রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে

Cox-Ruhinga-Pic-2_1.jpg

সীমান্তের ওপার থেকে পালিয়ে আসা নির্যাতিত মুসলমানদের কয়েকজন।

উম্মুল ওয়ারা সুইটি, আমাদের সময়. কম :

ছোট্ট একচিলতে ঘরে স্বামী ও চার সন্তানকে নিয়ে সমোদা বেগমের সংসার। কিন্তু বর্তমানে এই ঘরে থাকছেন ২২ জন মানুষ। গত তিনদিন আগে মিয়ানমারের মংডু থেকে তার বাবা-ভাই, ভাইয়ের স্ত্রীসহ এই ১৬ জন এসেছেন এখানে। স্বামীর প্রতিদিন আয় ২৫০ টাকা। তাতে তাদের নিজেদেরই হয় না। গত দুদিন ধরে এরা সবাই এক রকমের না খেয়ে আছেন। কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নারী সমোদা বেগম তার ঘরে নিয়ে গিয়ে এই প্রতিবেদকে দেখালেন এমন চিত্র।

সরেজমিনে জানা গেছে, কোনোভাবেই  ঠেকানো যাচ্ছে না রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ। বাংলাদেশ-মিয়ানমানর সীমান্ত দিয়ে রাতের অন্ধকারে প্রতিদিনই শত শত রোহিঙ্গা প্রবেশ করছে। উখিয়ায় দিনের আলোতে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কড়া টহল দিলেও রাতের অন্ধকারে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে দালালদের মাধ্যমে ঢুকে পড়ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।

যদিও প্রশাসন বলছে, অনুপ্রবেশ বন্ধ রয়েছে। কিন্তু গতকাল রাতেও অন্ততপক্ষে কুতুপালং ক্যাম্পে ২৫জন অনুপ্রবেশকারী এসেছেন।

অনুপ্রবেশকারীদের বেশিরভাগই বান্দরবানের লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ির গহীন জঙ্গলে আশ্রয় নিচ্ছে। সীমান্ত এলাকার ঘুমধুম, বালুখালীসহ বিভিন্ন এলাকার বসতবাড়িগুলো অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

গতকাল সরেজমিন কক্সবাজারের টেকনাফ, ঘুমধুম, তম্রু, উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১২ নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত অন্ততপক্ষে ৩০ হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। এরমধ্যে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পেই আশ্রয় নিয়েছে ১০ হাজার অনুপ্রবেশকারী।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টেকনাফের হোয়াক্ষ্যং, কাটাখালী, উলুবুনিয়া, উনচিপ্রাং, বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্ত এলাকা ঘুমধুম, তমব্রু,বাইশফাঁড়ি দিয়ে রাতের অন্ধকারে রোহিঙ্গারা প্রবেশ করছে।

গতকাল দুুপুরে তমব্রু সীমান্ত এলাকার এক স্থানীয় বাসিন্দা এই প্রতিবেদককে বলেন, গত তিনদিন ধরে দিনের বেলা লোক ঢুকতে পারছে না। কিন্তু রাতের অন্ধকারে এসব টহল কোনো কাজে আসে না। কারণ রাত গভীর হলে বড় রাস্তাগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নজরদারি বাড়িয়ে থাকে। আর ওদিকে সীমান্তবর্তী কাঁটাতারের পাশ দিয়ে গহীন অরণ্যে অনুপ্রবেশ চলছেই।

ঘুমধুমের একজন ব্যবসায়ী বলেন, কোনোরকমে যদি একবার  কোনো রোহিঙ্গা বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে এসে পড়ে তাহলে তার আর ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। কারণ আমাদের দেশের মানুষ তাদের রক্ষায় এগিয়ে এসেছে। তারা নিজেদের ঘরবাড়িতেও জায়গা করে দিচ্ছে।

টেকনাফের নয়াপাড়া ক্যাম্পের একজন বাসিন্দা হারিস জানান , প্রতিটি ঘরে অন্ততপক্ষে ৮-১০জন করে রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। গত ১২ তারিখ থেকে আসতে শুরু করেছে। প্রথম এক সপ্তাহ আসতে তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু এখন দিনের বেলা একটু কড়াকড়ি। তাই রাতের অন্ধকারে আসছে। এই ক্যাম্পেই তার হিসাব অনুযায়ী ৭  থেকে ৮ হাজার নতুন রোহিঙ্গা এসেছে। আবার কেউ কেউ কক্সবাজারসহ পার্বত্য জেলাগুলোতে চলে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে ঘুরে দেখা গেছে ঘিঞ্জি প্রতিটি ঘরেই আশ্রয় নিয়েছেন মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা।

কুতুপালং ক্যাম্পেও সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, অনিবন্ধিত প্রত্যেকটি ঘরেই ৭-৮জন রোহিঙ্গা গত চার-পাঁচ দিনে আশ্রয় নিয়েছে। যাদের বেশিরভাগই বয়স্ক নারী ও শিশু।

গতকালও কুতুপালং ক্যাম্পে ১২ জনের একটি দল ঢুকেছে। তাদেরকে হোয়াক্ষ্যং ক্যাম্প থেকে এখানে পাঠানো হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ রকম রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রতিটি ঘরেই রয়েছে অনুপ্রবেশকারী।

কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জ আরমান শাকিব টেলিফোনে জানান, অনিবন্ধিত শিবিরে  রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীর কথা তিনি শুনেছেন। তবে নিবন্ধিতদের এলাকাতে একজনও অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নেই। এখানে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে। তিনি জানান, তার ক্যাম্পে ১৩ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছেন। আর কুতুপালং ক্যাম্পের তিনদিক ঘিরে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে ৫০ হাজারেরও বেশি। কিন্তু সেখানে তার যাওয়ার বা এ নিয়ে কোনো কিছু করার ক্ষমতা তার নেই।

উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন বলেন, ক্যাম্পগুলোতে যাওয়ার এখতিয়ার তাদেরও নেই। প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করেও বিজিবির কাছে তুলে দিচ্ছে। তারপর তারা ব্যবস্থা করছে। ক্যাম্পের হিসেব তার কাছে নেই।

সহকারী পুলিশ সুপার উখিয়া সার্কেল আব্দুল মালেক বলেন, এ পর্যন্ত কতজন অনুপ্রবেশ করেছে এই ডাটা স্ব স্ব থানাগুলো দিতে পারবে। তবে তারা অনুপ্রবেশ রোধ করতে ব্যবস্থা নিয়েছে।

Top