চকরিয়ায় ফলন বিপর্যয়: দিশাহারা কৃষক

Chakaria-Picture-29-11-16.jpg

এম.জিয়াবুল হক, চকরিয়া:
চকরিয়া পৌরসভার ২নম্বর ওয়ার্ডের মাতামুহুরী নদীর উপকন্ঠে জমিতে কৃষক মোহাম্মদ ইব্রাহিম এবার সাড়ে তিন কানি জমিতে বেগুন ও দেড় কানি জমিতে মরিচ চাষ করেছেন। সুপার এগ্রো কোম্পানীর গ্রীণবল, গ্রীণবয় জাতের হাইব্রিট বেগুন বীজ রোপন করেছিলেন জমিতে। পাশাাশি একই কোম্পানীর ১৭০১ জাতের মরিচ বীজ রোপন করেন। এ পর্যন্ত তার যা খরচ পড়েছে বেগুন ও মরিচ বিক্রি করে তা উঠানো সম্ভব হচ্ছেনা। কৃষক ইব্রাহিম অভিযোগ করেছেন, চলতি মৌসুমে ফলন বিপর্যয়ের কারনে তার প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতিসাধন হয়েছে।

ইব্রাহিমের মতো একই বিলে কৃষক মোহাম্মদ ইসলাম চাষ করেছেন ৩ কানি বেগুন ও ৩ কানি মরিচ, ফজল করিম সাড়ে তিন কানি বেগুন ও দেড় কানি মরিচ, টমেটো, জহির আহমদ এক কানি জমিতে বেগুন ও তিন কানি জমিতে মরিচ, মিজানুর রহমান ৩ কানি বেগুন ও ২কানি মরিচ, মোক্তার আহমদ এক কানি জমিতে বেগুন ও মরিচ, ছরওয়ার আলম ৩ কানি জমিতে বেগুন, মরিচ ও টমেটো, জিয়াবুল করিম ২ কানি জমিতে বেগুন ও এক কানি জমিতে মরিচ, জামাল উদ্দিন তিন কানি জমিতে বেগুন ও মরিচ, নাছির উদ্দিন এক কানি জমিতে বেগুন ও মরিচ, জাহাংগীর আলম ২ কানি জমিতে বেগুন ও এক কানি জমিতে মরিচ, ইউনুছ দুই কানি জমিতে বেগুন ও মরিচ, নুরশেদ ২ কানি জমিতে বেগুন ও মরিচ। এছাড়াও একই বিলে রোস্তম আলী, বাবলু, বেলাল উদ্দিন, মনছুর আলমসহ অন্তত শতাধিক কৃষক প্রতিবছরের মতো এবারও বেশির ভাগ জমিতে চাষ করেছেন বেগুন ও মরিচের।

চলতি মৌসুমে সবজি চাষে চরম ফলন বিপর্যয়ে কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন উপজেলার অন্তত শতাধিক চাষী। ইতোমধ্যে উপজেলার সবজি চাষে ফলন বিপর্যয়ের বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে সরকারের কৃষি মস্ত্রানালয় ঘটনাটি তদন্তে কক্সবাজার জেলা কৃষি বিভাগকে নির্দেশ দেন। এরই প্রেক্ষিতে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শনিবার সকালে তদন্ত কমিটির তিন সদস্য চকরিয়া উপজেলার ক্ষতিগ্রস্থ সবজি ক্ষেত পরিদর্শন করে ফলন বির্পযয়ের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। ওইসময় তদন্ত কমিটি স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের সাথে কথা বলে তাদের বক্তব্য নোট করেছেন। পাশাপাশি কৃষকদের কাছ থেকে বীজের প্যাকেট ও অভিযুক্ত দোকান থেকে নমুনা বীজ সংগ্রহ করেছেন। তদন্ত দলে ছিলেন কক্সবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আ.স. ম শাহরিয়ার, জেলা বীজ প্রত্যায়ন কর্মকর্তা আবদুল জলিল মন্ডল ও জেলা বিএডিসির উপ-পরিচালক (বীজ বিপনন) নির্মল কান্তি চাকমা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আ.স.ম শাহরিয়ার বলেন, চকরিয়া উপজেলার ভেজাল বীজ রোপনের কারনে ফলন বিপর্যয়ের ঘটনাটি গণমাধ্যমে আসার পর কৃষি মন্ত্রানালয় বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। সেই আলোকে শনিবার সকালে চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সবজি ক্ষেত পরির্দশন করা হয়েছে। এসময় উপস্থিত কৃষকরা ভেজাল বীজের কারনে ফলন বিপর্যয় ঘটেছে বলে অভিযোগ তুলেন। ক্ষেতের বেগুন ও মরিচ আবাদ দেখে ফলন বিপর্যয়ের নমুনা মিলেছে। তিনি বলেন, পরির্দশনকালে কৃষকরদের কাছ থেকে কিছু ব্যবহৃত বীজের নমুনা প্যাকেট ও অভিযুক্ত দোকানদারদের কাছ থেকে নমুনা বীজ সংগ্রহ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বীজ গুলো পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ল্যাবরেটরির রির্পোটের ভিত্তিতে আমি মন্ত্রানালয়ের বেঁেধ দেয়া সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠিয়ে দেব। আশা করি প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের স্বার্থ নিশ্চিত করা হবে।

চকরিয়া পৌরসভার ২নম্বর ওয়ার্ডের হালকাকারা গ্রামের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, উপজেলা সদরের ওসমান গণি নামের একব্যক্তির মালিকানাধীন সুপার এগ্রো সীট দোকান থেকে আমিসহ এলাকার অন্তত শতাধিক কৃষক চলতি মৌসুমে গ্রীনবয় ও গ্রীনবল জাতের বেগুন বীজ ক্রয় করি। এসব বীজ জমিতে রোপন করে আমরা ফলন বিপর্যয়ের সুম্মুখীন হই। তিনি বলেন, আমরা বেশির ভাগ কৃষক লেখাপড়া জানিনা। দোকানদারের কথায় সরল বিশ^াসে এসব বীজ ক্রয় করেছি। পরে ক্ষেতের ফসল বির্পযয় ও ফলনকৃত বেগুন আকারে ছোট হওয়ায় ধারণা করি আমাদেরকে বিক্রি করা বীজ ছিল ভেজাল।

অপরদিকে স্থানীয় কৃষক ইসলামসহ অনেকে দাবি করেন, বেগুন বীজের পাশাপাশি পৌরসভার সোসাইটি মসজিদ মার্কেটের শফিকুল ইসলামে মালিকানাধীন চকরিয়া বীজ ঘর এবং ডিজিটাল বীজ ঘর থেকে অঙ্গারিকা নামের মরিচের বীজ ক্রয় করে জমিতে রোপন করি। এ দোকানদার চকরিয়ায় অঙ্গারিকা বীজটি এককভাবে বাজারজাত করেন। জমিতে রোপনের পর দেখি ফলন তো দুরের কথা বেশির ভাগ ক্ষেতের মরিচ গাছ মরে শুকিয়ে গেছে।

এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা কক্সবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক, চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান, চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক মোহাম্মদ ইব্রাহিম। একই সাথে কৃষকরা ভেজাল বীজ বিক্রির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন পুর্বক তাদের ক্ষতিপুরণের ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য প্রশাসনের কাছে হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

Top