চট্টগ্রামে এগারো মাসে ৭৯ খুন

Khon_sm_607672305.jpg

তাজুল ইসলাম পলাশ, চট্টগ্রাম
পুলিশের পক্ষ থেকে নগরীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলা হলেও বাস্তবে অপরাধ কমছেই না। চলতি বছর শুরু থেকে এই পর্যন্ত নগরীতে ৭৯ টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। গত ২৪ ঘন্টায় হালিশহর ও আগ্রাবাদে আরো দুটি খুনের ঘটনা ঘটে। এর পাশাপাশি ধর্ষণসহ নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ২৭৯টি।

অপরাধের এমন পরিসংখ্যান চিত্রে সাধারণ নাগরিকেরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এ ধরনের ভয়ানক অপরাধ বাড়লেও মামলা তদন্তে ধীরগতি এবং আসামী গ্রেফতার না হওয়ায় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে অপরাধীরা।

পুলিশ জানিয়েছে, রাজনৈতিক বিরোধ, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, ভূমি বিরোধ, পারিবারিক কলহ ও পূর্বশত্রুতার কারণে খুনোখুনির ঘটনা বাড়ছে।

পারিবারিক কলহ ও পূর্বশত্রুতার জেরে সংঘটিত হত্যাকা-গুলোতে আসামীরা ধরা পড়লেও ছিনতাই,

ডাকাতিসহ বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনায় আসামীরা সহজে ধরা পড়ছে না।

আর বেওয়ারিশ হিসাবে যাদের লাশ পাওয়া যাচ্ছে তাদের খুনের রহস্য উদঘাটনেও পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। লাশের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় অনেক মামলার রহস্য উদঘাটন হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তারা।

পুলিশ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে ২০ নবেম্বর পর্যন্ত এগারো মাসে অন্তত ৭৯ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে অক্টোবরেই ১০ জনের মতো খুন হয়।

এসব খুনের ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে পরকীয়া, অনৈতিক সম্পর্ক, পারিবারিক ও ব্যবসা বিরোধ এবং মাদকাসক্তি। ছিনতাইকারীদের হাতেও একাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে।

এরমধ্যে নগরীর খুলশী থানার আমবাগান ও পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালের সামনের সড়কে ছিনতাইকারীদের হাতে দুই ব্যক্তির নির্মম খুনের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশ ৬ জনকে গ্রেফতার করে। তাদের মধ্যে তিনজন খুনের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। এই চক্রের হাতে এর আগেও নগরীতে একাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে।

পারিবারিক কলহের মধ্যে গেল মাসে নগরীর দক্ষিণ হালিশহরে স্বামীর হাতে খুন হন আয়েশা মনি। খবর পেয়ে ইপিজেড থানা পুলিশ ওই এলাকার কলোনীর একটি ভাড়া বাসা থেকে সেই গৃহবধুর লাশ উদ্ধার করে।

এর আগে গত ৫ অক্টোবর রাতে স্বামীকে খুন করে সীতাকু- থানায় হাজির হন খাদিজা বেগম নামে এক নারী।

তিনি অভিযোগ করেন, তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম একজন মাদকাসক্ত। নেশার টাকার জন্য প্রতিদিন তাকে মারধর করে। আর এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ঘুমন্ত স্বামীকে সে শিলপাটা দিয়ে নির্মমভাবে আঘাত করে হত্যা করেন।

নগরীর টেরিবাজারে ভগ্নিপতিকে কুপিয়ে হত্যা করে সেচ্ছায় থানায় হাজির হন শ্যালক। বাবলু ধর নামে ওই যুবক স্বীকার করেন ভগ্নিপতি স্বর্ণের কারিগর অঞ্জন ধর তার বোনকে নির্যাতন করায় সে এই খুনের ঘটনা ঘটান। তবে এ খুনের দু’দিন পর নিহতের মা চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে খুনের জন্য পুত্রবধুকে দায়ী করেন।

নগরীর চান্দগাঁও থানায় নিজের পরকীয়া সম্পর্ককে চাপা দিতে স্ত্রীকে হত্যা করে রিদুয়ানুল কাদের হৃদয় নামে এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা।

১৯ অক্টোবর নগরীর ডবলমুরিং থানার পাহাড়তলী বাজারের কাছে রেলওয়ে স্টাফ কোয়ার্টারের একটি বাসা থেকে রোজিনা খাতুন নামে এক যুবতীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রেমঘটিত কারণ থেকে এই খুনের ঘটনা ঘটে।

১১ অক্টোবর নগরীর কোতোয়ালী থানার কাটাপাহাড় এলাকা থেকে মরিয়ম বেগম (৩৫) নামে এক নারীকে পাথর ছুড়ে হত্যা করে তার স্বামী রুবেল হোসেন (৩২)।

৬ অক্টোবর নগরীর আগ্রাবাদে মৌলভী পাড়ায় স্ত্রী সোহেনা বেগমকে খুন করে পালিয়ে যান স্বামী সজীব আহমেদ।

একই মাসে নগরীর গোসাইলডাঙ্গা এলাকায় মাকে খুন করে পরে ছুরি দিয়ে নিজের গলা কেটে আত্মহত্যার চেষ্টা করে মাদকাসক্ত ছেলে। এর আগে হাটহাজারীতে পুত্রের হাতে খুন হন জন্মদাতা পিতা। তার আগে চান্দগাঁও এলাকায় মাকে খুন করে এক পুত্র।

সর্বশেষ গত ১৮ নবেম্বর পরকীয়া সম্পর্কের জেরে নগরীর হালিশহরের খুন হন আব্দুল বাতেন ওরফে খোকন। পুলিশ জানিয়েছে, খোকনের স্ত্রী ও তার বন্ধু এই খুনের ঘটনায় জড়িত।

এই ঘটনার একদিন পর ২০ নভেম্বর রোববার সকালে নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন ব্যাপারি পাড়ার মোড় থেকে জালাল উদ্দিন সুলতান নামে এক ব্যবসায়ীর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করেন পুলিশ। নিহত ব্যক্তি আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা।

নিহত ব্যক্তির লাশ সনাক্ত হয়েছে কিন্তু এই খুনের রহস্য এখনো উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন ডবলমুরিং থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম মহিউদ্দিন সেলিম।

এদিকে খুনের পাশাপাশি মহানগরীতে ধর্ষণসহ নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত নগরীর ১৬টি থানায় এ ধরনের ২৭৯টি ঘটনা রের্কড হয়েছে।

গত বছর চট্টগ্রাম মহানগরীতে খুন হয়েছে ১০৫ জন এবং ধর্ষণসহ নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩৫৭টি।

এছাড়া ২০১৪ সালে চট্টগ্রামে খুন হয়েছেন ৭৬ ব্যক্তি। এদের অর্ধেকই নিহত হয়েছেন রাজনৈতিক সহিংসতায়।

গত মাসে এক সভায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার চট্টগ্রামের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন। এ সময় নগরীর আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কার্যক্রমে অবদানের জন্য ৬৫ জন পুলিশ সদস্য ও সিভিল স্টাফদেরকে নগদ অর্থ ও সম্মামনা প্রদান করেন।

Top