প্রাণনাশের চক্রান্তের কারণেই ভারতীয় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি

khaleda-zia-interview.jpg

বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেয়া সাক্ষাৎকার :

♦ শেখ হাসিনার ফোনালাপ ছিল সাজানো নাটক ♦ ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিন শত চেষ্টা করেও দল ভাঙতে পারেনি ♦ অবর্ণনীয় জুলুম নির্যাতনেও টিকে আছে বিএনপি ♦ দলে অবিশ্বাস নেই, আছে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ♦ আন্দোলন গদি দখল নয় অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য

রাজধানীর গুলশান কার্যালয়ে গত রবিবার রাতে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকার দেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। গত দশ বছরে বাংলাদেশের কোনো জাতীয় দৈনিককে এই প্রথম তিনি সাক্ষাৎকার দিলেন। কথা বলেছেন, দেশের রাজনীতি, দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, আগামী নির্বাচন, শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ প্রসঙ্গ, ভারতীয় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ না করাসহ নানা ইস্যু নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের   সিনিয়র রিপোর্টার মাহমুদ আজহার

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ২০১৩ সালের ৩ মার্চ ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরকালে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ না হওয়াকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন।  তিনি বলেন, ‘ওই সময় বিশ্বস্ত সূত্রে আমাদের কাছে খবর আসে, আমি সাক্ষাৎ করতে গেলে আমাদের গাড়িবহরের ওপর হামলা চালিয়ে তার দায় জামায়াতের ওপর চাপানো হবে। প্রাণনাশের এই চক্রান্তের কথা জেনে আমি বাধ্য হয়ে সৌজন্য সাক্ষাতের কর্মসূচি বাতিলের অনুরোধ জানাই।’

৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, ‘তার (প্রধানমন্ত্রী) ফোন করার ব্যাপারটি ছিল লোক দেখানো, একটি সাজানো নাটক। একটি ধূর্ত চাতুরী মাত্র। তারিখ নয়, আলোচনাকে প্রাধান্য দিলে তিনি পরদিনও আমন্ত্রণ জানাতে পারতেন। রাজনীতিতে কৌশল থাকে, কিন্তু অপকৌশলে কোনো লাভ হয় না।’ দীর্ঘ আলাপচারিতায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দলীয় কর্মকৌশল নিয়ে খালেদা জিয়া খোলামেলা কথা বলেন। ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে না যাওয়ার নানা যুক্তি তিনি তুলে ধরেন। নিজের একাকিত্ব বা অবসর সময় কাটানো নিয়েও কথা বলেন বিএনপি-প্রধান।

দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস নেই বলেও দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন বেগম খালেদা জিয়া। তার ভাষায়, ‘বিএনপির মতো বিশাল সংগঠনে নেতৃত্বের পর্যায়ে একটা প্রতিযোগিতা থাকবেই। এটা দ্বন্দ্ব বা সন্দেহ-অবিশ্বাসের ব্যাপার নয়। কখনো তেমন আলামত দেখা দিলে আমরা সাংগঠনিক প্রক্রিয়াতেই সেসবের নিরসন করে থাকি।’ নিজের ও বড় ছেলে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলায় সাজা আতঙ্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো অন্যায়-অপরাধ, দুর্নীতি করিনি। কাজেই ন্যায়বিচার হলে আল্লাহর রহমতে আমরা সসম্মানে বেরিয়ে আসব। অন্যায়ভাবে রায় ঘোষণা হলে তার পরিণাম ও প্রতিফল কী দাঁড়াবে তা সময়ই বলবে। ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিনের জরুরি সরকার আমাকে জেলে আটকে রেখে শত চেষ্টা করেও বিএনপি ভাঙতে পারেনি।’ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যম স্বাধীন ও স্বাভাবিক ধারায় কাজ করতে পারছে না। হত্যা-নির্যাতনের খড়গের পাশাপাশি চাপ এবং লোভ-টোপ আর হুমকিতে মিডিয়া বশে রাখার চেষ্টা প্রতিনিয়ত চলছে।’ দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে জানান, ‘দলকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করা হবে। ক্রমান্বয়ে আরও বেশিসংখ্যক তরুণ ও নারীকে দলের নেতৃত্বে নিয়ে আসা হবে।’

বর্তমান  রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ‘দীর্ঘ এক দশক ধরে অবর্ণনীয় জুলুম-নির্যাতন সত্ত্বেও বিএনপি টিকে আছে। শুধু তাই নয়, জনসমর্থন লাভের দিক দিয়ে প্রতিদিন এই দল আরও শক্তিশালী হচ্ছে। আরও পরিপুষ্ট হচ্ছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে এনে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। আমাদের এ প্রচেষ্টা কাউকে সরিয়ে নিজেরা সরকারে বসার জন্য নয়। এ লড়াই গদি দখলেরও নয়। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার। কারা সরকার চালাবে, তা জনগণকেই ঠিক করতে দিতে হবে। সমুদ্রের মতো বিশাল আমাদের এই দলে নানামুখী তরঙ্গ আছে। এই সক্রিয়তা ও বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি। এগুলো দুর্বলতার লক্ষণ নয়।’

খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎকারটি ছিল এ রকম :

বাংলাদেশ প্রতিদিন : টানা ১০ বছর ক্ষমতার বাইরে, এখন বিরোধী দলেও নেই বিএনপি। এর মধ্যে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে দলে। আজ কোন অবস্থানে বিএনপি— দলের প্রধান হিসেবে এ ১০ বছর নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই?

খালেদা জিয়া : প্রথমেই বলি, ‘ক্ষমতা’ কথাটা নিয়ে আমার আপত্তি আছে। সরকার পরিচালনাকে আমি দায়িত্ব মনে করি। ক্ষমতা মনে করি না। এ কথা ঠিক যে, ১০ বছর ধরে আমরা মানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি সরকার পরিচালনার দায়িত্বে নেই। তবে সরকারে নেই বলে আমরা বিরোধী দলেও নেই— এ কথা সঠিক নয়। যদি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের কথা ধরা হয়, তাহলে এখন তথাকথিত যে সংসদ আছে, তা প্রায় বিনা ভোটেই নির্বাচিত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এটা কোনো সত্যিকারের সংসদ নয়। সেখানে সত্যিকারের কোনো বিরোধী দলের অস্তিত্বও নেই। তথাকথিত বিরোধী দলের সদস্যরা সরকারের মন্ত্রিসভায়ও আছেন। আসলে একটা পাতানো খেলার সংসদে পাতানো বিরোধী দল সবার হাসির খোরাক হয়েছে। মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে পাতানো খেলার সংসদ বসিয়ে এমন প্রহসন করা ঠিক হয়নি। আমরা এতে শামিল হইনি, হতে পারি না।

মানুষকে ভোট দিতে না দিয়ে সিট বাটোয়ারা বা আসন ভাগাভাগির ভাগ আমাদেরও দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। প্রকাশ্যেই বলা হয়েছিল যে, আমাদেরও বঞ্চিত করা হবে না। আমরা সে ভাগাভাগিতে যাইনি। আমরা জনগণের ভোটের অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছি। এখনো আছি। ভবিষ্যতেও থাকব।

বিএনপি সরকারে কিংবা সংসদে থাকুক বা না থাকুক, এটি এ দেশের গণমানুষের সমর্থনধন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক শক্তি বিএনপি। রাজপথে, সমাবেশে এবং দেশবাসীর বিপুল সাড়া ও স্পন্দনে তা প্রমাণিত।

বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলে জনগণ সে নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচন একতরফা প্রহসনে পরিণত হয়। ভবিষ্যতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কোনো সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে জনগণ আবারও প্রমাণ করবে তারা বিএনপিকে কতটা ভালোবাসে। প্রমাণ হবে বিএনপি কতটা শক্তিশালী। এক দশক ধরে অবর্ণনীয় জুলুম-নির্যাতন সত্ত্বেও বিএনপি টিকে আছে। শুধু তাই নয়, জনসমর্থন লাভের দিক দিয়ে প্রতিদিন এই দল আরও শক্তিশালী, আরও পরিপুষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

খালেদা জিয়া : বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে এনে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। আমাদের এ প্রচেষ্টা কাউকে সরিয়ে নিজেরা সরকারে বসার জন্য নয়। এ লড়াই গদি দখলের নয়, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই এই রাষ্ট্রের স্রষ্টা ও মালিক। তারাই সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস। কারা সরকার চালাবে তা তাদেরই ঠিক করতে দিতে হবে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : ১০ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি দুই দফা কাউন্সিল করলেও দল অগোছালো বলেই মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

খালেদা জিয়া : একটি দল গোছালো নাকি অগোছালো সে ব্যাপারে বাইরে থেকে নানান রকম মতামত ও মূল্যায়ন আসতেই পারে। সমুদ্রের মতো বিশাল আমাদের এই দলে নানামুখী তরঙ্গ আছে। এই সক্রিয়তা ও বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি। এগুলো দুর্বলতার লক্ষণ নয়।

অনেক বেশি চিন্তাধারা, বহু রকমের মতামত বিএনপি ধারণ ও আত্মস্থ করতে পারে। নানান সামাজিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণির মানুষ, বিভিন্ন পেশা ও গোষ্ঠীর মানুষ সৃষ্টিশীল বিতর্কের মধ্য দিয়ে বিএনপিকে এগিয়ে নেয়। বিভিন্ন চিন্তা ও মতের সংশ্লেষ ও বিতর্কের মধ্য থেকে আমরা সঠিক পথটি বেছে নিই। বাইরে থেকে এগুলো দেখে দলকে অগোছালো মনে হতে পারে কিন্তু আমরা তা মনে করি না।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : বিগত সময়ে আন্দোলনে ব্যর্থতার জন্য সাংগঠনিক দুর্বলতাকেই দায়ী করা হয়।

খালেদা জিয়া : আমাদের আন্দোলন চলমান আছে। এই সংগ্রাম কখনো উত্তাল কখনো ধীরগতির হয়। পরিস্থিতির আলোকে আন্দোলনের কৌশল ও কর্মসূচি নির্ধারিত হয়। এরশাদের স্বৈরাশাসনের বিরুদ্ধে আমরা নয় বছর ধরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছি। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নতুন পর্যায়ে আন্দোলন শুরু করেছি। এ আন্দোলন সফল নাকি ব্যর্থ— সে কথা বলার সময় এখনো আসেনি।

আমাদের সংগঠন দুর্বল নয়। তবে আমাদের আন্দোলন গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক। সবচেয়ে কম ক্ষয়ক্ষতিতে সবচেয়ে বেশি সাফল্য অর্জনই আমাদের কৌশল। আর আন্দোলন বলতে আমরা পুলিশের সঙ্গে যুদ্ধ বুঝি না। জ্বালাও-পোড়াও, সন্ত্রাসে আমরা বিশ্বাস করি না। যদিও আমাদের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনকে স্যাবোটাজ করতে প্রতিপক্ষ আমাদের কর্মসূচি চলাকালে বিভিন্ন নাশকতা করে আমাদের ওপর দায় চাপাতে চায়।

আমাদের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে দিয়ে দেশের কারাগারগুলো ভরে ফেলা হয়েছে। শত শত নেতা-কর্মী গুম ও খুন হয়েছেন। লাখ লাখ নেতা-কর্মী মিথ্যা মামলায় জর্জরিত। অনেকে বাড়িঘরে ঘুমাতে পারেন না। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন পলাতক জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন মাসের পর মাস। মোট কথা বিএনপি ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার। তবুও আমরা নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথ থেকে বিচ্যুত হইনি। আমাদের সভা-সমাবেশ পর্যন্ত করতে দিতে চায় না। তবুও আমাদের নেতা-কর্মীরা অসংযত ও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠেননি। আমরা শুধু আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ ও জনগণের কাছে নালিশ জানিয়ে বিচারের ভার দিই। অনেক সময় রাজপথ দখলের চেয়ে জনগণের হূদয়-মন অধিকার করাকেই আমরা বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জনগণের সংগ্রাম কখনো বিফল হয়নি, ব্যর্থ হবে না।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস প্রকট।

খালেদা জিয়া : বিএনপির মতো বিশাল সংগঠনে নেতৃত্বের পর্যায়ে একটা প্রতিযোগিতা থাকবেই। এটা দ্বন্দ্ব বা সন্দেহ-অবিশ্বাসের ব্যাপার নয়। কখনো তেমন আলামত দেখা দিলে আমরা সাংগঠনিক প্রক্রিয়াতেই সেসবের নিরসন করে থাকি।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : আপনার ছোট ছেলে মারা গেছেন, বড় ছেলে দেশের বাইরে। আপনি কি কখনো একাকিত্বে ভোগেন?

খালেদা জিয়া : আমি কেমন আছি সবাই জানেন। দেশবাসীও অনুভব করেন। তবে আমি ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা বলতে চাই না। দেশ-জাতির সমস্যা-সংকটের কাছে এগুলো তুচ্ছ। আমি দেশের মানুষ ও দলীয় নেতা-কর্মীদেরই আমার সম্প্রসারিত পরিবার মনে করি। আমি তাদের মধ্যেই আছি। তাদের মধ্যেই আমার স্বজনদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : সরকারের মন্ত্রী ও নেতারা বলছেন, নির্ধারিত সময়ের আগে নির্বাচন নয়। আগামী নির্বাচনের জন্য আপনার দল কতটুকু প্রস্তুত?

খালেদা জিয়া : তারা তো বলবেনই। তারা জনগণকে ভয় পান। ভোটারদের রায় নিতে শঙ্কাবোধ করেন। বিনা ভোটে তারা ক্ষমতায় বসে যা খুশি তা করে যাচ্ছেন। এই স্বর্গ তারা সহজে হারাতে চাইবেন না। ছলে-বলে কলে-কৌশলে যতদিন থাকা যায় সে চেষ্টা তো তারা করছেনই। তবে জনমতের ও গণতান্ত্রিক বিশ্বের চাপ তারা কতদিন উপেক্ষা করতে পারবেন, সেটাই দেখার বিষয়।

বিএনপি সব সময়ই নির্বাচনমুখী গণতান্ত্রিক দল। তবে সে নির্বাচনটা হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। প্রতিদ্বন্দ্বী সব পক্ষের অবস্থান একই সমতলে থাকতে হবে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সরকার মানেনি। শেখ হাসিনার অধীনেই বিগত সংসদ নির্বাচন হয়েছে। সামনেও তার অধীনেই নির্বাচন হওয়ার কথা বলছে সরকার।

খালেদা জিয়া : না না, নির্বাচন হয়েছে এ কথা সত্য নয়। নির্বাচনের নামে কী হয়েছে তা সবাই জানে। এমন প্রহসন কি বার বার এবং কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে? আমরা প্রহসনের অংশীদার হব না, নির্বাচন করতে চাই। নির্বাচনের একটা প্রধান পক্ষ বিএনপি। কাজেই আমাদের কথা শুনতে হবে। এজন্য আমরা সব সময় আলোচনার কথা বলে আসছি। এখনো আলোচনার দরজা খুলে রেখেছি।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : অনেকেই বলছেন, বিগত নির্বাচনে বিএনপির অংশ না নেওয়া ছিল ভুল। এ ছাড়া ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ না করা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেলিফোনের ডাকে সাড়া না দেওয়াও সঠিক হয়নি।

খালেদা জিয়া : বললাম তো নির্বাচন হয়নি, প্রহসন হয়েছে। আমরা তাতে শামিল হইনি। শুধু বিএনপি নয়, উল্লেখযোগ্য কোনো বিরোধী দল তাতে অংশ নেয়নি। জনগণও সেই প্রহসন বর্জন করেছে। এরশাদের স্বৈরশাসনের সময়ও আমরা কোনো পাতানো নির্বাচনে অংশ নিইনি। সুষ্ঠু নির্বাচন, জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আপসহীনভাবে চালিয়ে সফল হয়েছি।

ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ না হওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক। তার সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত জানা-শোনা ও চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। অনেকবার তার সঙ্গে আমার আনুষ্ঠানিক বৈঠক ও সাক্ষাৎ হয়েছে। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনিই আমাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন আমার অফিসে এসে। নয়াদিল্লিতে রাষ্ট্রীয় ভবনে তিনি আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানান এবং পরম সৌজন্য প্রদর্শন করেন।

ভারতের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সফরে এলে তার সঙ্গে আমার সৌজন্য সাক্ষাৎ নির্ধারিত ছিল। তিনি এ দেশে সম্মানিত মেহমান ছিলেন। তাকে কোনোভাবে অসম্মানিত করার কথা আমরা কখনো কল্পনাও করিনি। বিশেষ করে তিনি যে অসামান্য সৌজন্য দেখিয়েছিলেন তাতে আমরা মুগ্ধ হয়েছিলাম। সবার মনে থাকার কথা, এর আগেরবার শ্রী মুখার্জি ঢাকা সফরে এসে পরিষ্কার করে বলেছিলেন যে, বিশেষ কোনো দল নয়, বাংলাদেশের জনগণ ও সব দলের সঙ্গে ভারত সুসম্পর্ক চায়।

তার এ বক্তব্যে এবং এরপর তখনকার বিরোধী দলের নেতা হিসেবে আমি ভারত সফরকালে এই বক্তব্যের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশের একটি মহল আতঙ্ক বোধ করে। তারা চায়নি ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আমার সৌজন্য সাক্ষািট হোক। দুর্ভাগ্যবশত আমার সাক্ষাতের দিনটিতে অন্য একটি ইস্যুতে আমাদের জোটভুক্ত দল জামায়াতে ইসলামী হরতাল দিয়েছিল। তার পরও আমরা সাক্ষাতের ব্যাপারে প্রবলভাবে আগ্রহী ছিলাম। কিন্তু ঢাকায় শ্রী মুখার্জির অবস্থানস্থলের অদূরে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভিতরে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। আগের সন্ধ্যায় বিশ্বস্ত সূত্রে আমাদের কাছে খবর আসে যে, আমি সাক্ষাৎ করতে গেলে আমাদের গাড়িবহরের ওপর হামলা চালিয়ে তার দায় জামায়াতের ওপর চাপানো হবে।

প্রাণনাশের এই চক্রান্তের কথা জেনে আমি বাধ্য হয়ে সৌজন্য সাক্ষাতের কর্মসূচি বাতিলের অনুরোধ জানাই। আগের রাতেই নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা জানিয়ে ভারতীয় দূতাবাস কর্মকর্তাদের মারফত এ অনুরোধ জানানো হয়। আমি বিশ্বাস করি, তারা বিষয়টি অনুধাবন করেছেন। তবে এ নিয়ে আমাদের দেশের একটি বিশেষ মহল অহেতুক শোরগোল তুলেছে।

শেখ হাসিনার টেলিফোনের ডাক কথাটা পরিষ্কার নয়। সব দলের অংশগ্রহণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু করার জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে আসছিলাম। শেখ হাসিনা তা প্রত্যাখ্যান করে বার বার বলছিলেন যে, তারা তাদের অবস্থান থেকে একচুলও নড়বেন না। এরপর আলোচনার দাবিতে আমাদের দেওয়া আলটিমেটামের মধ্যে হঠাৎ প্রচার শুরু হলো তিনি লাল টেলিফোনে আমাকে ফোন করে পাচ্ছেন না। এই প্রচারণা সত্য ছিল না। কেননা আমার লাল টেলিফোনটি শুরু থেকেই বিকল ছিল। পরদিন ছিল আমাদের জোটের ডাকা হরতাল। সন্ধ্যায় তিনি মিডিয়াকে ডেকে তাদের সামনে একটি সেলফোনের নম্বরে আমাকে ফোন করেন এবং একের পর এক বিভিন্ন অভিযোগ করতে থাকেন। আমি সেগুলোর জবাব দিই। একপর্যায়ে তিনি পরদিনের হরতাল বাতিল করে যতজন খুশি সঙ্গে নিয়ে গণভবনে খেতে যাওয়ার দাওয়াত দেন।

আমি আলোচনা ও সমঝোতার স্বার্থে তাতে রাজি হই এবং বলি যে, আমাদের দল-জোটের নেতারা হরতালের প্রাক্কালে পুলিশি তাড়ায় আত্মগোপনে আছেন। এ অবস্থায় তাদের পাওয়া এবং আজকেই ডেকে আলোচনা করা সম্ভব হচ্ছে না। কাজেই এরপর যে কোনো দিন ডাকলে আমরা যেতে প্রস্তুত আছি। তিনি তার কথা বলে ফোন রেখে দেন। আর আমাদের কখনো না ডেকে প্রচার শুরু করেন যে, আলোচনার দুয়ার বন্ধ হয়ে গেছে।

আসলে আলোচনার ব্যাপারে তিনি আন্তরিক ছিলেন না। ফোন করার ব্যাপারটি ছিল লোক দেখানো একটি সাজানো নাটক, একটি ধূর্ত চাতুরী মাত্র। তারিখ নয় আলোচনাকে প্রাধান্য দিলে তিনি পরদিনও আমন্ত্রণ জানাতে পারতেন।

রাজনীতিতে কৌশল থাকে কিন্তু অপকৌশলে কোনো লাভ হয় না। মানুষ বোকা নয়, তারা বুঝে ফেলে। সে কারণেই জনগণ তাদের বর্জন করেছে। একতরফা নির্বাচনের আয়োজন প্রহসনে পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগ কলঙ্কিত হয়েছে। আমরা ভুল করিনি। অতি চালাকির ফাঁদে তারাই আটকা পড়েছে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : আপনি ও আপনার বড় ছেলেসহ বিএনপির সিনিয়র নেতারা মামলায় জর্জরিত। আপনার মামলার গতি-প্রকৃতিতে অনেকেই বলেন, আপনারও সাজা হয়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যে আপনার ছেলের এক মামলায় সাত বছর সাজা হয়েছে। কোনো কারণে আপনারা নির্বাচনে ‘অযোগ্য’ হলে দল ভেঙে যেতে পারে কিনা?

খালেদা জিয়া : এটা হাইপথেটিক্যাল প্রশ্ন। তবে বাংলাদেশে ন্যায়বিচার নেই তা সবাই জানে। দলীয়করণ ও দৃশ্য-অদৃশ্য প্রভাবে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। প্রধান বিচারপতি নিজে প্রকাশ্যে বলেছেন যে, তাদের হাত-পা বাঁধা। ফলে অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে নিম্ন আদালতে সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও ইঙ্গিতের প্রতিফলন ঘটে। তারেক রহমানকে বিচারিক আদালত বেকসুর খালাস দিয়েছিল। সেই রায় ক্ষমতাসীনদের পছন্দ না হওয়ায় তাদের রোষানল থেকে বাঁচতে বিচারককে সপরিবারে দেশত্যাগ করতে হয়েছে। এরপর ন্যায়বিচারের কোনো সুযোগ বা পরিবেশ থাকার কথা নয়। সময়মতো তারেক রহমানের মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।

আমরা কোনো অন্যায়-অপরাধ, দুর্নীতি করিনি। কাজেই ন্যায়বিচার হলে আল্লাহর রহমতে আমরা সসম্মানে বেরিয়ে আসব। অন্যায়ভাবে রায় ঘোষণা হলে তার পরিণাম ও প্রতিফল কী দাঁড়াবে তা সময়ই বলবে। ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিনের জরুরি সরকার আমাকে জেলে আটকে রেখে শত চেষ্টা করেও বিএনপি ভাঙতে পারেনি। আমার বিশ্বাস, অন্যরাও পারবে না। তবে খারাপ কোনো উদাহরণ সৃষ্টি না করাই ভালো। মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের এ দেশে আবহাওয়া বিনা নোটিসে দ্রুত বদলে যায়। কখন কার ভাগ্যে কী ঘটে সে কেবল আল্লাহ রব্বুল আলামিনই জানেন।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : দলের বাইরে থাকা সংস্কারপন্থিদের নিয়ে আপনার কোনো চিন্তাভাবনা আছে কিনা?

খালেদা জিয়া : দলে সংযোজন-বিয়োজনের ব্যাপারগুলো প্রয়োজনের নিরিখে সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় ঘটে। সেভাবেই হবে। সময় হলে দেখতে পাবেন।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : কাউন্সিলের পর আপনার নেতৃত্বে বিএনপির নতুন কমিটি হয়েছে। অনেকেই বলেন, এর পরও দল গতিশীল হচ্ছে না। আপনার মূল্যায়ন কী?

খালেদা জিয়া : দল যথেষ্ট গতিশীল এবং ক্রমান্বয়ে আরও গতিশীল হবে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : অবসর সময় কীভাবে কাটে?

খালেদা জিয়া : বই ও পত্রপত্রিকা পড়ি। টেলিভিশন দেখি।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : দল নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

খালেদা জিয়া : দলকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করা। ক্রমান্বয়ে আরও বেশিসংখ্যক তরুণ ও নারীকে দলের নেতৃত্বে নিয়ে আসা।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : জীবনের এই প্রান্তে এসে দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?

খালেদা জিয়া : আমার প্রত্যাশা, শহীদ জিয়াউর রহমানের কালজয়ী আদর্শ তারা আরও বেশি ধারণ করবেন এবং গণমানুষের স্বার্থে দলের কর্মসূচি এগিয়ে নেবেন।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : বর্তমান সরকারের আমলে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে বলুন?

খালেদা জিয়া : গণমাধ্যম স্বাধীন ও স্বাভাবিক ধারায় কাজ করতে পারছে না। হত্যা-নির্যাতনের খড়গের পাশাপাশি চাপ এবং লোভ-টোপ আর হুমকিতে মিডিয়া বশে রাখার চেষ্টা প্রতিনিয়ত চলছে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : দেশবাসীর জন্য আপনার কোনো বক্তব্য আছে কি?

খালেদা জিয়া : দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকুন। অধিকার আদায়ে সোচ্চার হোন।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : আপনাকে ধন্যবাদ।

খালেদা জিয়া : বাংলাদেশ প্রতিদিনের অগণিত পাঠককেও ধন্যবাদ।

Top