মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ গঠনে বিশ্ব মোড়লদের চাপ দিতে হবে

myanmer-pic.jpg

উম্মুল ওয়ারা সুইটি ও ফরিদুল মোস্তফা খান, টেকনাফ থেকে :
১৯৭৮ সাল থেকে শুরু হয়েছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর অমানবিক নির্যাতন ও কিছুদিন পরপর গণহত্যা। এই কবছরে ৪০ লাখ রোহিঙ্গা থেকে এই সংখ্যা মিয়ানমার সরকারের হিসাব অনুযায়ী এখন ১০ লাখে নেমে এসেছে। যদিও আন্তর্জাতিক

বিভিন্ন সংস্থা বলছে, রাখাইন রাজ্যে এখন ৬/৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নেই।

মিয়ানমার সরকারের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে বিগত এ সময়ে মিয়ানমারে মগ, রাখাইনসহ সব সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা বাড়লেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কিভাবে কমেছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, একেকটি গণহত্যায় কত লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং কত লাখ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকরা বলছে, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার নিয়ে এখন বিশ্ব মোড়লদের একমত করতে হবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগ নিতে হবে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ গণহত্যা নিয়ে কোনো কথা বলছে না। বরং তারা মিয়ানমারের চরম মানবাধিকার লংঘনের শাস্তি বাংলাদেশের জন্যই যেন ঠিক করে রেখেছে। মিয়ানমারকে এ গণহত্যা বন্ধ ও রোহিঙ্গাদের নাগরিক স্বীকৃতির জন্য চাপ না দিয়ে বাংলাদেশকে বলছে আশ্রয় দিতে। বাংলাদেশের নাগরিক ও সরকার থেকে এখন বিশ্ব সভায় দাবি তুলতে হবে, এ গণহত্যার দায় মিয়ানমারকে নিতে হবে।

গত শনিবার ও গতকাল রোববার কক্সবাজার জেলার টেকনাফ, উখিয়া, কক্সবাজার সদর ঘুরে এবং স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বললে তারা এ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে বিশ্বজনমত তৈরির উদ্যোগের দাবি জানান।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটটি বাংলাদেশের নয়। এটি সম্পূর্ণ মিয়ানমারের সমস্যা। দীর্ঘ সময় ধরে দেশটি রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার নির্যাতন করেই চলেছে। সব সময় বিস্কোরণ ঘটে না। মাঝে মাঝে যখন পরিস্থিতি চরম রূপ নেয় তখন আমরা জানতে পারি। আর রোহিঙ্গারাও সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আর বিশ্ব মোড়লরা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো বাংলাদেশকেই বলে আশ্রয় দিতে। কিন্তু মিয়ানমারকে তারা কিছুই বলছে না। জাতিসংঘসহ সংস্থাগুলো একটিবারের জনও বলছে না যে, এটা গণহত্যা। তাই এবার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকারকে এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে। এ গণহত্যার জন্য মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে বাংলাদেশকে উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ আমরা যে মানবিক তা অনেকবার প্রমাণ করেছি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কক্সবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেন, আর কত রোহিঙ্গা আমরা আশ্রয় দেব। জাতিসংঘের কাছে অভিযোগ করতে হবে, মিয়ানমারের এ গণহত্যার বিরুদ্ধে। একটি দেশ বছরের পর বছর গণহত্যা চালিয়ে লাখ লাখ মানুষ খুন করবে এবং তাড়ানোর জন্য নির্বিচারে গুলি চালাবে, আর আমরা সেই দায় নেব। এটা তো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অবিচার আমাদের জন্য। গত তিরিশ বছরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমলো কিভাবে? কতজনকে হত্যা করেছে মিয়ানমার? এই জবাব বিশ্ব সভায় তুলতে হবে। বিশ্বের মানবতার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে মিয়ানমার কি করছে? গণহত্যার জন্য তাদের বিচার করতে হবে।

জেলা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ও উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, যেসব মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কথা বলছে তাদের উদ্দেশ্য রয়েছে। তারা এই জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে বাংলাদেশকে অস্থির করে রাখতে চায়। গত ২৫ বছরে রাখাইন রাজ্যের ৪০ লাখ রোহিঙ্গার সংখ্যা কেন ১০ লাখে নেমে এসেছেÑ এ বিচার বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে হবে। আমরা অনেক বেশি মানবিকতার পরিচয় দিয়েছি। এখন আমার বিচার চাওয়ার সময় এসেছে। জাতিসংঘসহ মানবাধিকারের ফেরিওয়ালাদের কাছে বলতে হবে ৩০ লাখ লোক কোথায় লুকিয়েছে মিয়ানমার।

জানা গেছে, রোহিঙ্গা বিষয়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে জাতিসংঘের কাছে বিচার চাইতে বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন থেকে দাবি ও সভা সমাবেশে আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে এবার সরকারও উদ্বিগ্ন। ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলোর কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। আসছে ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অভিবাসী সম্মেলনে এটি আলোচনায় প্রাধান্য পাবে বলে জানা গেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এই প্রতিবেদককে বলেছেন, আমরা মানবাকিতা দেখিয়ে আসছি। এটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জানে। কিন্তু এর স্থায়ী সমাধান মিয়ানমার সরকারকে করতে হবে। এটা আমরা বিশ্ব সম্প্রদায়কে বলছি।

সুত্র: আমাদের অর্থনীতি

Top