বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকের চাকুরি ও জীবনমান (পর্ব-২)

jalal-uddin-lohagar.jpg

জালাল উদ্দিন :
হাসিব বুদ্ধিমান, মেধাবী, সুদর্শন ও সচ্চরিত্রের অধিকারী বেশ হাসি খুশি বিনয়ী ছেলে।বংশবুনিয়াদ ও ভাল।সে আমার কলেজ জীবনের ছোট ভাই।আমাকে বেশ সম্মান করত, আমিও তাকে স্নেহ করতাম।কলেজ থেকে পাস করে বের হওয়ার পর তার সাথে আর দেখা হয় নি আমার।বছর চারেক আগে তার সাথে হঠাৎ দেখা।আলাপ চারিতায় জানতে পারলাম সে কোন একটা কলেজ থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী করে বর্তমানে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছে। আমি তার বিয়ে সাদি হয়েছে কি না জানতে চাইলে না সূচক জবাব দিল এবং সুবিধামত খবর নেওয়ার জন্য অনুরোধ করল।এক অভিভাকের এইচ এস সি পড়ুয়া একটি মেয়ে ছিল ;উনি একদিন কথা প্রসঙ্গে আমাকে জানাল তার মেয়েটিকে ভাল পাত্র পেলে বিয়ে দিয়ে দিবে।আমি তখন হাসিবের কথা তুললাম।তখন তিনি সব জেনে বললেন,”সব ঠিক আছে, তবে ছেলের পেশাটা তো ভাল লাগতেছে না, স্যার।”আমি বললাম কেন? শিক্ষকতা তো একটি সম্মানজনক পেশা।”তিনি বললেন,” দেখুন স্যার এ পেশাটিকে আমিও অত্যন্ত শ্রদ্ধাকরি।কিন্তু শুধু সম্মান দিয়ে তো আর জীবন চলে না! বর্তমান যুগে অর্থবিত্ত ও লাগে, না হয় পরিবার বলেন, সমাজ বলেন আর আপন জন বলেন কেউ আপনাকে ঠিক শ্রদ্ধাটা করবে না।”তিনি সে দিন হেসে হেসে আমায় আরও বললেন কথায় আছে না স্যার”অভাব যখন দরজায় আসিয়া দাড়াঁয়;তখন ভালবাসা জানালা দিয়ে পালায়।”পরে জেনে ছিলাম, কোন এক স্বল্পশিক্ষিত প্রবাসিকে উনার কন্যাটি পাত্রস্থ করেছিলেন।আর হাসিবও বছর খানেক পর একটি বানিজ্যিক ব্যাংকে যোগদান করে অনেকটা স্বচ্ছ ও পরিপাটি জীবন শুরু করেছিল।কিন্তু পাঠক,সে দিন আমি ঐ অভিভাকের কথায় বেশ মর্মাহত হলেও; তার কথায় যে অকাট্য যুক্তি আছে তা আমি অস্বীকার করতে পারিনী।তিনি তো ঠিকই বলেছেন, হাসিব শিক্ষকতা করে যে স্বল্প বেতন পায় তা দিয়ে তো ঐ ভদ্রলোকের কন্যার পাহাড় সমান চাহিদা সে মেটাতে পারবে না।এমন কি বর্তমানে অনেক বেসরকারী এমপিভুক্ত শিক্ষকগণ তাঁর প্রিয় কন্যাটিকেও উনার মত একজন বেসরকারি শিক্ষকে দিতে অস্বীকৃতিজ্ঞাপনকরেন।পাঠক,হাসিবের মত এরকম অনেক মেধাবী মুখ শিক্ষকতা পেশায় এসেও হতাশার চোরাবালিতে হরিয়ে যাচ্ছে তাদের স্বপ্ন।ফলে যাদের সরকারি চাকুরির বয়স, যোগ্যতা ও সামর্থ( অর্থ) আছে তারা পালিয়ে যাচ্ছেন অন্যপেশায়,আর যাদের সরকারি চাকুরির বয়স নাই বা কম মেধাবি বা সামর্থ(অর্থ)নাই; কিংবা শিক্ষকতার মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে গেছেন হয়তো তারাই এ পেশায় এখনও রত আছেন।কিন্তু তারাও যুগের সাথে তাল মিলাতে একটু সুন্দর স্বচ্ছল ভাবে জীব জাপন করার জন্য শিক্ষকতার পাশা-পাশি আর একটা কিছু করতে চায়।ফলে শ্রেণীতে সুন্দর, সাবলিল ও আকর্ষনীয় ভাবে পাঠদান করার জন্য শিক্ষক মহোদয়গণকে যে পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন তা নেওয়ার সময় হয়ে উঠে না।আর যারা একটু প্রস্তুনিয়ে ক্লাসে যেতে চায় তারা দ্বিতীয় আর একটা কিছু করতে পারে না।ফলে তাদের অন্য কোন বাহ্যিক আয় থাকে না;শুধু বেতনের টাকা দিয়ে জীবন চালাতে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।দেনার ভারে অতিষ্ট হয়ে উঠে জীবন।বিভিন্ন ঋণদান সংস্থা,বেতন প্রদানকারী ব্যাংক ও মহাজনদের কাছে ব্যাংকের চেক বই জমা রেখে চড়া সুদে ঋন গ্রহণ করে।এই ঋনের সুদে আসলে দেনা পরিশোধ করতে অনেকেই ভিটেবাড়ি বিক্রয় করতে শোনা যায়।
এমতাবস্থায় শিক্ষার মানোন্নয়ন চাইলে শিক্ষকের জীবন মান উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। শিক্ষকদের জীবন মান উন্নয়ন করতে হলে বেসরকারী স্কুল,কলেজ ও মাদ্রসাকে জাতীয় করণ করার মাধ্যমেই করতে হবে।আর এ অসাধ্য কাজটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধান মন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাছিনাই সাধন করতে পারবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।
(চলবে)
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, আধুনগর আখতারিয়া দাখিল মাদ্রাসা,লোহাগাড়া,চট্টগ্রাম।
মোবাইলঃ ০১৮১৬৩৫৮৫৪৫.

Top