প্রশ্ন ফাঁসে গেঞ্জি!

exam.jpg

অেনলাইন ডেস্ক : পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পরীক্ষায় জালিয়াতিতে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। অভিনব কায়দায় পরীক্ষার হল থেকে প্রশ্ন জালিয়াতির জন্য সিন্ডিকেটটি চীন থেকে আমদানি করে নতুন নতুন ডিভাইস। এসব ডিভাইস ব্যবহারের জন্য তারা নিজেদের টেইলার্স থেকে কাটা কাপড়ে তৈরি করে স্যান্ডো গেঞ্জি। ডিজিটাল ডিভাইস সংযুক্ত ওই গেঞ্জি গায়ে দিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে যায় জালিয়াতির মাধ্যমে ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা।

শুধু তাই নয়, সিন্ডিকেটটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বছর ১২ জন শিক্ষার্থীকে চূড়ান্ত মেধা তালিকায় টিকিয়েছে। গত বছরও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনজন শিক্ষার্থীকে তারা ভর্তির জন্য জালিয়াতি করেছে। যারা এখন দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।

সিন্ডিকেটটি মূলত দালালদের মাধ্যমেই ভর্তি হতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এজন্য লেনদেন হয় মোটা অঙ্কের টাকা। সিন্ডিকেট সদস্যরা বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র। তাদের বৈদ্যুতিক ডিভাইস ব্যবহারের দক্ষতা ও পরীক্ষার হল থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের দ্রুত সমাধান দেয়ার মেধা ও দক্ষতা রয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সূত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

গত ১৫ নভেম্বর রাতে রাজধানীর পল্টন ও লালবাগ এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতিতে জড়িত চার যুবককে হাতেনাতে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন ২০১৫ সালের ঢাবির ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়ন ও কালচার বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র মাসুদ রানা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের ফাস্ট ক্লাস সেকেন্ড ছাত্র জুয়েল খান, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০২ সালে উত্তীর্ণ ভূগোল বিভাগের ছাত্র কায়সার আলম খোকন এবং ঢাবির মার্কেটিং বিভাগের অনিয়মিত ছাত্র রাজিদুল শেখ।

এ সময় তাদের কাছ থেকে ৫২টি এটিএম কার্ডসদৃশ কমিউনিকেটিং ডিভাইস, ৪৫টি ব্লুটুথ হিয়ারিং ডিভাইস, ৪৭টি সিম, সিল, ডিভাইসযুক্ত কালো গেঞ্জি, ল্যাপটপ, ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর বিভিন্ন সনদপত্র ও মার্কশিট। এছাড়া জামানতের ১২ লাখ টাকার অগ্রিম চেক জব্দ করা হয়।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ওই অভিযানের প্রধান সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার এহসার উদ্দিন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, আমরা আদালতে গ্রেফতারকৃতদের সাতদিনের রিমান্ড চেয়েছিলাম। মঞ্জুর হয়েছিল একদিন। জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছে। রিমান্ড শেষে তাদের কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। আরো জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত বরাবর আর্জি জানানো হবে বলে জানান তিনি।

চক্রটিকে জিজ্ঞাসাবাদকারী সিআইডির পরিদর্শক আওরঙ্গজেব জাগো নিউজকে বলেন, সিন্ডিকেট সদস্যরা অভিনব কায়দায় জালিয়াতির জন্য চীন থেকে আনা ডিভাইস ব্যবহার করেছিল। গাজীপুরের একটি চক্র রয়েছে, যারা চীন থেকে ওইসব ডিভাইস আমদানি করে। তাদের সঙ্গে যোগসাজশে ডিভাইসগুলো কিনেছিল সিন্ডিকেটটি।

তিনি বলেন, চক্রটি ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীদের একটি কক্ষে নিয়ে কীভাবে ডিভাইস ব্যবহার করতে হবে তা দু-একদিন আগে হাতেনাতে প্রশিক্ষণ দিতো। কেউ যাতে কোনো ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার মূল মার্কশিট ও সার্টিফিকেট রেখে দিতো।

জালিয়াতির নতুন সংস্করণ ডিভাইসযুক্ত গেঞ্জি

চক্রটির অভিনব জালিয়াতির নতুন সংস্করণ ডিভাইসযুক্ত স্যান্ডো গেঞ্জি। নিজস্ব টেইলার্সে গেঞ্জির সেলাইয়ের ভাঁজে ভাঁজে ডিভাইসের তার সংযোগ দেয়া হতো, যা বাইরে থেকে দেখার কোনো সুযোগ নেই। পিঠের কাছে থাকতো সেন্ট্রাল কন্ট্রোল ইউনিট। কানের কাছে শার্টের কিংবা গেঞ্জির সেলাইয়ের নিচে থাকতো ক্ষুদ্র হেডফোন। এছাড়া সংযোগ লাগানো থাকতো ব্যাংকের এটিএম কার্ডসদৃশ সিমকার্ডের সঙ্গে। ভর্তি পরীক্ষার কক্ষে অটো রিসিভ ডিভাইস ও ব্লুটুথ ডিভাইসের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস ও উত্তর ত্বরিত শুনে বৃত্ত ভরাট করতো শিক্ষার্থীরা।

সিআইডির পরিদর্শক আওরঙ্গজেব জাগো নিউজকে বলেন, চক্রটি এবার ঢাবিতে তিনজন, জগন্নাথে চারজন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারজনসহ ১২ ছাত্রকে অবৈধভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করিয়েছে।

গত বছর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় ও ই ইউনিটে দুই ছাত্রকে ভর্তি করাতে সফল হয় চক্রটি, যারা এখন প্রথম বর্ষ শেষ করে দ্বিতীয় বর্ষে। জালিয়াতির জন্য সর্বোচ্চ সাড়ে তিন লাখ থেকে শুরু করে আশি হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়েছে তারা।

সিআইডির ডিআইজি (ফরেনসিক) রওশন আরা বেগম জাগো নিউজকে জানান, পরীক্ষার হল থেকে প্রশ্নপত্র জালিয়াত চক্রটির সঙ্গে যেসব শিক্ষার্থীর অভিভাবক ও শিক্ষকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের ব্যাপারে তথ্য পেয়েছি। শিক্ষকের সংশ্লিষ্টতা এখনো পাইনি।

– জাগোনিউজ

Top