আয়নার পেছনের প্রলেপ এর চমক

tanvirul-mirj-ripon_1.jpg

তানভিরুল মিরাজ রিপন

তানভিরুল মিরাজ রিপন
(১)
পেশা যখন চার দেওয়ালের ভেতর বন্ধীকরা নয়,একজন বক্তা হিসেবে আমার অসংখ্য জায়গায় যাওয়া হয়।অসংখ্য মানুষের সাথে কথা বলতে হয়।তাদের সাথে বসে তাদের ভেতরের আকাঙ্কা শুনি।আমি এই একটা উক্তিকে বিশ্বাস করি, অনুধাবন করি,”একজন মানুষের দেহ নয়,পোশাক নয়,স্বপ্নই বলে দেবে সে কতটুকু উঁচুতে মানুষটা যাবে।একটা মানুষের সবচেয়ে গোপন খবর হলো, কি হতে চাই?কি হবে?কেন হবে?এটার মাধ্যমে দেশবাসীকে কি দেবে?এটাই।দেশের প্রতিজন মানুষই একটি দেশের নির্মাতা,যদি গোটা দেশকে একটা দালান ধরা হয় তাহলে প্রতিটি জনগনই জএই দালানের ইট কংক্রিট।আর একটি রাষ্ট্র গঠনের মূল উপাদান তো জনগন।প্রতিটি জনগন কর দিয়ে দিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা কে সচল করছেন।আপনি কর দিচ্ছেন,তার প্রমান হলো আপনি যখন একটা সাবান কিনতে বা ওষুধ বা প্রসাদনি কিনতে যাবেন তখন মোড়কের বা বোতলের,জার এর যেকোন এক জায়গায় মূল্যের পাশাপাশি ভ্যাট এর কথা উল্লেখ থাকে।আপনিও ঐ পন্যের কোং কে কর দিয়েছেন আপনারটা ও। সুতরাং আপনি রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকা কে সচল রাখবার জন্য কর যোগান দিচ্ছেন প্রতিদিন ই।

(২)
“এ পৃথিবী আলোর মুখ দেখেছে সব অসামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে যেগুলো পৃথিবী আলোকিত করার পর সমাজের দৃষ্টান্ত হয়েছে।”হযরত মুহাম্মদ এর উদাহরন দেওয়া যায়,”উনি যদি তৎকালীন সমাজের বিরোধিতা না করতেন তাহলে কন্যা সন্তান জীবন্ত পুতে ফেলবার নিয়ম টা থেকে যেতো,অথচ ঐ ধরনের সমাজের বিরোধিতা করেছেন বলে আইয়্যামে জাহেলিয়া পৃথিবী থেকে দূর হয়ে পৃথিবী আলোকিত হয়েছে।”গ্যালিলিও গ্যালিলি ঐ সমাজের অন্ধ বিশ্বাসকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে যদি না দিতেন,”যে পৃথিবী ই সূর্যের চারদিকে ঘুরে।”তাহলে আমরা ও আজীবন ভুল বিশ্বাসে বসবাস করতাম।রাজা রামমোহন রায়  যদি”সতীদাহপ্রথা রহিত করার জন্য সমাজ বিরোধীতা না করতেন তাহলে হয়তো আজো চিতায় নারীকে অকারনে পুড়তে হতো।বেগম রোকেয়া যদি রক্ষনশীল সমাজের বিরুদ্ধে না দাড়াতান তাহলে আজকের মুছলিম নারী সমাজ কোথায় থাকতেন?

(৩)
যে সমাজ একজন ক্ষুধার্ত নারীকে শরীরের বদলে ভাত দেয়,যে সমাজ একটি শিশুকে রক্তের বদলে ভাত দেয়,যে সমাজ পাচ বছর, দু বছর শিশুকে রক্তের বদলে বীর্যপাত এর বা যৌনতার স্বাদ নিতে পারে।যে সমাজের লোকেরা বলতে পারে”দেশে কি লাশের অভাব পড়ছে?কম টাকা দিয়ে লাশ বহন করতে হবে?”যে সমাজে একজন নারীকে পালাক্রমে ধর্ষন করতে পারে,যে সমাজ একজন নারীকে চোখের সামনে হায়েনার কবলে যেমন হরিণ পড়ে তেমন করে উলঙ্গ হতে বাধ্য করে।সেই সমাজই আপনাকে মানবিক মানুষ হবার জন্য বলে।সে সমাজই আপনার ব্যর্থতাকে ক্ষুধার্ত, উন্মাদের মতো, রুটি ছিড়ে খাওয়ার মতো করে ব্যবচ্ছেদ করে। সে সমাজই আপনাকে নিয়ে বড় বড় স্বপ্ন দেখে।যে সমাজ একজন গরীব ছাত্রের সারা বছর ব্যাপি অনাদর,অবহেলার কারনে ছিটকে পড়ছে মানুষের ভিড় থেকে এসব দেখে দেখে কথার বুলেট ছুড়তে পারে,বলেনা  সারাজনমের পড়াশোনার বা জীবন যাপনের খরচ বহন করবো, সেই সমাজই আপনাকে গোল্ডেন এ+ এর পেছনে দৌড়াবে।
(৪)
যারা পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল,বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এর ভর্তি পরীক্ষায় পাস করেননি বলে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন তাদের জন্যই মূলত এই লেখা।একটা বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে কি দেবে?একটা সার্টিফিকেট দেবে,খুব জোর বেড়ে উঠতে পারার কয়েকটা তন্ত্র-মন্ত্র শেখাতে পারবে,কখনো একটা জীবন দেবেনা।জীবন কেউ কাউকে দেইনা।আমি দেখেছি-পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয় এর সেরা ছাত্রটি হাত পেতে পেতে চলতে,এও দেখেছি ভীষন বেকারত্বে আত্মহত্যা করছে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না-পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয় আসলে আমার ভবিষ্যৎ দেবেনা। দেবে কয়েকটা সার্টিফিকেট।কিন্তু আপনার ব্যর্থতাকে বারবার-খোঁচা দেবে।আপনাকে থামিয়ে দেবে এই সমাজ।এই সমাজ কুকুরকে ঠাকুর করতে পারে ওটা অসম্ভব নয়।কিন্তু আমি বলবো জীবনে কে বলেছে বারবার সুযোগ আসেনা?যারা বলে যে সুযোগ বারবার আসেনা তারা ভুল জগতে বসবাস করছেন। প্রতিটি নিঃশ্বাসই সুযোগ,প্রতিদিনই সুযোগ।বেঁচে থাকাটায় সব চেয়ে বড় সুযোগ। আমার বেঁচে থাকতে কেনো মৃত্যুর স্বপ্ন দেখতে হবে?আমি আমাকে বাঁচাবো,দৈহিক মৃত্যু আর সূর্য ওঠা-ডুবা এসব পৃথিবীর চিরন্তন নিয়ম। কেনো এসব ভেবে আকুল হবো? খুব দূরে যেতে হবেনা-শ্রদ্ধেয় প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলামের জীবনি পড়লে হবে,যে একজন মানুষ কেমব্রিজের এর মত নামকরা দুনিয়ার সেরা প্রতিষ্ঠানে  অধ্যাপনা করার সুযোগ পাওয়া সত্যেও কেনো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এ হাজার তেরশো টাকার চাকরি করতে দেশে ফিরে আসলেন? হাজার তেরেশো টাকার বেতনগুলো দিতেও অনীহা দেখিয়েছিলো।আমার চাওয়া দেশের নামকরা পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্র হওয়া।এটা চাওয়া মাত্র,চাওয়া কখনো জীবনের নিঃশ্বাস বা বেঁচে থাকার অবলম্বন হতে পারেনা।আমি বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় পাস করলাম না,আমি মেডিকেলে ভর্তি হলাম না,আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ ভর্তি হলাম না,এর জন্য আমাকে এ সমাজ মান দেবেনা,কারন এ সমাজ পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষার্থীদের মেধার শীর্ষ আসন দেন,কিন্তু এতো যুদ্ধ করে পরিশ্রম করে যারা ওখানে ভর্তি হয়েছে, সে সংখ্যক শিক্ষার্থীরা কি সফল হয়ে বের হচ্ছে?
(৫)
যে সমাজ বুটজুতোর তলায় শিশু পিষে,সেই সমাজ আমাকে কটুকথা বলবে। আক্ষেপের কিছু নেই।আমি চেয়েছি আমার স্বপ্ন ও ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে। কারন আমার বিশ্বাস হয় আমি আমার পছন্দ মতো জীবনে খুব সফল হবো।একদিন একছোটজন আমাকে প্রশ্ন করলো আপনাকে দেশের সর্বোচ্চ স্বীকৃতিপত্র দিলো যেকোন একটা কোং কিন্তু আপনি তাতে কি অস্বীকৃতি জানাবেন?আমি তাকে বলেছি,আমার গ্রাজুয়েশন কোন বিষয় নয়,আমার সার্টিফিকেটও কোন বিষয় নয়,আমি কতটুকু নিজের জীবনকে আলাদা ভাবে প্রভাবিত করে প্রতিদিনের শুকতারা হতে পেরেছি(শুকতারা বলতে যে মানুষটাকে প্রয়োজন ছাড়া মানুষ সবসময় স্মরন করবে),এবং আমি কতটুক আমার ইচ্ছাতে সফল?সেটায় বিষয়।জীবন একটায় এবং সেটা উপভোগ করতে হবে,সেই উপভোগ যদি নিজের ইচ্ছাকে মেরে ফেলে তাহলে হয় কি? তাই বলবো হেরে যাওয়ার পরো ইচ্ছারা মরে যায়না, ইচ্ছারা মৃত্যুর সময় পর্যন্ত যেনো আপনাকে হতাশ করে না ফেলে তা ই দেখার বিষয়।

(৬)

বাংলাদেশের পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলো থেকে প্রতি বছর BBA,MBA,ECONOMICS (উদাহরনের জন্য ব্যবহৃত)  এ সর্বোচ্চ গ্রাজুয়েশন করে বেরুচ্ছে শত শত শিক্ষার্থী।কয় তারা তো আজো দেশের কোন অর্থনৈতিক সফলতা এনে দিতে পারেনি,কোন ফর্মুলা আবিষ্কার করে চমক লাগাতে পারেনি। সে একশো বছরের পূর্তিধারী হোক বা ৫০ বছরে পূর্তিধারী হোক কোন পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয় সেটা দেয়নি।সামান্য টাকার আমলাধারী বেতন ভোগ করে প্রতিনিয়ত মরে শেষ হয়ে যাচ্ছে।পুরিয়ে যাচ্ছে।সুতরাং পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে সত্যি সার্টিফিকেট ছাড়া কোন অর্জন দেবেনা।
ওরা পারেনি আপনি আপনার জায়গা থেকে পেরে দেখান।পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয় আপনার চাওয়া হতে পারে,চাওয়ারা অসংখ্য পাওনার ভিড়ে তলিয়ে ও যায়।

ভিন্ন কিছুই দৃষ্টান্ত হয়,স্বাভাবিক জলে গা আর কতো ডুবাবেন?সমাজ কিন্তু একটায়, যে সমাজ পাঁচ বছরের বাচ্চার গোপানাঙ্গ কেটে যৌনসুখ খুজে, সে একই সমাজ জামাল নজরুল স্যারকে হাজার টাকা বেতন দিতে অনীহা জানায়।ঐ একই সমাজে আপনি বসবাস করছেন।

পৃথিবীতে আজ যা ঘটছে সেটা স্বাভাবিক,আগামীকালের গুলোই নতুন।

পৃথিবীতে এমন না ঘটবে বলে কোথাও বলা নেই, গোটা দুনিয়ার যে ১০০ নম্বর বা তার  নিচের একটি বিশ্ববিদ্যালয় আপনি অযোগ্য বলে পড়ার অনুমতি দেইনি,সে আপনি দুনিয়ার ১ নম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে অতিথি হয়ে আলোর পথ দেখাচ্ছেন।বিষয়টা অসম্ভব নয়, একেবারে নয়।

আশারা মরে যায়না,ইচ্ছারাও না এসব জীবনের নিঃশ্বাস ও বটে।বদলে যেকোন সময় যাওয়া যায়,সে ১৮ এ হোক কিম্বা ১২০ এ হোক।

বেঁচে আছি এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় এবং প্রাচীন সুযোগ।

তানভিরুল মিরাজ রিপন
তরুণ লেখক।

Top