মগের মুল্লুকে নির্যাতিত মুসলমানদের আর্তচিৎকার

Cox-Ruhinga-Pic-1_1.jpg

মগের মুল্লুক মিয়ানমার থেকে স্বজনদের সাথে পালিয়ে আসা ক্ষুধার্থ এক শিশু

ইমাম খাইর, সিবিএন:
সীমান্তের এপার ওপার কোনটিই নিরাপদ নয় মিয়ানমারের মুসলমানদের জন্য। মগের মুল্লুকে থাকলে হত্যা, প্রাণ ভয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়লে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে স্বদেশে। দু’কূলের কোনটিতেই ঠাঁই নেই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতে নির্যাতিত মুসলমানদের। মিয়ানমারের সরকারী বাহিনীর ত্রিমুখী নৃশংসতায় দিশেহারা রোহিঙ্গাদের টেকনাফের নাফ নদীর ওপার থেকে ভেসে আসছে ভয়ার্ত কন্ঠস্বর ‘আমাদের বাঁচাও’।
মিয়ানমার তথা মগের মুল্লুকের সেনাবাহিনীর তাড়া খেয়ে এখন হাজার হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে প্রান ও সম্ভ্রম রক্ষার্থে পালিয়ে আসছে। একটু আশ্রয়ের জন্য হাত জোড় একটু মাথা গোজার ঠাই খোঁজছে। নাফ নদীর উভয় পাড়ের আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে নির্যাতিত রোহিঙ্গা মসুলমানদের কান্নায়। স্বদেশের অসহনীয় জুলুমে বিপর্যস্ত হয়ে তারা মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ থেকে জল ও স্থলপথে অবৈধভাবে ঢোকার অপেক্ষায় আছে ধর্ষণের শিকার নারী ,স্বামী হারা স্ত্রী, কেউ বা পুত্র ও পিতৃ ও স্বজনহারা। আবার অনেকেই আছে শরীর নির্যাতনে ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে শিশু। একদিকে নাফনদী ও সাগরে মিয়ানমার-বাংলাদেশের নৌবাহিনী ও কোষ্টগার্ডের টহল যানের আওয়াজে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব বিরাজ করছে সীমান্তে । এপারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী কঠোর ভাবে প্রতিরোধ করছে অবৈধভাবে রোহিঙ্গারা কোনভাবেই যেন তারা এই দেশে প্রবেশ করতে না পারে। আবার মিয়ানমারের সীমান্তে ওপারে অবস্থা আরো ভয়াবহ। নৌ , স্থল, আকাশ পথে চলছে থেমে থেমে নৃশংস আক্রমন। ফলে গগন বিধারী নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের আর্ত চিৎকারে ভারী হয়ে উঠছে আকাশ বাতাস। রাখাইন প্রদেশ জুড়ে বিশেষ করে উত্তর মংডুর রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় আতঙ্ক কাটছে না। সে দেশের সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর দমন পীড়ন ও নির্যাতনে কোণঠাসা রোহিঙ্গারা নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে। নাফ নদী ও সাগর জলে ভাসছে নারী-পুরুষ ও নিরীহ মানুষবোঝাই অনেক নৌকা। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা রাখাইন প্রদেশ ছাড়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন সীমান্তে ভিড় করে আছে। তবে তাদের প্রধান গন্তব্য বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীও তৎপর রয়েছে অনুপ্রবেশ রোধে।

সীমান্তের ওপার থেকে পালিয়ে আসা নির্যাতিত মুসলমানদের কয়েকজন।

সীমান্তের ওপার থেকে পালিয়ে আসা নির্যাতিত মুসলমানদের কয়েকজন।

সীমান্তের ওপার থেকে বিভিন্ন সূত্রে এবং এ পারে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নরনারীরা যে তথ্য দিচ্ছে তা লোমহর্ষক। গত শনিবার মিায়ানমার পুলিশ ও সেনাবাহিনী পাড়ায় ঢুকে বর্বরতা চালায়। বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়। পুরুষদের ধরে নিয়ে যায়। কোলের শিশুদের কেড়ে নিয়ে আগুনে পুড়ে হত্যা করেছে। এভাবে গ্রামের পর গ্রাম জালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে। স্বামী ও বড় ছেলেকে ভাতের পাত থেকে তুলে নিয়ে চোখের সামনেই হত্যা করেছে। সেই ভয়াবহ নির্যাতন-নির্মম গণহত্যা, অমানবিক অত্যাচার ও তান্ডবে টিকতে না পেরে প্রাণভয়ে ভিটে-মাটি ছেড়ে তিন মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দিই। কথাগুলো নদী-পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে তিনদিন পর আশ্রায় নেয়া মিয়ানমারের মংডুর কেয়ারিপাড়ার সুরা আকতারে (৬০)। এসময় তার চোখে-মুখে ভাসছিল অজানা শঙ্কা আর আতঙ্ক। শুধু সুরা আকতার নন, এক নৌকায় এসেছেন আরও ১৭ জন নারী, শিশু ও ৪ পুরুষ। এসময় নাফ নদীতে আর ১০/১২ নৌকায় বহু মানুষ ভাসতে দেখেছেন বলে জানান তিনি। প্রতিটি নৌকায় নারী-শিশু বেশি ছিল।
আরেক নারী আরেফা বেগম বলেন, ‘সেনাবাহিনীকে সন্ত্রাসী ধরতে বলা হয়েছে। কিন্তু তারা ধর্ষণ-নির্যাতনে লিপ্ত। তারা যেদিন যে পাড়ায় খুশি রাতের বেলা ঢুকে পড়ছে। যতক্ষণ তাদের মকছুদ (চাহিদা) পূরণ হয় না, ততক্ষণ তারা পাড়া ঘিরে কিশোরী যুবতীদের নির্যাতন চালাচ্ছে। স্বর্নালংকার, টাকা লুট করছে। তারপর ঘরে আগুন দিচ্ছে। প্রতিবাদ করলে গুলি করে, জবাই করে হত্যা করছে। মায়ের কোল থেকে শিশুদের কেড়ে নিয়ে আগুনে নিক্ষেপ করছে।

সাংবাদিকদের ব্রিফ করছেন বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন।

সাংবাদিকদের ব্রিফ করছেন বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন।

এদিকে মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের কারণে সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যাবেক্ষন করতে কক্সবাজারে এসেছেন বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন। শুক্রবার বিকালে তিনি টেকনফের শাহপরীদ্বীপসহ সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন।
এর আগে দুপুরে কক্সবাজারের টেকনাফ বন্দর রেস্ট হাউস প্রাঙ্গনে সংবাদ সম্মেলনে বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন (বিজিবি) এর মহাপরিচালক বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের মুসলিমদের উপর অনেক অত্যাচার করা হয়েছে। যা এখনো চলছে। ফলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তবে ঢালাওভাবে যেভাবে অনুপ্রবেশের কথা বলা হচ্ছে সেটি সঠিক না।
তিনি আরও বলেন, এক দেশ থেকে আরেক দেশে লোক বৈধভাবে আসতেই পারে। তবে যদি বৈধভাবে না আসে তাহলে আমাদের অনেক গুলো সমস্যা থেকে যায় সীমান্তে। আপনারা জানেন ইতোমধ্যে বিশ্বে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বাড়ছে। এছাড়াও অস্ত্র পাচার, চোরাচালানী, বিভিন্ন জিনিসপত্র চোরচালানী। সীমান্তে কিছু খারাপ মানুষ লেগেই থাকে। তাই আমরা সীমান্তে টহল জোরদার করেছি।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সৃষ্ট সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এ অবস্থায় রাখাইন প্রদেশ থেকে বৈধ পাসপোর্ট বিহীন কাউকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হবেনা।
এ সময় তিনি আরো বলেন, বিজিবির কড়া নজরদারি সত্ত্বেও দালালদের সহায়তার সীমান্তের ফাঁক ফোকর দিয়ে কিছু রোহিঙ্গা এ দেশে প্রবেশ করেছে। এসব দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ এবং প্রশাসনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সীমান্তে টহল জোরদার করার জন্য অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েনের কথা তিনি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি উল্লেখ করেন, ইতিমধ্যে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে যেসব রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে, তাদের মানবিক সহায়তা দিয়ে সেদেশে ফেরত পাঠানো হয়। মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ হলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধ বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। পাশাপাশি গত দু’দিনে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন বলেও জানান।
এদিকে বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশকালে ৪১ জন রোহিঙ্গাকে আটকের পর স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয় এবং নাফনদী থেকে রোহিঙ্গাবাহী ৪ নৌকা ফেরত পাঠনো হয়েছে।

Top