রিফিউজি ইন্ডাষ্ট্রী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আরাকান সমস্যার সমাধান

myan_1.jpg

সাইফুল ইসলাম
আরাকানে মুসলিম গণহত্যার ফলে রুহিঙ্গা মুসলিমরা গণহারে রিফিউজি হতে বাধ্য হচ্ছে। তারা বাংলাদেশের দিকে আসতে চায়লেও বা তাদেরকে বাংলাদেশে ঠেলে দিতে চায়লেও বাংলাদেশ সীমান্ত তাদের জন্য বন্ধ করে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ আগে থেকেই পাঁচ লক্ষাধিক রুহিঙ্গাকে আশ্রয় নিয়ে আছে, যাদের কারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সমস্যাও দেখা দেয়। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙ্গালী মুসলিমরা পাহাড়ী শান্তিবাহিনীর কারণে অশান্তির মধ্যে আছে, যা আগামীতে ক্রমান্বয়ে আরাকানের পরিস্থিতি সৃষ্টির দেকেই অগ্রসর হচ্ছে। এমতাবস্থায় আরাকান থেকে হিজরত করে আসা রুহিঙ্গা মুসলিম ও সমতল থেকে হিজরত করে যাওয়া পার্বত্য বাঙ্গালী মুসলিমদের সমস্যার সমাধান একটিই। তা হল সকল রুহিঙ্গাকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আশ্রয় দিয়ে পতিত পাহাড়গুলো আবাদ করা। তা হলে যে সব লাভ হবে তার কয়েকটি হল যথা, ১. নির্যাতিত মুসলিমরা আশ্রয় পাবে। ২. পতিত পাহাড়গুলো আবাদ হবে। ৩. বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। ৪. পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙ্গালী মুসলিম-শক্তি বৃদ্ধি পাবে। ৫. রিফিউজিদের জন্য প্রাপ্ত অনুদান দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপক উন্নয়ন করা যাবে। ৬. যাবতীয় উৎপাদনের একাংশ স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সরকার লাভ করবে। ৭. আরাকানীরা নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার রাস্তা নিজেরাই তৈরী করতে পারবে। ৮. তাদেরকে বিদেশে শ্রমিক হিসেবে পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে। ৯. শান্তিবাহিনীর মোকাবেলা করা সহজ হবে। ১০. পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের সাথে ধরে রাখা সহজ হবে। তারা কক্সবাজারে রুহিঙ্গা হলেও পর্বতে বাঙ্গালী।

.

যারা আশির্বাদ হতে পারে তাদেরকে অভিশাপ মনে করার কারণ হচ্ছে স্থান ও কর্ম উপযুক্ত না হওয়া। তাদেরকে দরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে। তারা বসে আছে বা আসতে চায় ককসবাজারে। তাদেরকে দরকার সীমান্তে। তারা চলে আসতে চায় মাঝখানে। তাদের জন্য কর্ম পড়ে আছে পাহাড়ে। তারা কর্ম সন্ধান করে বেড়ায় সমতলে। ফলে সমতলের লোকেরা তাদেরকে প্রতিপক্ষ বা প্রতিদন্দী বা প্রতিযোগী মনে করে। তারা যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে পতিত পাহাড়গুলো আবাদ করে তবে একদিকে তাদের লাভ, অন্যদিকে সরকার, বিনিয়োগকারী ও শান্তিবাহিনীরও লাভ। কারণ প্রত্যেকের আয় বাড়বে। যাবতীয় উৎপাদনের এক দশমাংশ উশর স্রষ্টার জন্য দারিদ্র বিমোচনে ব্যয় করলে তাদের কেউ না খেয়ে থাকবে না। বর্তমানে সমতলে যে হারে তামাক পাতার উৎপাদন বাড়ছে, তাতে মনে হচ্ছে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তাই দূর্গম পাহাড়গুলো আবাদ করার জন্য সীমান্ত পার হয়ে আসা আশ্রয়প্রার্থীরা ছাড়া অন্য কোন শ্রমিক সেখানে পাওয়া যাবে না। আর তাদেরকে আয়ের উৎস হিসেবে দেখলে মায়ানমার সরকারও তাদেরকে ফিরিয়ে নিতে উৎসাহিত হতে পারে। যে মাটিতে আছাড় খায় সে মাটিতেই দাড়াতে হয়। যারাই সমস্যা তাদেরকেই সমাধান বানাতে হবে। আল্লাহ না করুন, কখনো বাংলাদেশ-মায়ানমার যুদ্ধ হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিগুলো যাবে মায়ানমারের পক্ষে এবং আরাকানের রুহিঙ্গা শরণার্থীরা থাকবে বাংলাদেশের পক্ষে। তাই এই রুহিঙ্গাদেরকে সীমান্তের প্রাকৃতিক বেড়া বানিয়ে রাখলে বিজিবির শক্তিই বৃদ্ধি পাবে। এখন দীর্ঘ সীমান্তই অরক্ষিত।

.

মায়ানমারের সাথে যদি শান্তি চাই তবে মায়ানমারকেও শান্তি চায়তে হবে। মায়ানমারকে শান্তির পথে আনতে হলে প্রয়োজনে বাংলাদেশের বৌদ্ধদেরকে ব্যবহার করা যেতে পারে। তা হল নাগরিক বিনিময়। মায়ানমার যতজন মুসলিমকে বাংলাদেশে ঠেলে দিতে চায় ততজন বৌদ্ধকে বাংলাদেশ থেকে গ্রহণ করুক। কারণ যেহেতু ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের মুসলিমদের জন্যেই পাকিস্তান সৃষ্টি হয় এবং যেহেতু ১৯৭১ সালে বাঙ্গালীদের জন্যেই বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়, তাই বাংলাদেশ যদি হয় ১০০% বাঙ্গালী মুসলিমদের জন্য, তবে তাতে কারো আপত্তি করার কোন কারণ থাকতে পারেনা। কিন্তু আমরা যেহেতু কাউকে এ দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে চাইনা, তাই সবাই এ দেশে পূর্ণ মর্যাদা ও স্বাধীনতা নিয়েই থাকতে পারে। কিন্তু প্রতিবেশীরা যদি নিজ দেশের নাগরিকদেরকে বাঙ্গালী মুসলিম বলে বাংলাদেশে ঠেলে দিতে চায়, তবে আমাদেরকেও তাই করা ছাড়া কোন উপায় নেই। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ৫ লক্ষাধিক মায়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় দিয়েছে। প্রয়োজনে আরো ১০ লক্ষকে আশ্রয় দেবে। বিনিময়ে বাংলাদেশ থেকে ১৫ লক্ষ বৌদ্ধকে মায়ানমার গ্রহণ করুক। তা না করে বর্তমানে যে ভাবে মায়ানমার সরকার মেরে-কেটে মুসলিমশুণ্য করতে চাচ্ছে, সে ভাবে বাংলাদেশেও যদি শুরু হয়ে যায়, তবে কি বাংলাদেশ সরকার জনগণকে থামাতে পারবে? এ ভাবে চলতে থাকলে অতিদ্রুত বাংলাদেশেও মায়ানমারের মত গণহত্যা শুরু হয়ে যেতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙ্গালী মুসলিমরা এমনিতেই ক্ষেপে আছে। সমতলের বাঙ্গালী মুসলিমরাও ক্ষেপে গেলে এ দেশের বৌদ্ধ ভাই-বোনগণ যাবে কোথায়?

.

আসলে মারামারি-কাটাকাটির মধ্যে কোন সমাধান নেই। মায়ানমার সরকার যদি মুসলিমদেরকে দেশ থেকে তাড়াতে চায়, তবে সে জন্য শান্তিপূর্ণ অনেক উপায় আছে। যেমন তাদেরকে সন্তান ধারণে অক্ষম করে দেয়া। তাদেরকে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার ব্যবস্থা করে দেয়া। তাদেরকে গোটা মায়ানমারে ছড়িয়ে দেয়া। রুহিঙ্গা মুসলিমদের সাথে অন্যান্য মুসলিমদের ব্যাপক বিবাহরিতি চালু করা। বাংলাদেশের সাথে নাগরিক বিনিময় প্রথা চালু করা। তারা যদি অর্থনৈতিক ভাবে সামর্থবান হয় তবে নিজে নিজেই দেশত্যাগ করবে। তাই তাদেরকে গোটা মায়ানমারের অনাবাদী জমি আবাদে কাজে লাগানো। তাদের দিয়ে গার্মেন্টস্ শিল্প চালু করা। তাদেরকে যাবতীয় ভারিশিল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগানো। তাদেরকে দিয়ে মাছ উৎপাদন ও আহরণ করা। যারা নিজ দেশের ও গোটা বিশ্বের শ্রমিক চাহিদা পূর্ণ করতে পারে, তাদেরকে অর্থনৈতিক সম্পদ মনে না করে সমস্যা মনে করাটা এক বিরাট অজ্ঞতা। তাদেরকে সহজেই দেশ থেকে শান্তিপূর্ণ ভাবে বের করতে চায়লে দুটি সরকার গঠন করে দেয়াই যথেষ্ট। একটি হল রুহিঙ্গা স্থানীয় সরকার, যা বুঝিয়ে তাদেরকে বের করার কাজ করবে। আরেকটি হল রুহিঙ্গা প্রবাসী সরকার, যা বিদেশের সাথে দেনদরবার করে তাদেরকে পুনর্বাসনের কাজ করবে। এ ভাবে কৌশলে কাজ না করে মারামারি-কাটাকাটি করলে অতিদ্রুত রুহিঙ্গারা দেশের ভেতরে ও বাইরে প্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে। পিঠ দেয়ালে ঠেকলে যে কেউ ঘোরে দাড়াতে বেশিক্ষণ লাগেনা। প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র নিয়ে নিজ দেশে ফেরার শর্তে যে কেউ যে কোন দেশে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করতে পারে।

.

আসলে এখন যা হচ্ছে তা হল বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মায়ানমারের আরাকান মিলে একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের পূর্বপ্রস্তুতি মাত্র। যেহেতু যে কোন রাষ্ট্রের জন্য সমুদ্রসীমা আবশ্যক, তাই জ্যুমল্যান্ড স্বাধীন হলে তার সাথে সমুদ্রসীমা না থাকলে তা হবে ল্যান্ডলক্ড্ কান্ট্রি। তাই সমুদ্রসীমা পেতে হলে হয় ককসবাজার দরকার নতুবা আরাকান দরকার। ককসবাজার যেহেতু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট এলাকা এবং বাংলাদেশ কোন ভাবেই ককসবাজারকে হাতছাড়া করবে না, তাই সবচেয়ে নিরাপদ হচ্ছে, বৌদ্ধদেরকে দিয়ে আরাকানকে মুসলিমশুণ্য করা এবং মুসলিম হত্যার অভিযোগে সেখানে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী নিয়োগ করা। অতপর সেখানে ব্যাপক এনজিও তৎপরতার মাধ্যমে খ্রীষ্টান জনসংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং খ্রীষ্টান ও অবশিষ্ট মুসলিমের পাশাপাশি অন্যদেরকে দিয়ে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবী জোরদার করা। অতপর পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আরাকানে জাতিসংঘের অধীনে গণভোটের মাধ্যমে জ্যুমল্যান্ড স্বাধীন করা। এটা যেহেতু ইয়াহুদী-খ্রীষ্টানদের পরিকল্পনা, তাই এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ-মায়ানমার-ভারত-চীনের কোন লাভ হবে না। এ পরিকল্পনার সাথে চীন পর্যন্ত ভারতের কিছু সীমান্ত এলাকাও যোগ করার জন্য সেখানকার নাগরিকদেরকে ইয়াহুদীদের হারানো জাতি হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। চীন যখন পাকিস্তানের মত মায়ানমার ও বাংলাদেশ সীমান্তে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মান করতে চাচ্ছে, উভয় দেশের উপর দিয়ে পণ্য পরিবহনের জন্য, তখনই তা বানচাল করার জন্য বেলুচিস্তানের মত আরাকানকে অস্তিতিশীল করে দেয়া হচ্ছে। চীন এ সব চক্রান্ত বুঝতে পারে বলেই এর শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়।

.

যেহেতু চোখ-কান-সীমান্ত বন্ধ করে রাখাই সমাধান নয়, তাই আরাকানের রুহিঙ্গা মুসলিমদের ব্যপারে বাংলাদেশ সরকারকে কিছু না কিছু তো করতেই হবে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার কী করতে পারে? অনেক কিছুই করতে পারে। যেমন, প্রথমত জাতিসংঘ, ওআইসি, সার্ক ইত্যাদি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অঙ্গনে বাস্তব অবস্থা তুলে ধরা। সমুদ্রসীমার মত আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে যার যার প্রাপ্য অধিকার আদায় করা। রুহিঙ্গাদেরকে ককসবাজারে আশ্রয় না দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আশ্রয় দিয়ে পতিত পাহাড়গুলো আবাদ করা। নিজেদের অধিকার নিজেরা আদায় করতে দ্রুত আরাকান প্রবাসী সরকার গঠন করে দেয়া। আরাকানকে কেন্দ্র করে মায়ানমারের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকা। সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি মুসলিম দেশের সাথে সুসম্পর্ক ও সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করা। চীনকে দিয়ে আরাকান সমস্যার সমাধান করানো। প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার শর্তে রুহিঙ্গাদেরকে আশ্রয় দেয়া। তাদেরকে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া। অমুসলিমদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে জাতীয় ঐক্য ও শক্তি বৃদ্ধি করা। উপজাতি মুসলিমদের সাথে রুহিঙ্গা মুসলিমদের ব্যাপক বিবাহরিতি চালু করে জাতীয় বিভাজন দূর করা। সীমান্ত জেলার ১৫ হতে ৬৫ বছর বয়সী সব পুরুষের জন্য বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, কমিউনিটি পুলিশ, আনছার-ভিডিপি ইত্যাদি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান মুসলিম ঐক্যের ব্যবস্থা করা। দ্রুত মসজিদ মন্দির কিয়াং গির্জা হাসপতাল ভিত্তিক টেকনিক্যাল ও নার্সিং স্কুল কলেজ মাদ্রাসা গড়ে তোলা, ইত্যাদি।

.

সর্বশেষ ঐশী বিধান হচ্ছে, কোথাও এক স্রষ্টায় বিশ্বাসীগণ নির্যাতিত হলে সেখানকার সবাইকে মিলে তা প্রতিরোধ করতে হবে। তারা না পারলে যারা যত পাশে ও কাছে আছে তাদের উপর এ দায়িত্ব চলে আসবে। এ ভাবে গোটা বিশ্বের সবার উপর। সে হিসেবে রুহিঙ্গা উদ্ধার প্রথমে বাঙ্গালীর উপর ফরজ।

সাইফুল ইসলাম
আহবায়কঃ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান মুসলিম ঐক্য পরিষদ।
ফেসবুকঃ ০১৮৩৭৫৮৮৯১০। saifuleidgahcox@yahoo.com

Top