রোহিঙ্গা কারা? আরাকানে রোহিঙ্গাদের উদ্ভব ও চলমান সমস্যা।

burma_rohinga.jpg

ফয়েজ উল্লাহ ফয়েজ :

রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সবার কৌতূহলের শেষ নেই।

পূর্বে আরাকানকে রোয়াং বা রোসাঙ্গ নামে ডাকা হত।এ রোয়াং বা রোসাঙ্গ থেকেই রোহিঙ্গা শব্দের উদ্ভব হয়েছে।
আর এই রোয়াং বা রোসাঙ্গ রাজ্যে যে সব মুসলমান বসবাস করে তাদের রোহিঙ্গা বলা হয়।

এবার আলোচনায় আসা যাক…
খ্রিষ্ট পূর্ব ২৬৬৬ অব্দ থেকেই আরাকানের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগত সংঘবদ্ধ সমাজ জীবনের উদ্ভব ঘটে।
সে সময় অষ্ট্রো-এশিয় ও ভোট চিনা গোত্রীয় মানুষের কিছু অংশ আরাকানে বসবাস করত বলে অনুমান করা হয়।
মারু বংশীয় শাসকগণ বংশ পরম্পরায় খ্রিষ্ট পূর্বে আরাকান শাসন করতেন।অযোধ্যা ও বিহার অঞ্চলের জৈন এবং পরবর্তীতে জড়বাদী হিন্দু ধর্ম দর্শন কর্তৃক প্রভাবিত ছিল তৎকালীন আরাকানের সমাজ ব্যবস্থা।পরবর্তীতে ব্রাহ্মণ্যববাদী হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী লোকেরা আরাকানের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।
খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে মগধ থেকে আগত চন্দ্রসূর্য বংশের রাজাদের প্রভাবে আরাকানে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি বৌদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাসেরও ব্যাপক প্রভাব ও প্রসার ঘটে।
খ্রিষ্টীয় ৫ম শতাব্দি পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও আরাকান একটি অখন্ড রাজ্য হিসেবে চন্দ্রসূর্য বংশীয় রাজাদের দ্বারা শাসিত হত।কিন্তু সময়ের ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্মীয় সভ্যতার আলোকে এবং আরাকানী সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠে বৌদ্ধ ধর্মীয় সভ্যতার আলোকে।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স:) এর জীবদ্দশাতেই এ অঞ্চলে ইসলামের বাণী পৌঁছে।এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল আরব বণিকগণ।
৮ম শতকে আরাকানের চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরব বণিকদের যাতায়াত বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয়রা ইসলাম সম্পর্কে জানতে সক্ষম হয়।
চন্দ্রসূর্য বংশের শাসকদের উদারনীতির কারণে আরবের বণিকরা আরাকানে ইসলাম ধর্ম প্রচারের সুযোগ লাভ করে।এসময় কিছু কিছু আরব বণিক আরাকানে স্থায়ীভাবে বসবাসেরও সুযোগ পায়।
৮ম শতকে খলিফা উমর বিন আব্দুল আজিজের সাথে আরাকান রাজা সূর্য ক্ষিতি ও আব্বাসীয় খলিফা আল মামুনের সাথে আরাকান রাজা সূর্য ইঙ্গ চন্দ্রের পত্র বিনিময় হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকগণ অভিমত দিয়েছেন।
একাদশ শতাব্দিতে বদরুদ্দিন (বদর শাহ) নামক এক ধর্ম প্রচারক আরাকান অঞ্চলে ধর্ম পচার করতে আসেন।তিনি ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।পরবর্তীকালে তাঁর নামানুসারে আরাকানের বিভিন্ন অংশে “বদর মোকাম” নামক অনেক গুলো মসজিদ নির্মিত হয়।

১৪০৪ সালে আরাকানের যুবরাজ নরমিখল মাত্র ২৪ বছর বয়সে আরাকানের সিংহাসনে বসেন।সিংহাসনে বসার কিছুদিন পর নরমিখল দেশীয় এক সামন্তরাজার ভগ্নিকে অপহরণ করে আরাকানের তৎকালীন রাজধানী লংগ্রেতে নিয়ে এলে আরাকানের সকল সামন্তরাজা নরমিখলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং বার্মার রাজা মেঙশো আইকে আরাকান আক্রমণে উৎসাহিত করে।১৪০৬ সালে বার্মার রাজা মেঙশো আই ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে আরাকান আক্রমণ করলে আরাকান রাজা নরমিখল বাংলার রাজধানী গৌড়ে পালিয়ে যান।তখন ইলিয়াছ শাহি বংশের শাসকগণ বাংলা শাসন করতেন।গৌড়ে অনেক বছর তিনি একজন ইসলামী ধর্মসাধকের সংস্পর্শে সময় কাটান এবং নাম পাল্টিয়ে মুহাম্মদ সোলায়মান শাহ নাম ধারণ করেন।
বার্মার ইতিহাসে তিনি মুহাম্মদ সোলায়মান শাহ (মংস মোয়ান) নামে পরিচিত।
১৪৩০ সালে সুলতান জালালুদ্দিন শাহর সহায়তায় নরমিখল তথা মুহাম্মদ সোলায়মান শাহ অভিযান চালিয়ে আরাকানের শাসন ক্ষমতা থেকে বর্মীদের উৎখাত করে “ম্রাউক-উ” নামক এক রাজ বংশের প্রতিষ্ঠা করেন।
ঐতিহাসিকদের মতে…
“In this way Arakan become definitely oriented towards the Muslim states,contact with a modern civilization resulted in renaissance.The country’s great age began.”

অর্থাৎ, “এভাবে আরাকান নিশ্চিতভাবে মুসলিম রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে,একটি আধুনিক সভ্যতার সাথে এই সম্পর্ক আরাকানে এনে দেয় এক রেনেঁসা।আরাকানি জাতির এক মহাযুগ শুরু হয়।”
ম্রাউক-উ বংশের শাসকগণ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও ক্ষমতায় বসার সময় বৌদ্ধ নামের পাশাপাশি মুসলিম নামও ব্যবহার করতেন।১৪৩০ সাল থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ম্রাউক-উ রাজবংশের রাজাগণ আরাকান শাসন করেছিলেন।ম্রাউক-উ রাজাদের শাসনামলে সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্যাপক হারে মুসলমানরা নিয়োগ লাভ করেছিল।ফলে এ সময় আরাকানে ইসলাম ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে।

১৭ শতকে মগ ও ফিরঙ্গিরা (পূর্তগীজ জলদস্যু) বাংলার উপকূলীয় অংশে প্রতিনিয়ত দস্যুবৃত্তি করতে থাকলে ১৬৬৬ সালে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁকে মগ ও ফিরিঙ্গিদের দমনের নির্দেশ দেন।শায়েস্তা খাঁর পুত্র উমেদ খাঁ ফেনী নদী ও কর্ণফুলী নদীর মোহনায় সংগঠিত নৌযুদ্ধে মগ ও ফিরিঙ্গিদের সম্মিলিত বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে চট্টগ্রাম দখল করে।কিন্তু পেংওয়াং (কক্সবাজার) তখনও মগদের দখলে রয়ে যায়।

১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা বোধপোয়া মঙওয়াইং আরাকান রাজা থামদোকে পরাজিত ও নিহত করে আরাকান দখল করলে আরাকানের মগ ও মুসলমানরা বর্মীদের দ্বারা অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়।বর্মীদের নির্যাতন থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আরাকানের মগরা পেংওয়াং এর আশেপাশে এবং মুসলমানরা মুসলিম অধ্যুষিত চট্টগ্রামে আশ্রয় নিতে শুরু করে।
১৮ শতকের শেষদিকে নির্যাতিত মানুষগুলোকে রক্ষার জন্য বৃটিশ বাহিনী বর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে পেংওয়াংকে বৃটিশ ভারতের শাসনভুক্ত করে।১৯ শতকের শুরুতেই পেংওয়াং এ নিযুক্ত বৃটিশ গভর্নর ক্যাপ্টান হাইরাম কক্স মারা গেলে তাঁর নামানুসারে পেংওয়াং এর নামকরণ করা হয় কক্সবাজার।

১৮২৪-২৫ সালে সংগঠিত প্রথম ইঙ্গ-বর্মী যুদ্ধে বর্মীদের পরাজিত করে বৃটিশ বাহিনী আরাকান এক বিরাট অংশ দখল করে।আরাকান থেকে বর্মীরা বিতাড়িত হলে চট্টগ্রামে ও কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া মগ ও মুসলমানদের একটি বিরাট অংশ আরাকানে ফিরে আসে।

আরও দুটি ইঙ্গ-বর্মী যুদ্ধের পর সম্পূর্ণ আরাকান ও বার্মা সাম্রাজ্যের বেশিরভাগ অংশ বৃটিশদের দখলভুক্ত হয়।

১৯৩৭ সালে বৃটিশ-বার্মায় বৌদ্ধ ও মুসলমানদের মধ্যে এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূচনা ঘটে।সংগঠিত এ দাঙ্গায় উগ্র বৌদ্ধদের হামলায় হতাহত হয় হাজার হাজার মুসলমান ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান বৃটিশ ভারতীয় শাসনাধীন বার্মা আক্রমণ করলে বার্মার বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা অংসান জাপানের পক্ষ নেন।কিন্তু ২য় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জাপানি বাহিনী বার্মা ত্যাগ করলে বার্মা পুনরায় বৃটিশদের আয়ত্ত্বে চলে আসে।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি স্বাধীনতা লাভের পর বৃটিশরা আরাকানের শাসনভার বার্মার হাতে ন্যস্ত করে।কিন্তু বৃটিশদের এ কাজ ছিল সম্পূর্ণ বেআইনি।জাতিসঙ্ঘের ১৫১৪ নং ধারা ৬ষ্ঠ নং প্রস্তাব মোতাবেক বৃটেন কর্তৃক আরাকানের সার্বভৌমত্ব বার্মার নিকট অর্পণ করা ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ।

স্বাধীনতা প্রাপ্তির কিছুকাল পর বার্মায় সরকার গঠন করা হয়।এ সরকারে রোহিঙ্গা মুসলমানরা প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পায়।আরাকানকে দেয়া হয় স্বায়ত্তশাসন।
১৯৬২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নে উনের নেতৃত্বে সামরিকজান্তা শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত করলে বার্মার যাত্রাপথ ভিন্ন দিকে প্রভাহিত হয়,শুরু হয় রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগের চরম মাত্রা,রহিত করা হয় আরাকানের স্বায়ত্তশাসন।১৯৭৮ সালে বিদ্রোহ দমনের নামে ‘কিং ড্রাগন আপারেশন’ চালিয়ে হত্যা করা হয় অসংখ্য রোহিঙ্গা নর-নারী ও শিশুকে,বাস্তুহারা হয় হাজার হাজার রোহিঙ্গা।প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে হাজার হাজার রোহিঙ্গা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নেয় পার্শ্ববর্তী দেশ চীন,থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশে।১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তুলে নেয়া হয় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব।এ আইন অনুযায়ী রোহিঙ্গারা জমি ক্রয়েরও অধিকার হারায়।

১৯৯১-৯২ সালে রোহিঙ্গাদের উপর আবারও নেমে আসে দুর্ভোগ।সামরিকজান্তা ও উগ্র বৌদ্ধ জঙ্গীদের হামলায় হতাহত হয় কয়েক সহস্র রোহিঙ্গা,জ্বালিয়ে দেয়া হয় ঘর-বাড়ি,মসজিদ-মাদ্রাসা।বাস্তুহারা হয় লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষ।অকথ্য নির্যাতন থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় আড়াই লক্ষ রোহিঙ্গা।আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তীব্র নিন্দা জানালেও সবাইকে বুড়ো আঙ্গুল প্রদশর্ণ করে মিয়ানমার (১৯৮৯ সালে নাম পরিবর্তন)।
২০১২ সালে আবারও গণহত্যা এবং নির্যাতনের সম্মুখীন হয় রোহিঙ্গারা।
২০১৬ সালের শেষ দিকে এসে আবরও।
প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে মিয়ানমারের নোবেল বিজয়ী গণতন্ত্রীপন্থী নেত্রী অংসান সুচির ভূমিকা নিয়ে।অংসান সুচির নীরব ভূমিকার কারণে অনেকেই তার নোবেল বাতিলের দাবিও জানাচ্ছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে,
“১৯৭৮ সাল থেকে আরাকানের মুসলমানরা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে এবং বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে”।

তোমরা গর্দান দিতেই থাক,অস্থিত্ব রক্ষায় শত্রুর গর্দান নিতে গেলেই সম্মুখীন হবে ভয়াবহ বিপদের।বিশ্বব্যাপী আখ্যায়িত হবে জঙ্গী গোষ্ঠীরূপে।বিশ্বের রাগব বোয়ালদের পাশাপাশি তোমাদের জাত ভাইরাও ছুটে আসবে তোমাদের গর্দান নিতে।
So গর্দান দিতেই থাক।গর্দান দিতে দিতে একদিন তোমরা নি:শেষ হয়ে যাবে তখন শত্রুরা গর্দান নেয়ার আর কাউকে খুঁজে পাবে না।তখন সর্বত্র বিরাজ করবে শান্তি আর শান্তি।আর সর্বত্র ধ্বনিত হবে….
“ইসলাম শান্তির ধর্ম,ইসলাম শান্তির ধর্ম”।
এতে খুশি হবে এক শ্রেণীর আধুনিক মানুষ।

দুষ করেছে একজন ফল ভোগ করতে হচ্ছে সবাইকে।
এ যেন “উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে”।

রোহিঙ্গা নিধনের এ নাটক সেই যে চলছে থামার আর কোন লক্ষণ নেই।এদিকে মিয়ানমারও সামরিক দিক দিয়ে দিনদিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে।বিশ্ব সম্প্রদায়ও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।তৃতীয় বিশ্বের দেশ বাংলাদেশ যেখানে বেশিরভাগ মানুষ দিনে আনে দিনে খায়,এবার আপনারাই বুঝুন এমন একটি দেশ কিভাবে তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিবে!
রোহিঙ্গা নিধনের এ নাটক কবে যে শেষ হবে একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন।
—————

ফয়েজ উল্লাহ ফয়েজ

ফয়েজ উল্লাহ ফয়েজ

ফয়েজ উল্লাহ ফয়েজ,
৩৩তম বিসিএস শিক্ষা,
ইতিহাস বিভাগ।
সাবেক উপদেষ্টা,
কক্সবাজার জেলা ছাত্র ফোরাম,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Top