কওমী মাদ্রাসা সনদের সরকারী স্বীকৃতিঃ দাবী ও বাস্তবতা

Hilali.jpg

-আ.হ.ম. নূরুল কবির হিলালী
বাংলাদেশে শিক্ষার প্রসারঃ
বর্তমানে উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশে শিক্ষা- সংস্কৃতি ও সভ্যতার যে বিচ্ছুরণ ও বিকিরণ ঘটেছে এর পাদমূলে রয়েছে তদানিন্তন মুসলিম শাসক পরিভাজক ও ইলমে-নববীর ধারক-বাহক কওমী মাদ্রাসা শিক্ষিত ওলামায়েকেরামের অনবদ্য অবদান। কওমী ওলামায়েকেরামের সাহিত্যনুরাগ, শিক্ষা পিপাসু মন ও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে জনকল্যাণের অপার আগ্রহ প্রমাণ করে নৈতিকতাসমৃদ্ধ- খোদাভীতিসম্পন্ন শিক্ষার মাধ্যমেই দক্ষ, সুশীল সালেহীন সৎকর্মনিষ্ঠ ও দেশপ্রেমিক আর্দশ নাগরিক গড়ে তোলা সম্ভব। ইসলামের সাথে গোড়ামী, কুসংস্কার ও সংকীর্ণতার সম্পর্ক বিপরীতমূখী। এ কথাটি তাদের মন মগজে প্রোথিত করা হয়।

ইমলে নববীর ধারক-বাহক এদেশের ইসলামী ঐতিহ্যের সুপ্রাচীন শিক্ষা ব্যবস্থা কাওমী মাদ্রাসা শিক্ষাধারা সম্পর্কে নবপ্রজন্মের অনেকে কোন ধারণাই রাখেন না। অল্প-বিস্তর যাদের মোটামুটি ধারণা রয়েছে তাও সত্যসিদ্ধ বস্তুনিষ্ঠ, তত্ত্ব-উপাত্ত্ব ও তথ্যসমৃদ্ধ নয়। ফলে অনেকে কওমী মাদ্রাসা শিক্ষাকে অবজ্ঞা পূর্বক ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতি-সভ্যতা বিস্তারে এবং রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে এ শিক্ষা ব্যবস্থার গৌরবদ্বীপ্ত অতীত ও সমোজ্জ্বল বর্তমান এবং আশাব্যঞ্জক ভবিষ্যৎকে অস্বীকার করে এর বিরুদ্ধে নানা অলিক কল্প-কাহিনী রটিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্তির জালে ফাঁসানোর অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। শত শত বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত এ শিক্ষা ব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত তুলে ধরা প্রয়োজনবোধ করছি।

ঐতিহাসিকরা রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী (কওমী) মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে পাঁচ পিরিয়ডে ভাগ করে থাকেন। যথা-
(১) খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর সুচনা কাল থেকে ১১৯৭ খ্রিষ্টাব্দ (চারশত বছরাধিক)।
(২) ১১৯৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দ (৫৬৮ বছর)।
(৩) ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দ দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত (১০১ বছর)।
(৪) ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত (৮১ বছর)।
(৫) ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে চলমান (৫৮ বছর)।

কওমী মাদ্রাসার ইতিহাসঃ
কওমী মাদ্রাসা বলতে ঐ সকল দ্বীনি শিক্ষাগার কে বুঝায় যেগুলো মহান রাব্বুল আলমীনের উপর তাওয়াক্কুলকে সম্বল করে এদেশের দ্বীনপ্রিয় জনগনের সাহয্য- সহযোগিতায় পরিচালিত হয় এবং যেখানে এত নিখুঁত উচ্চমানের পাঠ্যতালিকা অনুসৃত হয় যা কোরআন-হাদীসের জ্ঞান ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের উজ্জ্বল মাতাদর্শে পরিপুষ্ট।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, বাংলাদেশে সাহাবীদের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম ইসলামের প্রবেশ ঘটে এবং তাঁরাই সর্বত্র এদেশে দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। কিন্তু ত্রয়োদশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত এদেশে প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক শিক্ষার কোন ব্যবস্থা ছিল না বরং ব্যক্তিগত এবং বিক্ষিপ্ত ভাবে দ্বীনি শিক্ষা চালু ছিল। সে যুগেও মসজিদ গুলোতে দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু যুগের চাহিদানুযায়ী ক্রম বর্ধমান বহুবিধ দ্বীনি সমস্যা সমুহের সমাধান এবং দেশের সর্বত্র ইসলামী শিক্ষার ব্যাপক বি¯তৃতির লক্ষ্যে প্রয়োজন ছিল এমন স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের। এমহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ স্বরূপ আল্লামা তকিউদ্দীন আরবী রাজশাহীর মহিসন্তেষে ত্রয়োদশ শতকের প্রথমার্ধে একটি কওমী মাদ্রাসা স্থাপন করেন। ঐতিহাসিকদের মতে এটাই ছিল বাংলাদেশের সর্বপ্রথম ইসলামী শিক্ষায়তন। শাহ শোয়াইব লিখিত “মানাকিবুল আসফিয়া” গ্রন্থ থেকে জানাযায় যে, ইতিহাস প্রসিদ্ধ সূফি ও লেখক আল্লামা শায়খ শরফুদ্দীন ইয়াহিয়া মানেরীর পিতা, শায়খ ইয়াহইয়া মনরী বিহার থেকে এসে এ মাদ্রাসায় শিক্ষা লাভ করেন। এতে বলা চলে যে, এদেশে কওমী মাদ্রাসার সূত্র ধরেই ইসলামী শিক্ষায়তনের আবির্ভাব ঘটে।

এ সম্পর্কে ১৮৮২ সালে শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে আলোকপাত করা হয়েছে। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমল পর্যন্ত ইসলাম প্রিয় জনসাধারণই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর ব্যয় ভার বহন করতো। ১২৭৮ খ্রিষ্টাব্দে মতান্তরে ১২৭০ খ্রিষ্টাব্দে আল্লামা শায়খ শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ বাংলার তৎকালীন রাজধানী সোনারগাঁওয়ে গমন করেন। তিনি তথায় একটি উন্নত মানের মাদ্রাসা স্থাপন করেন। তত্ত্বানুসারে শায়খ আবু তাওয়ামাকে বাংলাদেশে কওমী মাদ্রাসা শিক্ষার পথিকৃৎ বলা যেতে পারে। এর পর বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষতঃ রাজশাহী, বগুড়া, সিলেট ও চট্টগ্রামে বহু কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

ইসলাম খানের আমলে দেশের রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের পর ঢাকাতেও বহু মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যেমন খান মুহাম্মদ মীরদাহ মসজিদে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা (১১১৬ হিজরী) এবং আজিমপুর (১২৬০ হিজরী) ভাঙ্গা গড়ার মধ্যদিয়ে ত্রয়োদশ শতক থেকে আরম্ভ করে ইংরেজদের ক্ষমতা দখল পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বত্র পর্যায়ক্রমে বহু কওমী মাদ্রাসা দ্বীনি শিক্ষার আলো বিকিরণ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে। ইতিহাসে দেখা যায় যে, ইংরেজদের ক্ষমতা দখলের সময় এ উপমহাদেশে ৮০ হাজার অধিক কওমি মাদ্রাসা চালু ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ ইংরেজদের অনুপ্রবেশের পর দেশ থেকে ইসলামী তাহযীব ও তামাদ্দুন চিরতরে বিদায় দেয়ার জন্যে মারাত্মক ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ফলে দ্বীনি প্রতিষ্ঠান গুলো একের পর এক বিলুপ্ত হতে থাকে। তখন দেশের আলেম সমাজ বিশেষতঃ আকাবিরে দেওবন্দ দেশে জনসাধারণের মধ্যে আত্মচেতনা, তাহযীব-তামাদ্দুন এবং দ্বীনি শিক্ষার কার্যক্রম পুনর্বহালের লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রয়াস অব্যাহত রাখেন। এরই ধারাবাহিকতায় ভারতের ইউ, পি, তে রাব্বুল আলামীনের পরম করুণাস্বরূপ ১৮৬৬ ইং সনে স্থাপিত হয় দারুল উলুম দেওবন্দ।

কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যাবস্থা দ্বীনের ঐতিহ্যবাহী খালেছ ও গৌরবদ্বীপ্ত ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা। বৃটিশ খেদাও আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ভারতীয় মুসলমানদের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বিশ্বস্থ খোদাভীরু ব্যক্তিত্ব, অসাধারণ প্রতিভাধর মুসলিম মিল্লাতের চিন্তানায়ক আল্লামা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুভী রহ. এর ঐকান্তিক সাধনা ও ত্যাগ তিতিক্ষার নজরানার ফল ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম দেওবন্দ। ভারতের উত্তর প্রদেশস্থ সাহারানপুর জেলাধীন দেওবন্দে অবস্থিত ইন্ডিয়ার জামিউল আজহার নামে খ্যাত বিশ্ববিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে দরশে নেজামী চালু রাখার প্রত্যয়ে সাধারণ মুসলিম জনতার অকুণ্ঠ সমর্থন ও অর্থানুকুল্যে এক স্বতন্ত্র ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রর্বতিত হয়। এরই পথ অনুসরণ করে এদেশেও পুনরায় কওমী মাদ্রাসা গড়ে তোলার প্রানান্তকর প্রয়াস শুরু হয়। ফলশ্র“তিতে ১৮৮৯ ইং সনে দারুল উলুম কানইঘাট সিলেট, ১৯০১ ইং সনে দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটাহাজারী চট্টগ্রাম, ১৯১০ ইং সনে জামেয়া আরবিয়া জিরি ও কুমিল্লায় দারুল উলুম বড়–রা, আনুমানিক ১৯১৮ ইং সনে ইসলামিয়া মাদ্রাসা ঢাকা, ১৯২৬ সনে বাবুনগর, ১৯২৮ সনে আশরাফুল উলুম বালিয়া মোমেনশাহি, ১৯৩১ সনে হোসাইনিয়া রানপিং, ১৯৩৭ সনে দারুল উলুম গওহরডাঙ্গা ফরিদপুর, ১৯৩৮ সনে জামেয়া ইসলামিয়া পটিয়াসহ দেশের রাজধানী ও বিভিন্ন জেলায় আরও বহু উন্নত মানের মাদ্রাসা গড়ে উঠে। তাই এই যুগকে কওমী মাদ্রাসা শিক্ষার রেনেসাঁর যুগ হিসাবে আখ্যাঁয়িত করা যায়।

কওমী মাদ্রাসা শিক্ষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিঃ
দ্বীনের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাধারায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জনপদে প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপিত হাজার হাজার কওমী মাদ্রাসা আবহমান কাল ধরে কুরআন-হাদীস ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার মাধ্যমে ইলমে দ্বীনের মশালকে প্রজ্জ্বলিত ও অণির্বান রেখেছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২০০৫ সালের জরিপ অনুযায়ী স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে ছোট বড় নুরানী ও মক্তবসহ প্রায় লাখ খানেক কওমী মাদ্রাসা বিদ্যমান। এর মধ্যে জামিয়া আহলিয়া মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া, জামিয়া দারুল মা- আরিফ আল ইসলামিয়া চট্টগ্রাম, জামিয়া কুরআনিয়া

লালবাগ ঢাকা, জামিয়া এমদাদিয়া কিশোরগঞ্জ, জামিয়া শারিয়াহ মালিবাগসহ মাঝারী, বড় ও বিশ্ববিদ্যালয় মানের মাদ্রাসা রয়েছে ১১ হাজার। ড.ড হান্টারের রিপোর্ট অনুযায়ী ১৭৫৭ সালে পূর্বে ৮০ হাজারের উপরে কওমী মাদ্রাসায় ছাত্র অধ্যয়ন করত। এ সমস্ত খালেচ দ্বীনি প্রতষ্ঠান থেকে বিজ্ঞ আলিম, মুহাদ্দিস, মুফতি, মুনাজির তথা মহান আল্লাহর পথে দাওয়াত দানকারীদের এক উল্লেখযোগ্য বিশাল জামাত প্রতিনিয়ত বের হচ্ছেন। কিন্তু কওমী মাদ্রাসা সমূহ থেকে পাশ করা ছাত্রদের দাওরায়ে হাদীসের সনদের রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতি ও মান নেই। একটি স্বাধীন দেশের জন্য এটা শুধু পরিতাপের বিষয় নয়, লজ্জাজনকও বটে। বেফাকুল মাদারিস ও ইত্তেহাদুল মাদারিস কর্তৃক প্রদত্ত দাওয়ায়ে হাদীসের সনদের রাষ্ট্রিয় স্বীকৃতি না থাকার কারণে এক দিকে লাখ লাখ ইলমে নববীর ধারক-বাহক দ্বীনি ছাত্রদের মেধা ও প্রতিভার অবমূল্যায়ন হচ্ছে, অন্য দিকে মেধা অপচয় ও পাচার হয়ে যাচ্ছে। সাথে সাথে জাতিও প্রতারিত হচ্ছে। দেশ ও জাতির সার্বিক উন্নয়ন ও অত্রযাত্রায় কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও প্রাশাসন, বিচার, শিক্ষা, প্রতিরক্ষাসহ প্রতি সেক্টরের দ্বার কওমী মাদ্রাসা পড়–য়াদের জন্য আজ রুদ্ধ, অর্গল যুক্ত। অত্যন্ত সুকৌশলে এদেরকে যবনিকার অন্তরালে রাখা হয়েছে। অনেকে হয়তো মনে করতে পারেন যে, শিক্ষার ক্ষেত্রে ডিগ্রী ও সনদ মূল বিবেচ্য বিষয় নয়, জ্ঞানই বিবেচ্য। এ বক্তব্য সন্দেহাতীত ভাবে সত্য। তবে এ সত্যকেও অস্বীকার করা যাবেনা যে, জ্ঞান তথা প্রতিভার অবমূল্যায়ন হলে নতুন সৃষ্টিধর্মী প্রতিভার জন্ম হয় না। বাজারে যে পদার্থ ও দ্রব্যের চাহিদা কম, তার উৎপাদন হ্রাস পেতে বাধ্য। বর্তমানে বস্তুবাদী শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিতরাই সমাজ ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর নিয়ন্তা ও চালিকা শাক্তি। একই দেশে পাশাপাশি দু’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের মধ্যে পর্বত প্রমাণ বৈষম্য বিদ্যমান। এক জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শাসক, বিচারক হচ্ছেন, অপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে হচ্ছেন শাসিত ও মগলুব। এদৃশ্য অসহ্য ও হৃদয়ে আঘাত হানার মত। যা মেনে নেওয়া যায় না।

বিভিন্ন দেশে কওমী সনদের স্বীকৃতিঃ
পাকিস্তানের ওলামায়ে কেরাম উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সাবেক মুখ্য মন্ত্রী বেফাকুল মাদারিসের সভাপতি মরহুম হযরত মাওলানা মুফতী মাহমুদ রহ. এর প্রানন্তকর প্রয়াস ও সংগ্রামের মাধ্যমে তাঁদের দাওরায়ে হাদীসের সনদের বিশ্ব বিদ্যালয়ের এম.এ. আরবী ও ইসলামিয়াতের সমমানের স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছেন।

পাঞ্জাবের গভর্নর ১৯৮৬ সালের ২০ মার্চ জারিকৃত এম ও (গণশিক্ষা) ৯-৮/৮৪ নম্বরের এক নোটিফিকেশনে ইসলামাবাদস্থ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের নোটিফিকেশনের নং ৪১৮/একা ৮৪/৬ ভুল্যম ৭/২২৭ তারিখ ০৩/০২/১৯৮৫ ইং উদ্ধৃতি সনদ দিয়ে ঘোষনা করেন যে, দ্বীনি মাদরাসা সমুহের বেসরকারী বোর্ড কর্তৃক প্রদত্ত দাওরায়ে হাদীসের শাহাদাতুল “আল-জামিয়া ফি উলুমিল আরাবিয়াহ্ ওয়াল ইসলামিয়াহ্” এম, এ আরবী ও ইসলামিয়াত বিষয়ে শিক্ষকতা ও উক্ত বিষয়দ্বয়ে উচ্চতর গবেষণা করার ক্ষেত্রে সমমান পাবে। শিক্ষকতা ছাড়া অন্য যে কোন বিভাগে চাকুরীর বেলায় উক্ত সনদধারীকে আরবী ও ইসলামিয়াত ছাড়া øাতক পর্যায়ে অতিরিক্ত যে কোন দুইটি বিষয়ে পাশ করতে হবে। ফলে পাকিস্তানী কওমী মাদ্রাসা পড়–য়া মেধাবী ছাত্র ভাইয়েরা উলুমুত-তাওহীদ, উলুমুল-কোরআন, উলুমুল-হাদীস, উলুমুল-কানুন ওয়াশ-শরীয়াহ্, উলুমুত-তারীখ আল-ইসলামিয়া ওয়াস সাকাফাহ প্রভৃতি বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার জন্য মক্কার উম্মুল কোরা বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রোর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামাবাদের আর্ন্তজাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদের ইমাম মুহাম্মদ বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিফলীর দাওয়াহ কলেজ ও কুয়ালালমপুরের আর্ন্তজাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ পাচ্ছেন। এ সুযোগ গ্রহণ করে পাকিস্তানের কওমী মাদ্রাসার ছাত্রগণ সেনা বাহিনী, প্রশাসন, বিচার ও শিক্ষা বিভাগের প্রতিনিধিত্ব করার ব্যাপক সৌভাগ্য লাভ করে প্রতিভার স্কুরণ ঘটাচ্ছে সবত্র। প্রক্ষান্তরে ভারতের বেসরকারী প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দের ফাজিল সনদ এবং লক্ষরোউর দারুল উলুম নদওয়ার আলমীয়ত সনদ ভারতের বিভিন্ন বিশ্ব বিদ্যালয়ের স্বীকৃত। উক্ত প্রতিষ্ঠান দ্বয় থেকে পাস করা ছাত্রগণ আলী গড় বিশ্ববিদ্যালয় এম এতে লক্ষেèৗ, কালিকট, এলাহাবাদ করাচী কাশ্মীর ওসমানীয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স অধ্যয়নের সুযোগ লাভ করছেন।

কওমী সনদের সরকারী স্বীকৃতি নাগরিক অধিকারঃ
বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক স্বীকৃতি আমাদের জন্মগত নাগরিক অধিকার। কোন হাদিয়া বা তোহফা নয়। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো সরকারী ভাবে অস্বীকৃত। প্রদত্ত সনদও অগ্রহনযোগ্য। যারা এ শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষা লাভ করেন তারা কি এদেশের নাগরিক নয়? যে কোন নাগরিকের শিক্ষা-দীক্ষাসহ সব নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন কি সরকারের দায়িত্ব নয়? স্বাধীনতার পরবর্তী সরকার গুলো কি কোন খবর নিয়েছেন, সরকারের কানা কড়ি ব্যয় বিনে সম্পূর্ণ জনগনের অর্থানুকুল্যে পরিচালিত এ শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষাপ্রাপ্তরা সরকারী স্বীকৃতি পাবার যোগ্য কি-না? প্রকৃতপক্ষে এরাই নির্ভেজাল খালেছ ইসলামী শিক্ষার ধারক-বাহক ও অকৃত্রিম দেশপ্রেমিক সু-নাগরিক। সরকারী ভাবে নিয়ন্ত্রনমূলক শর্ত জুড়ে দেয়া হলে কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা তার ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্য হারাবে। তা কিন্তু বাংলার তৌহিদী জনতার কাম্য নয়। তাবে হ্যাঁ সরকারী পৃষ্টপোষকতায় দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত দ্বীনদার বুদ্ধীজিবী, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞ আলমে দ্বীন, ওলমা-মাশায়েখে সমন্বয়ে নতুন ক্যারিকুলাম প্রণয়নের কার্যকারী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তা বিবেচ্য বিষয় হতে পারে। কওমী মাদ্রাসার মূল ক্যারিকুলাম “দরসে নেজামী” দারুল উলুম দেওবন্দ ও নদওয়াতুল উলুখ লৌক্ষèসহ পাক-ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত এবং পরিশীলিত সুষম হয়েছে। মৌলিক বিষয়াবলী বহাল রেখে ও অপ্রয়োজনীয় বিষয়াবলী বাদ দিয়ে ইসলামী চাহিদার ভিত্তিতে যুগ চাহিদার প্রেক্ষিতে বহু নতুন বিষয় সন্নিবেশিত করা হয়েছে। প্রয়োজনে কমিশন গঠনের মাধ্যমে আরও সুবিন্যস্ত সুষম করা যেতে পাবে। স্বতন্ত্র ভাবে বাংলাদেশ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড নামে একটি শিক্ষা বোর্ডও গঠন করা যেতে পারে। এ বোর্ডের অধীনে বিভিন্ন আঞ্চলিক বোর্ডের অধিভুক্ত শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন স্তরের পরীক্ষা নেয়া হবে। কওমী বলয়ের সাংগঠনিক অবকাঠামো চোখে পড়ার মত না হলেও তাদের রয়েছে এক বিশাল বেমেছাল জনশক্তি। আর এদের শিক্ষার মূল উৎস হচ্ছে এদেশের কওমী মাদ্রাসা সমূহ। কওমী মাদ্রাসা সমূহকে স্বীকৃতি দিয়ে সুবিধাজনক স্থানে একটি অ্যাফেলিয়েটিং ক্ষমতাসম্পন্ন স্বতন্ত্র কওমী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে মাদ্রাসা শিক্ষার উচ্চস্তরের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে দূর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত স্বচ্ছ, সুন্দর, চরিত্রবান সালেহীন সমৃদ্ধ জাতি গঠন করা সম্ভব।

এদেশের কওমী মাদ্রাসা গুলোয় উচ্চশিক্ষার দ্বার অবারিত করা এবং নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করার মাধ্যমে দেশে নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন, সুষম, দক্ষ মানব সম্পদ তৈরীর প্রচেষ্টায় সরকার এগিয়ে আসবে সেটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা এবং সময়ের দাবী।

ঘুরে দাড়াতে হবেঃ
শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রের আগ্রহ দক্ষ মানব শক্তির পূর্বর্শত। পৃথিবীর বহু সভ্যতার ভৌগলিক অবস্থাগত বিলুপ্তি হলেও মানবিক বা দার্শনিক সম্পদ অবিনাশী হয়ে আছে কেবলমাত্র শিক্ষা ও সংস্কৃতির কারণেই। মুসলমানদের আত্মশুদ্ধির সময় এসেছে। সময়টা অল্প, কিন্তু মূল্যবান। নিজের ভাগ্য নিজেকেই পরিবর্তন করতে হয়।

মানকুলাত এবং মাকুলাতরে সমন্বয়ে দ্বীনি শিক্ষা যত দিন অব্যাহত ছিল তত দিন পৃথিবীতে মুসলিম উম্মাহ্র স্থান ছিল সর্ব র্শীষে। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে রাসুল স. এর সময় থেকে পরবর্তী সহস্র বৎসর কাল জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় মুসলিম উম্মাহ্ এমন অপরাজয়ে উৎকর্ষ লাভ করেছিল এবং তা অব্যাহত গতিতে চলছিল তৎকালীন বিশ্বে নয়, আধুনিক প্রেক্ষাপটেও বিস্ময় ও সম্ভ্রম জাগিয়ে তোলে। হযরত উমর ফারুক রহ. সর্বশ্রেষ্ট

রাষ্ট্র নায়ক, খালিদ বিন ওয়ালিদ শ্রেষ্ট্রতম সমর কুশলী, তারিক বিন জিয়াদ, মুহাম্মদ বিন কাসিম ছিলেন দিগি¦জয়ী সিপাহসালার। হযরত আবু হানীফা রহ. শুধু মাত্র ইমামে আজম নন; তিনি ছিলেন সমসাময়িক বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম নগর পরিকল্পনাবিদ যার তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠে ছিল বাগদাদ নগরী।

মুসলিম উম্মাহ যদি আবার তার হৃত গৌরব ফিরে পেতে চায়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক গণমুখী ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা সময়ের দাবী। দ্বিতীয় আর কোন পথ নেই। আল্লামা ইকবাল বলেছেন “মুসলমান যদি নতুন করে সততা ইনসাফ হেকমত ও হিম্মতের সবক গ্রহণ করতে পারে, সে আবার সম্মানে পৃথিবীর নেতৃত্বে আসীন হবে। অতএব কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সকল প্রতিবন্ধকতা পরাভূত করে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রয়োগিক রূপ দান করতেই হবে।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ স. এর উম্মত এবং হযরত ওমর ফারুক র., সালাউদ্দীন জাবের ইবনে হাইয়ান, ইমাম গজ্জালী, ইবনে সিনা, ইবনে খলদুনের উত্তরসূরী হয়ে আমরা কতখানী সৃজনশীলতা দেখাতে পেরেছি? আমরা কি আতœবিস্মৃত নই? ইসলামী সভ্যতায় আমাদের অবদান কতটুকু? যুগের পরিবর্তন হয়েছে একথা আমাদের বুঝতে হবে। এযুগে কণ্ঠ, শৌর্য বীর্যের চেয়ে মেধা, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তি আর কুটনীতির সাফল্য বেশী। যুগের এই প্রগতিশীল পরিবর্তনের মাঝে নিজেকে উপযোগী করে তুলতে না পারলে হোঁচট খেতে হবে বারে বারে। যে দিন অর্থনীতি, প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রন মুসলমানদের হাতে আসবে সেদিন আর কোন বিশ্বাঘাতক থাকবে না। হবে না আর কোন অন্যায় সমর। সত্যকে অস্বীকার করার মতো গোঁড়ামি আর থাকবে না। দুঃখের অমানিশার পর রয়েছে সোনাগলানো রোদ মিশ্রিত ভোরের নিমন্ত্রন। এই স্বপ্ন নিয়েই মুয়াজ্জিনের আযানের সূরে সূরেই প্রতিদিন ঘুম ভাঙ্গে আমাদের। ৮০ দশকের গোড়াতে ইসলামী ছাত্রসমাজের উদ্যোগে সর্বপ্রথম কওমী মাদ্রাসা সনদের স্বীকৃতি এবং দাওরায়ে হাদীসের সনদকে এম, এ, এর সমমর্যাদা প্রদানের দাবীতে গুলশান বারিধরাস্থ চৌরাস্থায় অনুষ্ঠিত কওমী মাদ্রাসার জাতীয় সম্মেলনে ৩০ হাজার লিফলেট বিতরণ করা হয়। আজ সারা বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসার নওজোয়ান ছাত্ররা মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশ, সেমিনার-সেম্পোজিয়ামের মাধ্যমে সুশৃংঙ্খল নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় কওমী স্বকীয়তা অক্ষুন্ন রেখে সনদের স্বীকৃতির দাবীর পক্ষে জনমত সুসংগঠিত করার কাজ শুরু করেছে। কওমী সনদের স্বীকৃতি আমাদের ন্যায্য অধিকার; কারো করুণা নয়।

বস্তুবাদী ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির অধীনে পরিচালিত শিক্ষায়তন গুলোর জন্যে সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। অথচ বার্ষিক বাজেট বা পঞ্জবার্ষিকী পরিকল্পনায় কওমী মাদ্রাসার জন্য এক পয়সাও বরাদ্দ নেই। এ অবস্থায় আর চলতে দেয়া যায় না। এ অন্যায় বৈষম্যের প্রতিবাদ জানাতে হবে। এটা পুর্তগীজ জলদস্যুদের দেশ নয়; নয় লর্ভ কর্ণ ওয়ালিশের দেশ। ৯৩.৩% জন মুসলমানদের টেক্সে এদেশ চলে। আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার চাই। মনে রাখতে হবে, নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন ছাড়া অবস্থান সৃষ্টি হয় না। ইতিপূর্বেও কোন দাবী সংগ্রাম ছাড়া আদায় হয়নি। তাই কওমী মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে কওমী শিক্ষা ধারার স্বকীয়তা বহাল রেখে সনদের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য সম্মিলিত আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। পেছনের দরজা দিয়ে পলায়ন ও ষড়যন্ত্রের চুরা বালিতে পা নয়, কুঠিলদের অন্ধ গলি নয়; আলোকিত রাজপথই হউক দাবী আদায়ের প্লাটফর্ম।

লেখকঃ
শিক্ষক, গবেষক- কওমী শিক্ষা আন্দোলন
উপদেষ্টা, কক্সবাজার ইসলামী সাহিত্য ও গবেষণা পরিষদ
মোবাইল ফোন- ০১৮৪৯-৫১৩৫৫৭

Top