জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ: জুমার খুতবার আগে বক্তব্য দিচ্ছেন ওসিরা

dk.jpg

লুকিয়ে থাকা জঙ্গিদের অবস্থান জানতে এবং জঙ্গিরা যাতে রাজধানীতে আস্তানা গড়ে তুলতে না পারে সেজন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এরইমধ্যে ডিএমপি’র থানাগুলোর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ (ওসি) জুমার দিনে মসজিদে মসজিদে গিয়ে খুতবার আগে বাড়িওয়ালাদের উদ্দেশ্যে সতর্কতা ও সচেতনতামুলক বক্তব্য দিচ্ছেন। বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে কারা থাকছেন এবং তারা কী করেন সেই তথ্য যেন অতিসত্ত্বর থানা পুলিশকে দেওয়া হয় সেব্যাপারে বাড়িওয়াদের সতর্ক করা হচ্ছে।  পুলিশকে জানানো না হলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য বাড়িওয়ালাকেই দায়ী থাকতে হবে বলেও সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, রাজধানীর বিভিন্নস্থানে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়ার পর দেখা যায়, জঙ্গিরা ছদ্ম পরিচয়ে বিভিন্ন বাসা-বাড়ি ও মেসে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকছে। গড়ে তুলছে জঙ্গি আস্তানা। নাশকতা শেষে পালিয়ে গেলে তাদের আর কোনও হদিস পাওয়া যায় না। বাড়িওয়ালারাও ওইসব ভাড়াটিয়া সম্পর্কে কোনও তথ্য দিতে পারছেন না।

জঙ্গিবাদসহ মহানগরীতে অপরাধ দমনে প্রথমে ২০১৩ সালের শুরুর দিকে রাজধানীর ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালাদের তথ্য সংগ্রহে নেমেছিল ডিএমপি। মাঝপথে সেটা অনেকটা বন্ধই হয়ে যায়। গত বছরের শেষের দিকে আবারও এ প্রক্রিয়া শুরু করে ডিএমপি। বর্তমানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ কাজটি করছেন মহানগরীর বিভিন্ন থানা পুলিশ।

মোহাম্মদপুর থানার ওসি জামাল উদ্দিন মীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রাজধানীতে বসবাসকারী প্রত্যেক ভাড়াটিয়াকে একটি করে আইডি নম্বর দেওয়া হবে। ওই ভাড়াটিয়া বাসা বদল করে যেখানেই যাবেন, ওই আইডি নম্বর দিয়ে তাকে খুঁজে বের করা সম্ভব হবে। তার সব তথ্যও পাওয়া যাবে এই আইডি নম্বর ধরে। আর বাড়িওয়ালার কাজ হবে নতুন ভাড়াটিয়ার তথ্য থানাকে অবহিত করা।

গত ১১ নভেম্বর মোহাম্মদপুরের মিনার মসজিদে জুমার খুতবার আগে দেওয়া বক্তব্যে ওসি জামাল উদ্দিন বাড়িওয়ালাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি যেগুলো বলবো সেগুলো মানলে ভালো থাকবেন, স্বাচ্ছন্দবোধ করবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাফল্যের সঙ্গে পুলিশ জঙ্গি দমনে এগিয়ে যাচ্ছে। তারপরও ১৬ কোটি মানুষের এ দেশের আনাচে কানাচে কে কোথায় কীভাবে উগ্রবাদ ও জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়ে যাচ্ছে, তার সব তথ্য আমরা পাচ্ছি না। পাশের ফ্ল্যাটে কী হচ্ছে সেই খবরও আমরা রাখছি না। প্রত্যেকের উচিত পাশের ফ্ল্যাটে কী হচ্ছে নজরদারি করা।’

বাড়িওয়ালাদের উদ্দেশে ওসি জামাল উদ্দিন আরও বলেন, ‘ভাড়াটিয়ার তথ্য নিয়ে ডাটাবেজ তৈরি করা হবে। ভবিষ্যতে এ জন্য আপনাদের অনেক দৌড়দৌড়ি করতে হবে। কোনও বাড়িতে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনও ঘটনা ঘটে গেলে তখন বাড়িওয়ালাদের একচুলও ক্ষমা করা হবে না।’.ভাড়াটিয়াদের তথ্য ফরম

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি আবদুর রশিদ জানান, তিনি তার এলাকার বিভিন্ন মসজিদে জুমার দিনে ভাড়াটিয়াদের তথ্য থানায় দিতে অনুরোধ জানাচ্ছেন। একইসঙ্গে তার থানা এলাকার আটটি বিট পুলিশের কর্মকর্তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফরম দিয়ে আসছেন। ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ করছেন। আগামী দুই মাসের মধ্যে তার এলাকার সব ভাড়াটিয়ার তথ্য সংগ্রহ শেষ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তিনি। তবে নতুন ভাড়াটিয়া আসলে যাতে থানাকে অবহিত করা হয় সেজন্য বাড়িওয়ালাদের বলে দেওয়া হচ্ছে।

রাজধানীর কোতোয়ালি থানার ওসি আবুল হাসানও জানান একই কথা। তিনি বলেন, তিনি যখনই সুযোগ পাচ্ছেন তখনই জুমার দিনে মসজিদে গিয়ে এলাকাবাসীকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে অনুরোধ জানাচ্ছেন। ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহে কাজ করছেন তার থানার পুলিশ কর্মকর্তারা।

রমনা জোনের উপ কমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তার প্রশাসনিক এলাকায় ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ চলছে গুরুত্বের সঙ্গে। তবে এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।

এরআগে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এক সংবাদ সম্মেলনে নগরবাসীর উদ্দেশে বলেন, বাড়িতে নতুন ভাড়াটিয়া আসলে বা পুরনো ভাড়াটিয়া চলে গেলে বাড়িওয়ালা সেই তথ্য অবশ্যই পুলিশকে জানাবেন। ভাড়াটিয়া কেমন আসবাবপত্র নিয়ে বাসায় উঠছেন তাও খেয়াল রাখতে হবে বাড়িওয়ালাকে। সন্দেহ হলে পুলিশকে জানাতে হবে। তিনি বলেন, ‘সিআরপিসি’র ৪২ ধারা অনুযায়ী পুলিশকে সহায়তা করতে প্রতিটি নাগরিক বাধ্য। তারা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হলেও তথ্য ফরম পূরণ করে পুলিশকে সহায়তা করবেন। কেউ ভুল তথ্য দিয়েছে এমন তথ্য পেলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম অনুযায়ী, বাসার বিবরণ ও ঠিকানা, পরিবার প্রধানের নাম ও স্থায়ী ঠিকানা (টেলিফোন নম্বরসহ), জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম্বার, পরিবারের অন্য সদস্যদের নাম ও পরিবার প্রধানের সঙ্গে সম্পর্ক, বর্তমান আবাসনে আসার তারিখ এবং সদ্য ছেড়ে আসা আবাসনের ঠিকানা (আবাসন মালিকের ফোন নম্বরসহ), পরিবার প্রধানের পেশা ও বর্তমান কর্মক্ষেত্রের ঠিকানা (টেলিফোন নম্বর যদি থাকে), ভাড়াটিয়া পরিবার প্রধানকে শনাক্তকারী দুই ব্যক্তির নাম ও ঠিকানা (ফোন নম্বরসহ) ও ভাড়াটিয়া পরিবার প্রধানদের পূর্ণস্বাক্ষর দিতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন 

Top