বিশ্ব বদনা দিবস ; গুরুত্ব ও উপলদ্ধি

bodna-dibos_1.jpg

আতিকুর রহমান মানিক :

১৯ নভেম্বর, বিশ্ব টয়লেট দিবস আজ। বিভিন্ন দেশের সাথে বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে টয়লেট দিবস। অনেকে এটাকে বিশ্ব বদনা দিবসও বলে থাকেন। কারন টয়লেটের সাথে বদনার সম্পর্কটা গভীরভাবে জড়িত। বদনা ছাড়া টয়লেট করা অসম্ভব বললেই চলে। নগন্য হলেও দিনে কয়েকবার বদনার প্রয়োজন হয় সবার। বদনা আবিস্কার না হলে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারটা অসম্পূর্ণ থেকে যেত, মানবসভ্যতা বিকশিত হতনা। তাই বদনা ও বদনা দিবসকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। বিশেষ করে সমগ্র এশিয়া, আফ্রিকা ও খোদ ইউরোপের কিছু কিছু দেশে বদনা ছাড়া টয়লেট করার চিন্তাও করা যায়না। তাই টয়লেট দিবসকে বদনা দিবস বলার যৌক্তিকতা পর্যবেক্ষনশীল ব্যক্তিমাত্রই স্বীকার করবেন। টয়লেটকর্ম ছাড়াও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক কাজে লাগে বদনা। পাড়া-গ্রামের ক্ষেত-খামারে পানি দেয়ার কাজটি বদনা দিয়ে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়। আবার অনেকসময় গোসলের কাজেও বদনা পারফেক্ট। শৈশবে বিলে মাছ ধরার সময় বদনায় পানি দিয়ে জিয়ল মাছ রেখে পুকুরে ছেড়ে দিতাম আমরা। এরকম আরো হাজারো কাজের কাজী এই বদনা। উপকারী জিনিস হলেও বদনা নিয়ে দুর্গতির ইতিহাসও আছে। আগে অবস্হাপন্ন গৃহস্তদের কাছে পিতলের বদনা ব্যবহার ছিল অাভিজাত্যের প্রতীক। পিতলের এসব বদনা ছিল আস্বাভাবিক ভারী। আমাদের গ্রামের বাড়ীতে শৈশবে দেখা একটা ব্যাপার উল্লেখ করছি। বিনা নোটিশে হঠাৎ প্রকৃতির ডাকে দিশেহারা হওয়া এক পথচারী হন্তদন্ত হয়ে আমাদের উঠানে ঢুকে টয়লেট কোথায় জানতে চাইলেন। আমরা ছোটরা টয়লেট দেখিয়ে দিলে সামনে থাকা পিতলের বদনা নিয়ে দৌড়ে টয়লেটে ঢুকল বেচারা। কিন্তু পিতলের ভারী বদনাটি খালি হলেও ওজনে পানিভর্তি প্লাস্টিক বদনার সমান ছিল। তাই খালি বদনাকে পানিভর্তি মনে করে টয়লেটে ঢুকে মনের সুখে টয়লেট করার পর খালি বদনার ব্যাপারটা নজরে আসে তার। কিন্তু তখন বেচারা লজ্জায় শেষ। এর দীর্ঘক্ষন পরে আমরা তাকে “উদ্ধার” করেছিলাম। বদনা নিয়ে বিপত্তিতে পড়েছিলেন নতুন এক জামাই। এখানে ঘটনাস্হল উল্লেখ করা যাবেনা, এ লেখা তিনি পড়বেন। আর এতে আমার সামথিং প্রবলেম হতে পারে। কারন ছোটকাল থেকেই আমার নিরীহ কানদুটোর প্রতি তাঁর আকর্ষন বেশী, সুযোগ পেলেই মলে দিয়ে বিমলানন্দ লাভ করেন। যাই হোক ঘটনায় আসি। তিনি তখন নতুন জামাই। শশুর বাড়ীতে এলেই শালা-শালীদের জ্বালায় অস্হির থাকেন বেচারা। একান্নবর্তী পরিবারে নিজ ও চাচাতো-জেঠাতো মিলিয়ে ডজনখানিক শালা-শালী, এককথায় যন্ত্রনার বাহার। তিন চার ঘরে তিনিও একমাত্র দুলাভাই, তাই উপদ্রবগুলো হজম করা ছাড়া উপায় ছিলনা। একবার শশুরবাড়ীতে বিভিন্ন আইটেম সহযোগে ভরপেট খেয়ে ওভারলোড হওয়া দুলাভাইয়ের টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ল। দুষ্টু এক শ্যালক ছিদ্র হওয়া পুরাতন একটা বদনায় পানিভর্তি করে দিল। দুলাভাই তা নিয়ে টয়লেটে ঢুকে মনের সুখে ধীরে-সুস্হে সময় নিয়ে ভারমুক্ত হলেন। কিন্তু ততক্ষনে ছিদ্র দিয়ে বদনার পানি গলে শেষ। ঘটনার ভয়াবহতায় বেচারা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে (অপবিত্র অবস্হায়) দীর্ঘক্ষন ধরে কমোডে বসে আছেন। নতুন শশুরবাড়ী বলে কথা, কেলেংকারীর একশেষ। এদিকে টয়লেট করার প্রয়োজন না হলেও বাঁদরটাইপের আরেক শালা বদনা নিয়ে দরজা ধাক্কাচ্ছে, দুলাভাইকে নাজেহাল করার লক্ষ্যে। ভিতরে নতুন জামাইয়ের অবস্হা কেরোসিন। অবশেষে বাড়ীর মুরুব্বীরা ব্যাপারটা টের পেয়ে ফাটাবাঁশ হাতে নিয়ে পিচ্চিগুলোকে ধাওয়া করে জামাইকে উদ্ধার করলেন। তার তখনকার শালাগুলো আজ সবাই দেশে-বিদেশে কর্মজীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত, আর শালীরা সবাই পুরোদস্তুর গৃহিনী। পারিবারিক উৎসব-পার্বনে সবাই একত্রিত হলে এই বদনাকান্ড এখনো নির্মল হাসির খোরাক যোগায়। এই না হলে বদনা বিপত্তি! বদনা এমনই এক জিনিস। এখনকার জামাইদের অাবার এরকম নাজেহাল করার সুযোগ নেই, কারন এখন টয়লেটের ভিতরেই পানির লাইন।
আজকাল সবজায়গায় “পরিবেশ রক্ষা” বড় একটা ফ্যাক্টর। বিভিন্ন ব্যাপারে পরিবেশবাদীরা সবসময়ই বেশ সোচ্চার। আজকাল প্লাস্টিকের বদনা আকছার ব্যবহৃত হচ্ছে। প্লাস্টিকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব মাটির বদনা ব্যবহার ও প্রচলনের জন্য আন্দোলন করতে পারেন পরিবেশবাদীরা। পোড়া মাটির এ বদনাকে চাটগাঁইয়া ভাষায় “কত্তি” বলে। এক্ষেত্রে পরিবেশবাদীদের শ্লোগান হতে পারে এরকম,
“পরিবেশের ক্ষতি করবেননা এক রত্তি,
ঘরে ঘরে ব্যবহার করুন পোড়া মাটির কত্তি”!!
গণমানুষের অধিকার রক্ষার নামে ভূঁইফোড় ও প্যাডসর্বস্ব বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্হার বাড়াবাড়ি-ধান্দাবাজি আজকাল চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু প্রত্যেকজনের জন্য মাথাপিছু একটা করে বদনা নিশ্চিত করার জন্য কোন সংস্হা এখনো গঠিত হয়নি। এজন্য আন্তর্জাতিক “বদনাধিকার” সংস্হা গঠন করা যায়। দেখতে অপ্রয়োজনীয় হলেও বদনা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে অসীম অবদান রাখছে। নগন্য- নিরীহ এই বদনা কিন্তু সবসময়ই বিশাল ক্ষমতা রাখে। আপনি যত বড় ক্ষমতাধর, রাজনীতিক, মাস্তান ও ক্যাডারই হোননা কেন, বদনা হাতে টয়লেটে যাওয়ার পর আপনাকে এর সামনে প্যান্ট খুলতেই হবে। বদনার এ ক্ষমতা অস্বীকার করার উপায় নেই, এর সামনে ধনী-গরীব, ছোট-বড় সবাই সমান। একমাত্র এখানেই গণতন্ত্র আছে। জয়তু বদনা, সবাইকে বদনা দিবসের শুভেচ্ছা।
“আজকের এ দিনে একটাই প্রার্থনা,
সবার জন্য নিশ্চিত হোক মাথাপিছু বদনা”।

আতিকুর রহমান মানিক ,ফিশারীজ কনসালটেন্ট ও সংবাদকর্মী।

মুঠোফোন, ০১৮১৮-০০০২২০

Top