আরকান এখন বিধ্বস্ত জনপদ

arakan_1.jpg

গোলাম আজম খান, কক্সবাজার:
আরাকানকে রোহিঙ্গাচ্ছুৎ করতে নানা অজুহাতে ১৯ বার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দমন পীড়ন অভিযান চালায় মগের মুল্লুগের বর্বর বাহিনী। ১৯৪২ সাল থেকে চলা এই দমন, পীড়ন ও নির্যাতনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাশূণ্য করতে গিয়ে এই বর্বর বাহিনী অত্যচারে আরকান এখন বিধ্বস্ত জনপদ। এই কারনে বাংলাদেশে বাড়ছে নির্যাতিন নিপীড়নের শিকার প্রতিদিন বাড়ছে রোহিঙ্গার শরণার্থীর সংখ্যা। শরণার্থীদের এই চাপ সমলাতে রীতিমতো হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে সীমান্তের বিজিবি ও কোষ্টগার্ড ।

বিজিবি কক্সবাজার ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল ইমরান উল্লাহ সরকার জানিয়েছেন, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ চেষ্টাকালে রোহিঙ্গা ভর্তি ছয়টি নৌকা ও পাঁচজনকে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি। রোববার ভোর রাতে উখিয়া ও টেকনাফের নাফ নদীর বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে এদের ফেরত পাঠনো হয়। এদের মধ্যে ৩ জন পুরুষ ও ২ জন শিশু রয়েছে। গত ১ নভেম্বর থেকে ২৭ নভেম্বর সকাল ৭ টা পর্যন্ত ৪১৬ অনুপ্রবেশ চেষ্টাকারী রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বিজিবি টেকনাফ ২ ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর আবু রাসেল সিদ্দিকী বলেন, রোববার ভোর রাতে নাফ নদীর বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ চেষ্টাকালে জলসীমার শূণ্যরেখা থেকে রোহিঙ্গা বোঝাই ৬ টি নৌকা ফেরত পাঠানো হয়েছে। প্রতি নৌকায় অন্তত ১০ জনের বেশী রোহিঙ্গা ছিল।

বিশেষতঃ ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সামরিকের জারীকৃত নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে ৩টি ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়। (১) তাইরেন্স (১ম শ্রেণীর নাগরিক) (২) নাইংচা (প্রাকৃতিক নাগরিক) (৩) নাইংক্রাচা (অথিতি নাগরিক)। কিন্তু এই ৩ ক্যাটাগরির কোন ১টিতে রোহিঙ্গাদেরকে নাগরিকত্ব স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। সর্বশেষ তাদেরকে দেশবিহীন জাতিতে পরিণত করতে গত ৯ অক্টোবর রোববার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মুসলিম অধ্যুষিত সীমান্ত চৌকিতে পুলিশের ওপর হামলায় ঘটনার সূত্রপাত ধরে শুরু হয় অভিযানের নামে মিয়ানমারের সরকারী ৩ বাহিনী পুলিশ, সেনাবাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চলছে ত্রিমুখী নৃশংসা। নৌ, স্থল, আকাশ পথে চলছে থেমে থেমে নৃশংস আক্রমণ। ফলে গগণবিদারী নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে উঠছে আকাশ বাতাস। গোটা আরাকান প্রদেশজুড়ে বিশেষ করে উত্তর মংডুর রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় আতঙ্ক কাটছে না। সে দেশের সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর দমন পীড়ন ও নির্যাতনে কোণঠাসা রোহিঙ্গারা নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে। নাফ নদী ও সাগর জলে ভাসছে নারী-পুরুষ ও নিরীহ মানুষ বোঝাই অনেক নৌকা। এই সব নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের বর্ণনায় উঠে আছে কাফের ফেরাউন যেমনি ভাবে নিপরাধ বাচ্ছাদের উত্তপ্ত তেলে ফেলার মতো ঘটনা মনে করে দিছে সেই মিয়ানমারের বর্বর বাহিনী। সেই মিয়ানমারের বর্বর বাহিনী সেই ফেরাউনের পদাংক অনুসরণ করেই আজ রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাচ্ছাদেরকে হাত পা বেঁধে উত্তপ্ত আগুন আর গরম পানিতে ফেলে হত্যা করছে। দিকে নাফনদী ও সাগরে মিয়ানমার-বাংলাদেশের নৌবাহিনী ও কোষ্টগার্ডের টহল যানের আওয়াজে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব বিরাজ করছে সীমান্তে। এপারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী কঠোরভাবে প্রতিরোধ করছে অবৈধভাবে রোহিঙ্গারা কোনভাবেই যেন তারা এই দেশে প্রবেশ করতে না পারে। কিন্তু এটা মানবতার কোন পর্যায়ে পড়ে? এর কোন উত্তর নেই। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা এবং সীমান্তের ওপার থেকে বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যগুলো আরো লোমহর্ষক। ‘গত শনিবার মিায়ানমার পুলিশ ও সেনাবাহিনী পাড়ায় ঢুকে বর্বরতা চালায়। বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়। পুরুষদের ধরে নিয়ে যায়। কোলের শিশুদের কেড়ে নিয়ে আগুনে পুড়ে হত্যা করেছে। এভাবে গ্রামের পর গ্রাম জ¦ালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে। স্বামী ও বড় ছেলেকে ভাতের পাত থেকে তুলে নিয়ে চোখের সামনেই হত্যা করেছে। মা-বাবার চোখের সামনেই যুবতী মেয়ের ধর্ষণের পর হত্যা করা হচ্ছে। সেই ভয়াবহ নির্যাতন-নির্মম গণহত্যা, অমানবিক অত্যাচার সইতে না পেরে ভিটে-মাটি ছেড়ে বাংলাদেশের দিকে পালিয়ে আসছে সেখানে গুম, হত্যা থেকে বেঁচে থাকা রোহিঙ্গারা। টেকনাফের একটি ক্যাম্পে আশ্রায় নেয়া নূর বেগম জানান, তারপর দুই ছেলেকে তার সামনে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে। এরপর সে ছোট শিশু জানে আলমকে নিয়ে নানার বাড়ি গুলজারের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানেও বাঁচতে পারলেন না। ওখানে হামলা চালায় সৈন্যরা। পাশের অপর বাড়ির লোকসহ তাদের পরিবারের প্রায় ৩০ জন পুরুষকে এক সাথে বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে।

মিয়ানমারের চলমান নৃশংসতা, নির্যাতনের অত্যান্ত ভয়াবহ ও বিস্তৃত। যুগ যুগ ধরে রাখাইন রাজ্যের ওই জনপদে নির্যাতিত হয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির ভাগ্য এখন আরো নির্মম। সারাবিশ্বের আনাচে কানাচে যখন আধুনিকতার ছোঁয়া লাগছে, যখন মানুষের জীবন উন্নত ও নিরাপদ করতে, নারীর সম্মান রক্ষায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে, তখন সাগরপাড়ের ওই জনপদে এভাবেই চলছে বর্বর নির্যাতন। ভাগ্য বদলানো দূরে থাক, উল্টো মিয়ানমার সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও স্থানীয় রাখাইন অধিবাসীদের অত্যাচার, নির্যাতন সয়ে হাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে দিন কাটছে হাজার হাজার রোহিঙ্গার দিনকাল।

মিয়ানমারের মংডুর জামবুনিয়া রাঙ্গাবালি গ্রামের বিধবা ফাতেমা খাতুন (৫৩) জানালেন কীভাবে নরকুন্ড থেকে বেরিয়ে আসা ঘটনা। জানালেন, স্বামীকে হারিয়েছেন অর্ধযুগ আগে। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে বসবাস হলেও নাগরিকত্ব মিলেনি। এরপরও সন্তান ও নাতি-নাতনি নিয়েই দিন কাটছিল। কিন্তু সেই সুখ তাদের শোকেই পরিণত হয়েছে।

সবকিছু হারিয়ে তিন নাতনিকে নিয়ে তিনি এখন দেশান্তরি। স্বীকৃতি মিলেছে অবৈধ অভিবাসীর। ওপারে নিরাপত্তা নেই। এপারে নেই আহারের সংস্থান। জীবন এখন তার কাছে বিভীষিকাময়। তার ওপর বয়ে যাওয়া বিভৎস নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে আতকে ওঠেন।

তিনি বলেন, গ্রামে সেনাসদস্যরা আক্রমণ চালায় ১৫ নভেম্বর রাতে। অতর্কিত বাড়িতে ঢুকে তিন ছেলে শাহ আলম (৩০), নুর ছালাম (২৭), আমান উল্লাহ (২৫) ও হামিদ হোসেনকে (১৬) বেঁধে ফেলে। এরপরই চলে তার দুই মেয়ের ওপর পাশবিক নির্যাতন। একে একে সেনারা তাদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়।

ফাতেমা বলেন, ‘নির্যাতনে বাধা দেয়ায় সেনারা এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। মেয়েদের ওপর নির্যাতন শেষ হলেই চার ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে ঘরে আগুন দেয় সেনা সদস্যরা। এ সময় প্রাণ বাঁচাতে কে কোথায় গেছে আমি জানি না।’

গত এক মাসের বেশি সময় থেমে থেমে জঙ্গি নিধনের নামে ধরে ধরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে হত্যা করছে। গত এক দেড় মাসে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে বাস্তুহারা করা হয় অন্তত ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে। এছাড়া নারী শিশুদের উপরও চলছে নির্মম নির্যাতন। প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে পরিবার-আত্মীয় স্বজনকে কোথায় আছেন তার খবরও নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না তারা। অনেকেই পরিবার স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিখোঁজ হয়ে আছেন।

সেখানে এখনো পর্যন্ত থেমে থেমে সেনাবাহিনীর নির্যাতন চলছে। তাদের ভয়ে রোহিঙ্গা পুরুষরা জনমানবহীন পাহাড়, জঙ্গলে আশ্রয় নিচ্ছে। আর নারী ও শিশুরা বাংলাদেশের প্রবেশের চেষ্টা করতে বাধ্য হচ্ছে। তবে যখন বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের এদেশে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে, তখন ফিরে যেতে চাইলে তাদের পড়তে হচ্ছে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলির মুখে। সেখানকার সেনাবাহিনী ইচ্ছে করেই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দিতে চাচ্ছে।

Top