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা এপর্যন্ত কমপক্ষে ৩০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।

অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার বর্ণণা দেন মিয়ানমার বাহিনীর অত্যাচারের লোমহর্ষক ঘটনা। আরকান রাজ্যের মুসলমানদের উপর অবর্ণণীয় নির্যাতনের কথা। মুসলমানদের গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অনেককে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। চোখের সামনে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। মহিলাদেরকে ধর্ষণসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। মিয়ানমার বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে প্রাণ বাঁচাতে অর্ধাহারে-অনাহারে বনে-জঙ্গলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন ঘাট দিয়ে গভীর রাতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে ঢুকে অন্যান্য রোহিঙ্গাদের সাথে টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে (স্থানীয় ভাষায় টাল) আশ্রয় নিয়েছে।

টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের (অনিবন্ধিত) চেয়ারম্যান হাফেজ আয়ুব জানান অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিলেও খাবার ও শীতবস্ত্রের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা সকলেই মিয়ানমারের আরকান রাজ্যের চালিপ্রাং, জামবইন্যা, রাইঙ্গাদং, রাইম্যারবিল, কিয়ারীপ্রাং, বড় গউজবিল, ছোট গউজবিল, মগনামা, হাতিপাড়া, প’খালী ইত্যাদি গ্রামের বাসিন্দা।২৮ নভেম্বর দুপুরে সরেজমিন পরিদর্শনকালে লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনুপ্রবেশ করেন ওরা ৪ বোন। এরা হলেন তসমিনা বেগম (৩০), ফাতেমা বেগম (২৭), সনজিদা বেগম (২৫) এবং মুহসিনা বেগম (২০)। সাথে ৪ জন শিশু। এরা হচ্ছে খাইরুল আমিন (১০), সুফাইরা বেগম (৭), আতাউল্লাহ (৪), রফিকা বেগম (৮)। সকলেই মিয়ানমারের আরকান রাজ্যের জামবইন্যা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁরা জানান মিয়ানমার বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে প্রাণ বাঁচাতে অর্ধাহারে-অনাহারে বনে-জঙ্গলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে টেকনাফ উপজেলার একটি ঘাট দিয়ে ২৭ নভেম্বর গভীর রাতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। এতে সময় লেগেছে ১৫ দিন। তাদের সাথে ভাই করিমুল্লাহ (২৩), করিমুল্লাহর স্ত্রী আছিয়া বেগম (১৮), ৩ মাসের শিশুপুত্র মোঃ ইসলাম, মা মোস্তফা খাতুনও (৫৫) ছিল। বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করার পর বিজিবির ধাওয়া খেয়ে গভীর রাতের অন্ধকারে কে কোন দিকে পালিয়ে গেছে তার হদিস মিলেনি। লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৪ বোনের সাথে এপ্রতিবেদকের আলাপকালে কাকতালীয়ভাবে সেখানে উপস্থিত হন বিজিবির ধাওয়া খেয়ে হারিয়ে যাওয়া ভাই করিমুল্লাহ। সে এক ভিন্ন দৃশ্য। করিমুল্লাহ জানান গভীর রাতের অন্ধকারে বিজিবির ধাওয়া খেয়ে অপরিচিত স্থানে ৪ বোন ৪ জন শিশুসহ যে যেদিকে পারে পালিয়ে গেলেও তিন মাসের শিশুপুত্রসহ মা ও স্ত্রী এক সাথে ছিল। অন্ধকারে পালাতে গিয়ে মা ও স্ত্রী আহত হয়েছেন। ২৮ নভেম্বর সকালে লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছে আতœীয়-স্বজনদের সহযোগিতায় আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে এখন নিখোঁজ বোনদের সন্ধানে বের হয়েছিল।

এদিকে মিয়ানমারের মংন্ডু রাখাইন প্রদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের উপর দমন, নিপীড়ন, অব্যাহত রয়েছে। আশ্রয়হীন হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু এপারে চলে আসার জন্য সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে অপেক্ষা করছে। এপারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি’র কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকার পরও থেমে নেই রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ । গত ২ সপ্তাহে উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প ও তৎসংলগ্ন রোহিঙ্গা বস্তিতে কমপক্ষে ১০ হাজার অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু আশ্রয় নিয়ে নিয়েছে বলে জানা গেছে। ৯ অক্টোবর মিয়ানমারের মংন্ডুর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ৩টি সেনা ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলায় ৯ জন সেনা সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সে দেশের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও রাখাইন জনগোষ্ঠি রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন শুরু করে। কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাসরত ফয়সাল আনোয়ার জানান ১১ নভেম্বর হতে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত মংন্ডুর নাইচাপ্রু, হাস্যেরপাড়া, সাতগরিয়া পাড়া, খেয়ারীপ্রাং, ওয়াবেক, নাকপুরা, লুদাইং, কাউয়ারবিল, ধুংছেপাড়া, বড় গৌজবিল, ছোট গৌজবিলসহ প্রায় ১৮টি গ্রামে লুটপাট, ধর্ষণ, খুন, নির্যাতন চালিয়ে ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। পুরুষদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। আর বহু নারীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করছে সেনারা। মিয়ানমার থেকে এদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নারীরা জানিয়েছেন সেই সব তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। সেনাদের হাত থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা যুবতী রুবাইয়া (২৪) জানান ‘বিছানার সঙ্গে ওরা তাদের দুই বোনকে বেঁধে রেখেছিল। এরপর এক এক করে সেনা এসে তাদের ধর্ষণ করেছে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এলেও সেই আতঙ্ক এখনও কাটেনি। সেনাদের অত্যাচারের বিবরণ দিতে গিয়ে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল ওই তাদের মুখ। পাশে বসে ছিল তার আরো দুই ভাই-বোন। তারাও সেনাদের অত্যাচারের সাক্ষী। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসাদের অধিকাংশই আশ্রয় নিয়েছে উখিয়ার কুতুপালং বস্তিতে। রুবাইয়ার ছোট ভাই আব্দুল হাসেম জানান সেখানে তারা ঠিক মত খেতেও পারেনি। বহুদিন তাদের উপবাসে কাটাতে হয়েছে। দুই বোনের সঙ্গে প্রাণ হাতে করে সীমান্ত পেরিয়ে কুতুপালং বস্তিতে এসেছে। এখানে অন্তত কেউ তাদের খুন করার চেষ্টা করবে না বা শারীরিকভাবে অত্যাচার করবে না ভেবে যেন কিছু স্বস্তি পাচ্ছে তারা। রুবাইয়ার ছোট বোন সাবিহার (১৭)। মিয়ানমারের কাউয়ারবিল গ্রামে ছিল তাদের বাড়ি। সেখানে হানা দেয় সেনা সদস্যরা। দুই বোনকে পালাক্রমে ধর্ষণের পর তাদের ঘরে আগুন দিয়ে চলে যায় সেনারা। এর আগেই তাদের বাবাকে হত্যা করা হয়। শুধু রুবাইয়া বা সাবিহারাই নয়। এই দুই বোনের মতো প্রতিদিন আরো অনেক রোহিঙ্গা কিশোরী-যুবতী ধর্ষিত হচ্ছে। বাধা দেয়া হলে তাদের নৃশংসভাবে মেরে ফেলে চলে যাচ্ছে সেনারা। যাওয়ার সময় বাড়ি-ঘরে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। রুবাইয়া জানালেন পালিয়ে না এসে উপায়ও ছিল না। সেনারা চলে যাওয়ার আগে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল এরপর আবার তাদের দেখতে পেলে খুন করা হবে। তারা যেন পালাতে বাধ্য হয় সেজন্যই তাদের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়। রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে তাড়াতেই সেনারা তাদের উপর শারীরিক অত্যাচার চালাচ্ছে, গণহারে ধর্ষণ করছে। এমন একটা আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে যেন ভয়ে পালিয়ে যায়।

Top