রোহিঙ্গাদের জন্যে দুনিয়ায় কেউ কি নেই?

myanmar_1.jpg

রাশিদ রিয়াজ, আমাদের সময়.কম :
স্রেফ মুসলমান হওয়ার কারণে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা, নির্যাতন ও তাদের বাড়ি ঘরে আগুন দেয়া হচ্ছে। যদিও মিয়ানমার সরকার বলছে, রোহিঙ্গারা নিজেরাই নিজেদের বাড়ি ঘরে আগুন দিচ্ছে। এই যখন পরিস্থিতি তখন রোহিঙ্গা মুসলমানরা জান বাঁচাতে আশ্রয়ের খোঁজে সীমান্তে এসে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করতে চাইলে তাদের ফের ফেরত পাঠাচ্ছে মুসলিম প্রধান দেশ বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী। বাংলাদেশ এর আগেও বেশ কয়েক লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু এবার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। জাতিসংঘ রোহিঙ্গা মুসলমানদের আশ্রয় দেয়ার আহবান জানালেও তাতে কোনো কাজ হয়নি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানি হানাদারদের হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে থাকার জন্যে ভারত গেলে দেশটি ১ কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থাকলেও বাংলাদেশ কিভাবে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ফেরত পাঠায় এমন প্রশ্নও উঠেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্যে বাংলাদেশ এ যাবৎ অনেক কিছু করেছে। কিন্তু রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্যে বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশের কি করণীয় কিছু নেই? মানবতা বিচারের দিক থেকেও সীমান্তে কোনো দেশের নাগরিক আশ্রয় নিতে চাইলে তা বাধা দেয়া যায় না। ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে যে লাখ লাখ মানুষ যুদ্ধ ও অন্যান্য কারণে ইউরোপ সহ অন্যান্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছে তা চাইলেও বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের অনেকে সাগরে ডুবে মারা গেছে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের অনেকে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড সহ অন্যান্য দেশে পাড়ি দিতে যেয়ে সাগরে ডুবে মারা গেছে। তারপরও মিয়ানমার রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নতুন করে হতাযজ্ঞ শুরু করেছে। অথচ মিয়ানমারের প্রতিবেশি প্রভাবশালী দেশ চীন, ভারত, থাইল্যান্ড সহ অন্যান্য বড় বড় দেশ বিষয়টি নিয়ে দেশটির উপর কোনো চাপ সৃষ্টি করছে না।
ইতিহাস বলে, এদেশে যখন বাঙালীদের উপর আর্য নিপীড়ন চলছিলো, আরাকানে আশ্রয় নেয় বাঙালীরা। কবি আলাওল থেকে শুরু করে অসংখ্য আশ্রয়প্রার্থীকে রোহিঙ্গারা আশ্রয়োর জন্যে দুয়ার খুলে দিয়েছিল। কোরেশী মাগন ঠাকুর থেকে নিয়ে অসংখ্য বাঙালীর জন্য তারা সীমান্ত বন্ধ রাখেনি বাং রাজসভায় তারা ঠাঁই পেয়েছিল। আজ রোহিঙ্গারা যে দুঃসময় পাড়ি দিচ্ছেন, এক সময় এদেশের বাঙালীরা সেন শাসনামলে আরাকানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। অর্ধশত বছর পরেও যদি এদেশের নতুন প্রজন্ম যখন জানবে বাংলাদেশ একপর্যায়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যাযজ্ঞের মুখে আশ্রয় দিয়েও তারপর সীমান্ত থেকে তাদের ফেরত পাঠিয়েছিল? তখন তারা কি আমাদের ঘৃণা করবে না?
পরিস্কার জাতিগত হত্যাযজ্ঞ চলছে মিয়ানমারে। মংডু এলাকার দক্ষিণ, নয়াপাড়া, বমুপাড়া, মাঙ্গালাপাড়া, সম্মন্যাপাড়া, চারমাইল, হাদির বিল ও ঝুড়ারপাড়া এবং আকিয়াবের নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, মং লেংপাড়া, বাহারছড়া, ছাক্কিপাড়া, জালিয়াপাড়া, রোহাইঙ্গা ও ওয়ালিদপাড়া সম্পূর্ণ জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ এ এ উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সর্বপ্রথম যে কয়টি এলাকায় মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে, আরাকান তার মধ্যে অন্যতম। রোহিঙ্গারা সেই আরাকানি মুসলমানের বংশধর। এক সময় আরাকানে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসন দুইশ’ বছরেরও অধিককাল স্থায়ী হয়। ১৬৩১ সাল থেকে ১৬৩৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ হয়। এরপর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে।
১৬৬০ সালে আরাকান রাজা থান্দথুধম্মা নিজ রাজ্যে আশ্রিত মোঘল সম্রাট শাহজাদা সুজাকে সপরিবারে হত্যা করেন। এরপর শুরু হয় মুসলমানের উপর তার নিষ্ঠুর অমানবিক অত্যাচার-নিপীড়ন। প্রায় সাড়ে তিনশ’ বছর মুসলমানদের কাটাতে হয় এই দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে।
১৭৮০ সালে বর্মী রাজা বোধাপোয়া আরাকান দখল করে নেয়। সেও ছিল ঘোর মুসলিমবিদ্বেষী। বর্মী রাজা ঢালাওভাবে মুসলিম নিধন করতে থাকে।
১৭৮৫ সালে ৩০ হাজার বার্মিজ সেনা আরাকান আক্রমণ করে মুসলমানদের মসজিদ ও বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস করে দেয়। একই সঙ্গে তারা বহু রোহিঙ্গা মুসলমানকে পুড়িয়ে হত্যা করে এবং প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে।
১৮২৮ সালে বার্মা ইংরেজদের শাসনে চলে যায়। তখন মুসলমানরা কিছুটা স্বস্তিতে কাটালেও ১৯৩৭ সালে বার্মার স্বায়ত্তশাসন লাভের পর বৌদ্ধদের পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক রূপ নেয় এবং তারা প্রায় ৩০ লাখ মুসলিমকে হত্যা করে।
১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। স্বাধীনতার পর পরই বার্মার সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং সরকারি পদে রোহিঙ্গাদের নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে মিয়ানমার থেকে মুসলিম বিতাড়নের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করেন। তিনি নানাভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে ফায়দা লুটেন এবং মুসলিম নির্যাতনে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করেন। ১৯৭০ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সনদ দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৯৭৪ সালে কেড়ে নেয়া হয় ভোটাধিকার। এরপর রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্মূলে ১৯৭৮ সালে শুরু হয় অপারেশন ‘ড্রাগন কিং’।
এই অমানবিক অভিযানের পর রোহিঙ্গা মুসলমানরা অনেকে প্রতিবেশী মুসলিম দেশ বাংলাদেশের দিকে পাড়ি জমায়। তখন শুধু ১৯৭৮ সালে আড়াই লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলিম বার্মার বৌদ্ধদের বর্বর আক্রমণের মুখে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে বাধ্য হয় শরণার্থী হিসেবে।
দেশটিতে এক নজরে ধারাবাহিক মুসলিম হত্যাযজ্ঞের একটি হিসাব এরকমঃ
৫ম বর্মী রেজিমেন্ট-এর সামরিক অভিযান নভেম্বর ১৯৪৮ ইং।
বার্মা টেরিটোরিয়াল ফোর্স এর অভিযান ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ ইং।
দ্বিতীয় জরুরি ছিন রেজিমেন্ট-এর সামরিক অভিযান নভেম্বর ১৯৪৮ ইং।
মাউ অভিযান অক্টোবর ১৯৫২ থেকে ১৯৫৩ ইং।
মনে-থোন অভিযান অক্টোবর ১৯৫৪ ইং।
সমন্বিত অভিবাসন ও সামরিক যৌথ অভিযান জানুয়ারি ১৯৫৫ ইং।
ইউনিয়ন মিলিটারি পুলিশ অভিযান ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৮ ইং।
ক্যাপ্টেন হটিন কিয়াও অভিযান ১৯৫৯ ইং।
শোয়ে কি অভিযান অক্টোবর ১৯৬৬ ইং।
কি গান অভিযান অক্টোবর-ডিসেম্বর ১৯৬৬ ইং।
ঙ্গাজিঙ্কা অভিযান ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ ইং।
মিয়াট মোন অভিযান ফেব্রুয়রি ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ ইং।
মেজর অং থান অভিযান ১৯৭৩ ইং।
সাবি অভিযান ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৮ ইং।
নাগা মিন (ড্রাগন রাজা) অভিযান ফেব্রুয়ারি ১৯৭৮ থেকে ১৯৭৯ ইং।
(এ অভিযানে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুহারা হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় এবং ৪০ হাজার রোহিঙ্গা মারা যায়।)
সোয়ে হিন্থা অভিযান অগাস্ট ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ ইং।
গেলোন অভিযান ১৯৭৯ ইং।
তাউঙ্গকের গণহত্যা ১৯৮৪ ইং।
তাউঙ্গি (পশ্চিম বার্মা)-এর মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা। পিয়াই ও রেঙ্গুন সহ বার্মার অনেক অঞ্চলে এই দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।
পি থিয়া অভিযান জুলাই ১৯৯১-৯২
(এতে ২ লাখ ৬৮ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।)
নাসাকা অভিযান ১৯৯২ থেকে অব্যাহত।
মুসলিমবিরোধী সাস্প্রদায়িক দাঙ্গা মার্চ ১৯৯৭ (মান্দালয়)।
সিটিওয়ে’তে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গাফেব্রুয়ারি ২০০১ ইং।
মধ্য বার্মার মুসলিম বিরোধী সর্বাঙ্গীন দাঙ্গা মে ২০০১।
মধ্য বার্মার মুসলিমবিরোধী সর্বাঙ্গীন দাঙ্গা (বিশেষত পিয়াই/ প্রোম, বাগো/পেগু শহরে) –৯/১১ -এর পরবর্তী থেকে অক্টোবর ২০০১ ইং।
সেনা বাহিনী ও বৌদ্ধদের যৌথ মুসলিমনিধন অভিযান জুন ২০১২ থেকে অব্যাহত।
সাম্প্রতিক (বিশেষ করে ২০১৬ ইং) সেনা বাহিনী, সরকারি ম“পুষ্ট সন্ত্রাসীগোষ্ঠী ও বৌদ্ধভিক্ষুদের সম্মিলিত মুসলিম নির্মূল অভিযান।

Top