হাজারো স্যালুট ১৪২ বছরের কসউবি তোমায়

Reproter-er-dairy-Tofaiel_1.jpg

তোফায়েল আহমদ :

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া অকুতোভয় সন্তানদের সংখ্যাও নেহায়েৎ কম নয়। যদিওবা অনেকেই দেশ মাতৃকার জন্য প্রাণপনে লড়েছেন। কিন্তু তালিকাভৃুক্ত হননি সকল মুক্তিযোদ্ধারা। তালিকাভুক্ত না হলেও এসব মুক্তিযোদ্ধারাই দেশকে শত্রুমুক্ত করতে গিয়েছিলেন। কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এরকম সংখ্যাটিও অনেক। কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-কসউবি’র ১৯৭২ ব্যাচের ছাত্র তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী (সাবেক জেলা কমান্ডার) এ পর্যন্ত ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা দিয়েছেন। তারা সবাই কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-কসউবি’র প্রাক্তন ছাত্র। তাঁরা বিদ্যালয়ে পড়তে এসেই ছুটে গিয়েছিলেন দেশ স্বাধীন করার জন্য। পড়ালেখা রেখে মাতৃভুমিকে শত্রুমুক্ত করতে যাওয়া সেই সময়কালের কিশোর-তরুণের দলকে সুস্বাগতম। কসউবি’র ১৪২ বছর। এই প্রথম বারের মত অনুষ্টিত হচ্ছে কসউবি’র প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী অনুষ্টান। দীর্ঘ ১৪২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘটনাটি হচ্ছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-কসউবি’র প্রাক্তন ছাত্র মুক্তিযোদ্ধাদের জানাই লাল সালাম। আজ কসউবি গর্বিত-এত বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাদের পেয়ে। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধারাও আনন্দিত এবং গর্ববোধ করে কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-কসউবি’র মত একটি প্রতিষ্টানের ছাত্র হতে পেরে। এত দীর্ঘকাল পর কসউবি’র যেসব উদ্যমি শিক্ষার্থীরা আজকের এত বড় অনুষ্টানের আয়োজন করেছেন তাদের পথচলা হোক আরো সুন্দর এবং আরো (এরপর পৃষ্ঠা-২ ঃ কলাম- ) কক্সবাজার চমৎকার। আয়োজকদের শ্লোগান-‘শতবর্ষের কোলাহলে এক সাথে সকলে’-হোক দীর্ঘজীবী। সেই সাথে অমর হোক- কসউবি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অদম্য সাহসিকতাপূর্ণ ভুমিকার কথাই দীর্ঘকাল ধরে অজানা ছিল। শিক্ষার্থী শৈলেশ্বর চক্রবর্তী ও নির্মল লালা ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ- অস্ত্রাগার দখল, চট্টগ্রাম পুলিশ লাইন আক্রমণ এবং জালালাবাদ যুদ্ধের প্রখ্যাত সৈনিক ছিলেন। নির্মল লালা ছিলেন মাস্টারদা সূর্যসেন দলের সর্বকনিষ্ট কর্মী এবং কক্সবাজার হাই স্কুলের ৮ম শ্রেণির ছাত্র। ১৯৩০ সালের ২২ এপ্রিল সংঘটিত জালালাবাদ যুদ্ধেই শহীদ হন তিনি। কক্সবাজার ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরিতে বিপ্লবীদের বইপত্র পড়ে দেশকে বৃটিশের কবল থেকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখতেন। সে ক্ষেত্রে নির্মল লালা যুদ্ধে যাওয়ার সংকল্প করতেন। কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়–য়া বিধু সেন, তারেকশ্বর চক্রবর্তী, কেদারেশ্বর চক্রবর্তী, প্রবোধ কুমার রক্ষিত ও অমৃতাংকুর সেন গুপ্ত সহ ব্রিটিশ বিরোধী এই জনা দশেক সাহসী সন্তানগুলো ছিলেন কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়েরই ছাত্র। এইতো বীরের জন্ম দেওয়া একটি শিক্ষা প্রতিষ্টান- কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-কসউবি। ১৯৫২ সালে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে বের করা হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম মিছিল। বাংলার অকুতোভয় এই সন্তানও ছিলেন কসউবি’র ছাত্র। বাংলায় কথা বলার আন্দোলনে বিজয় অর্জন করেও ক্ষান্ত হননি অদম্য সাহসী সন্তান খালেদ মোশাররফ। তিনিই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গণে ১১ টি সেক্টরের একটির কমান্ডার ছিলেন বীর সেনানী খালেদ মোশাররফ। ছিলেন তিনি কে ফোর্সের প্রধান। পশ্চিমা হায়েনাদের সাথে যুদ্ধে বীরত্ব দেখিয়ে এই মহান যুদ্ধা খালেদ মোশাররফ লাভ করেছিলেন ‘বীরোত্তম খেতাব।’ বাংলা মায়ের বীর সেনানী বীরোত্তম খালেদ মোশাররফ গর্বিত শিক্ষা প্রতিষ্টান কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-কসউবি’র গর্বিত ছাত্র। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও কসউবি’র শিক্ষক-ছাত্রদের অবদানেরও যেন শেষ নেই। এই বিদ্যালয়েরই শিক্ষক কুতুবদিয়া দ্বীপের সন্তান শাহ আলম ও বশির আহমদ শহীদ হন বিহারীদের হাতে। তারা দুইজনই প্রশিক্ষনের জন্য গিয়েছিলেন রাজধানী ঢাকায়। মীরপুরেই নিহত হন তারা। শহীদ হন কসউবি’র ছাত্র সুভাষ দাশ, শশী কুমার বড়–য়া ও স্বপন ভট্টাচার্য। একাত্তরের ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে রঞ্জিত লাল সবুজের এই দেশটিতে আলোকিত শিক্ষা প্রতিষ্টান কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-কসউবিও গর্বিত অংশীদার। ১৯৫৫ সালে এ শহরের টেকপাড়ার শিশু ছাত্রী নুরুন্নাহার বেগমের আরেক যুদ্ধের কথা বলি। পঞ্চম শ্রেণীর পড়া শেষে দাদা মৌলভী আবদুল হালিম বললেন-যাও এবার অন্দর মহলে। পড়ার দৌড় খতম। কিন্তু তা মানতে নারাজ নুরুন্নাহার। একদনি দুপুরে বাসার সবাই যখন ঘুমে তখনই নুরুন্নাহার বের হলেন। গেলেন শহরের বাজার ঘাটার শফি ডাক্তারের বাসায়। ডাক্তার সাহেবের ছোট কন্যা হোসনেআরা রুবীকে বললেন-তার পুরানো ষষ্ট শ্রেণীর বইগুলো তাকে দিতে। টেকপাড়ার ঐতিহ্যবাহী মৌলভী পরিবারের কন্যা নুরুন্নাহার পরিবারের সাথে এক প্রকার যুদ্ধ করেই ভর্ত্তি হন কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ট শ্রেণীতে। সাথে ছিলেন মরহুম এডভোকেট এখলাছুল কবিরের কন্যা জয়নবআরা জুনু ও রোকেয়া সুলতানা বুলবুল, ডাঃ ফজল কবিরের কন্যা আরেফা, তদানীন্তন সাব রেজিষ্ট্রারের কন্যা সরওয়ারা, ডাক্তার কন্যা শিরিন খালেদা, পুলিশ কর্মকর্তার কন্যা মাহমুদা, রেঞ্জ অফিসার কন্যা সিদ্দিকা বেগম রুবী এডভোকেট পীযুস চৌধুরীর বোন নীলিমা চৌধুরী ও গীতা চৌধুরী সহ আরো ক’জনা। সেই ১৯৫৫ সালে এই বিদ্যালয়ে সহ শিক্ষায় ছিলেন রক্ষণশীল পরিবারের কন্যারা। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের অফিস সংলগ্ন ছিল মেয়েদের জন্য একটি কক্ষ। তবে মেয়েরা সবাই শ্রেণী কক্ষেই থাকতেন। কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৬২ সালে এস,এস,সি পাশ করা নুরুন্নাহার বেগমরা ছিলেন মেয়েদের মধ্যে শেষ ব্যাচ। নুরুন্নাহার বেগম জানান-‘যখন আমি মৌলভী দাদার কথা অমান্য করে ষষ্ট শ্রেণীতে ভর্ত্তি হই তখন পাড়া প্রতিবেশীরা আমাকে বলতে থাকেন-আলেমের ঘরে জালিম।’ তিনি বলেন-সেদিন টেকপাড়া থেকে আমি একাই যেতাম স্কুলে। পথে পথে কোন ইভটিজিং ছিল না। বড়রা আমাদের স্ন্হে করতেন আর সহপাঠিরা দেখতেন বোনের মত করে। মাষ্টার মোজহেরুল হক স্যারের ইংরেজী পড়া এখনো বাজে তার কানে। দেব বাবু স্যারের পড়ানোর ষ্টাইল এখনো চোখে ভাসে তার। শহরের হোটেল মারমেইডের মালিক পেকুয়ার জমিদার মরহুম জহিরুল ইসলাম চৌধূরীর সহধর্মিনী নুরুন্নাহার বেগমের তিন সন্তানও লেখা পড়া করেছেন এই বিদ্যালয়ে। তার (নুরুন্নাহার) পিত্রালয় টেকপাড়ার লোকজন এখনো বলে থাকেন কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের অদম্য ছাত্রী ‘নুরুন্নাহার টেকপাড়ারই আরেক বেগম রোকেয়া।’ এরকম হরেক বেগম রোকেয়ার মত প্রতিভা জন্ম দিয়েছে ১৪২ বছরের কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়-কসউবি। গর্বের প্রতিষ্টান কসউবি নিয়ে কতইনা স্মৃতি ৭২ বছর বয়ষ্কা এই শহরের সাহসী নারী নুরুন্নাহার বেগমের। বলেন নুরুন্নাহার বেগম-এগিয়ে যাক আমার প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্টান-কসউবি। আজ থেকে ৬৪ বছর আগের একজন মোহাম্মদ আলী। প্রবীণদের নিকট গোদার পাড়ার মোহাম্মদ আলী হিসাবে পরিচিত। তবে তার বড় পরিচিতি চেম্বারের মোহাম্মদ আলী। ১৯৫০ সালের এসএসসি তিনি। তাঁরা ১৪ বন্ধু এক সাথে পড়তেন। সবাই পাশ এক বছরেই। ব্রিটিশের যুদ্ধ দেখেছেন এই লোকটি। কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজে পড়ার সময় ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। চট্টগ্রামে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। এই মানুষটি কসউবি’র ছাত্র হিসাবে নিবন্ধিতদের মধ্যে সর্ববয়োজেষ্ঠ। কেননা ১৯৫০ সালের এসএসসি পাশ কসউবি ছাত্রদের মধ্যে তিনিই একমাত্র নিবন্ধিত হয়েছেন। তিনি বলেন-‘এত কথা সেই সময় ছিলনা। ছিল কেবল লেখাপড়া আর খেলাধুলা।’ এই কসউবি জন্ম দিয়েছে সুনিল কৃঞ্চ দে’র মত প্রতিভাধর একজন জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়। ১৯৭৪ সালে আমি গ্রাম থেকে এসে ভর্ত্তি হয়েছিলাম বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীতে। শহরের বন্ধুরা একারনে বলত-জংলী। আসলে ওরা ঠিকই বলত। গ্রামীণ পরিবেশ থেকে আমরা এসেছিলাম শহরে। গ্রামে রাস্তা-ঘাট ছিলনা। আমরা লুঙ্গি পরেই প্রাইমারি আর নিম্নমাধ্যমিকে যেতাম। প্যান্ট পরা শিখেছি শহরে এসেই। চিনতাম না- ড্রাই কেক কি। আমাদের প্রধান শিক্ষক ছিলেন আজিজুল্লাহ স্যার। স্যারের দুই কন্যা ছিলেন। দুইজনই পড়তেন কলেজে। এক দিন স্যারের ছোট কন্যা বাসায় ডেকে অনুরোধ করলেন-জিলানী বেকারী থেকে বেলা বিস্কুট এবং ড্রাই কেক এনে দিতে। আমি আসলেই ড্রাই কেক চিনিনা। তাই দাদখানি চাল-চিনি পাতা দই বলে বলেই যাচ্ছিলাম জিলানীতে। কপাল খারাপ আমার। পথিমধ্যে ভুলে যাই। উল্টো আবার ফিরে গিয়ে এবার লিখে নিয়েই গেলাম জিলানী বেকারীতে। আমি সেই একজন অধম-তোফায়েল আহমদ-কসউবি’র ১৯৭৬ ব্যাচ। কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-কসউবিতে লেখাপড়া করেছি আমার পরিবারের একে একে দশ সদস্য। আমরা তিন সহোদর, আমার দুই পুত্র, আমার চার ভ্রাতুষ্পুত্র সহ এক নাতি। কসউবি আমাকে শিখিয়েছে একদম শূন্য থেকে। কসউবি আমাকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ করতে না পারলেও অন্তত অমানুষ হওয়া থেকে রক্ষা করেছে। কসউবি আমাকে রক্ষা করেছে মূর্খতার মত এক জঞ্জাল থেকে। কসউবি আমাকে শিখিয়েছে দেশপ্রেম, শিক্ষকদের ভক্তি-শ্রদ্ধা সর্বোপরি মানুষকে ভালবাসা। ১৪২ বছরের কসউবি তোমায় হাজারো স্যালুট।

Top