যে ছবি কথা বলে…

Salahuddin-Stori-Pic-3.jpg

কক্সবাজার জেলা পরিষদ ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছেন জেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান এএইচ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ। পাশে তৎকালীন জেলা প্রশাসক এম.এ কামাল

ইমাম খাইর, সিবিএন:
ছবির কোন প্রাণ নেই, আত্না নেই। নেই ভাষা প্রকাশের সুযোগ। এরপরও একটি ছবি হাজারো মানুষের মনে কথা বলতে পারে। জানিয়ে দেয় অনেক অজানা কথা।
সময় বয়ে যায়, সময় মিলিয়ে দেয়। সময়ের স্রোতে ভেসে অনেক কিছুই স্মৃতি হয়ে যায়। স্মৃতি মুছে যায়, ছবি যেন স্মৃতির সাক্ষী হয়ে জেগে থাকে।
ছবি মনে করিয়ে দেয় ফেলে আসা সময়ের কথা। তাই তো মাঝে মাঝেই পুরনো ছবির দিকে তাকিয়ে নিজেকেই খোঁজে ফেরে মানুষ। ছবি কথা বলে উঁচু-নীচু সবার।
তবে, কিছু ছবি কাঁদায়, আর কিছু হাসায়। স্মৃতি রোমন্থন করে অনেক পুরনো ছবি। পুরাতনকে নতুনের সাথে মিশিয়ে সম্প্রীতির মেলবন্ধন তৈরি করে। রচনা করে এগিয়ে চলার পথ।
ছবি কথা বলে স্বাধীনতা-বিজয়ের। ছবি কথা বলে নির্যাতিতের, কথা বলে অসহায়ের।
কথা বলে বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার সমাজের সব শ্রেণির নারী-পুরুষের।
একটি ছবিতে প্রকাশ পায় উন্নতি, অবনতি, বৈষম্যের কথা। ওঠে আসে সব বিচিত্র জীবনপ্রণালী।
মোট কথা, অজানাকে জানার, অচেনাকে চেনার অন্যতম মাধ্যম ছবি।
একারণে, ছবির ‘কদর’ বোঝেনা এমন লোক নেই বললেও চলে।
প্রখ্যাত দার্শনিক সেখ সাদির ভাষায় ‘এমন জীবন হবে করিতে গঠন মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভূবন।’

 ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে উচ্চডিগ্রি লাভের জন্য বুলগেরিয়া যাওয়ার প্রাক্ষালে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সাথে বীর মুক্তিযোদ্ধা এএইচ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ (ফুলের মালা হাতে)।


১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে উচ্চডিগ্রি লাভের জন্য বুলগেরিয়া যাওয়ার প্রাক্ষালে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সাথে বীর মুক্তিযোদ্ধা এএইচ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ (ফুলের মালা হাতে)।

জীবন তখনই স্বার্থক যখন মানুষ স্মরণে রাখার মতো কিছু করা যায়। উপকারে আসে মানুষ ছাড়াও সকল প্রকারের জীবজন্তু।
অনেকেই জানেনা কক্সবাজার জেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান কে? তিনি কোথাকার লোক? তার কিইবা যোগ্যতা-কর্মদক্ষতা?
উত্তর খুঁজতে গেলে পাই, কক্সবাজার জেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা এএইচ সালাহ উদ্দীন মাহমুদ।
১৯৮৮ সালে উপ-মন্ত্রীর পদমর্যাদায় কক্সবাজার জেলা পরিষদের প্রথম জেলা চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।
সালাহউদ্দিন মাহমুদের আমলে কক্সবাজার জেলার অভুতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। কক্সবাজার জেলা পরিষদ ভবন নির্মাণ, টেকনাফের বিদ্যুতের গ্রীড লাইন, মহেশখালী জেটি, রামু কলেজসহ অনেক উন্নয়ন কর্মকান্ডে তার ভূমিকা রয়েছে।
তার সময়কালের নকশায় নির্মিত জেলা পরিষদ ভবন এখনো অদ্বিতীয়।
সালাহউদ্দিন মাহমুদ চকরিয়ায় নতুন হাসপাতাল নির্মাণ, চকরিয়া কলেজকে ডিগ্রি কলেজে উন্নীতকরণ, মাতামুহুরী নদীর উপর বাটাখালী সেতু নির্মাণ, পেকুয়া কাটাফাড়ি সেতু নির্মাণ, বাঘগুজারা সালাহ উদ্দিন ব্রীজ, বরইতলী-মগনামা ভায়া কুতুবদিয়া সড়ক নির্মাণ, চকরিয়া-বদরখালী সড়কের উন্নয়ন, চিংড়ি জমির সঠিক বরাদ্ধের মাধ্যমে চাষের উন্নয়ন করেছেন।
বিভিন্ন উপজেলার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্টানের উন্নয়নে তার অনেক অবদান জনবিদিত।
চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ডেপুটি বাড়ির বাসিন্দা সালাহ উদ্দিন মাহমুদ ১৯৮৫ সালে বৃহত্তর চকরিয়া উপজেলার (চকরিয়া-পেকুয়া) প্রথম নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান।

টেকনাফে বিদ্যুতের গ্রীড লাইন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এএইচ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ। সাথে সাবেক এমপি আবদুল গণি, বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান শামসুল ইসলাম, বিজিবি’র (তৎকালীন নাম বিডিআর) এরিয়া কমান্ডার কর্ণেল হায়দার

টেকনাফে বিদ্যুতের গ্রীড লাইন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এএইচ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ। সাথে সাবেক এমপি আবদুল গণি, বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান শামসুল ইসলাম, বিজিবি’র (তৎকালীন নাম বিডিআর) এরিয়া কমান্ডার কর্ণেল হায়দার

১৯৮৬ সালে তিনি কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসন থেকে তৃতীয় ও ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি মুজিব বাহিনী নামে খ্যাত ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’ (বিএলএফ) কক্সবাজার মহকুমার কমান্ডার ছিলেন।
বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এএইচ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ সরকারের পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু’র নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি জেপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য। দলের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও মহাসচিব সাবেক মন্ত্রী শেখ শহিদুল ইসলামের খুব কাছের মানুষ ব্যক্তি হিসেবে তিনি পরিচিত।
জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালে বরণ্য এ রাজনীতিবিদ পুরো কক্সবাজার জেলাকে উন্নয়নে ঢেলে সাজিয়েছিলেন।
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ একজন সুবক্তাও। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে প্রশাসনিক দক্ষতার অর্জনের জন্য স্বাধীনতার পর তাকে সরকারীভাবে স্কলারশীপ দিয়ে বুলগেরিয়ায় পাঠিয়েছিলেন।
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালীন কক্সবাজার মহকুমা মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন।
তিনি ছাত্রজীবন থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলন করেছেন। ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ওইসময় নির্যাতন ও কারাভোগ করেন।

 চকরিয়া বাটাখালী ব্রীজের নির্মাণাধীন কাজ পরিদর্শন করছেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদ সদস্য এএইচ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ। সাথে সড়ক ও জনপদ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা রয়েছেন।


চকরিয়া বাটাখালী ব্রীজের নির্মাণাধীন কাজ পরিদর্শন করছেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদ সদস্য এএইচ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ। সাথে সড়ক ও জনপদ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা রয়েছেন।

১৯৬৫ সালে চট্টগ্রাম সরকারী বাণিজ্য কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক, ১৯৬৭ সালে যশোর জেলা ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ওই সময় সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন সিকদার। পরবর্তী পর্যায়ে হুলিয়া মাতায় নিয়ে পালিয়ে চট্টগ্রামে আসেন।
১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম ছাত্রলীগ নেতা, ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের স্বাধীনতাকামীদের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘বাংলা জাতীয় সাংস্কৃতিক আন্দোলন’ বা ‘বাজাসান্দো’র প্রথম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বাজাসান্দোর সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা প্রাক্তন মন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম।
১৯৭৩ সালে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় সভাপতি ছিলেন সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম।
১৯৭৪ সালে বুলগেরিয়া সরকারের স্কলারশীপ নিয়ে সুফিয়া সোস্যাল সায়েন্স ও পাবলিক এডমিনিষ্ট্রেশন একাডেমী থেকে প্রশাসনের উপর উচ্চতর ডিগ্রী লাভ করেন।
সালাহ উদ্দিন মাহমুদের জন্ম চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের ডেপুটি বাড়ির সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে।
তিনি ১৯৫০সালের ২৫ শে নভেম্বর জন্মগ্রহন করেন। পিতা মরহুম এ.এ. সুলতান মাহমুদ বি.এ, ই.পি.সিএস, মাতা আছিয়া বেগম।
দাদা কক্সবাজার জেলার প্রথম স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী মরহুম গোলাম কাদের এম.এ (ডবল) ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট, নানা মরহুম আলহাজ্ব ফররুখ আহমদ এম.এ বি.এল এডভোকেট।

 রামু কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এএইচ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, সাবেক এমপি ও রাষ্ট্রদূত আলহাজ্ব ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী, সাবেক এমপি দিদারুল আলম চৌধুরীসহ অন্যান্যরা।


রামু কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এএইচ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, সাবেক এমপি ও রাষ্ট্রদূত আলহাজ্ব ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী, সাবেক এমপি দিদারুল আলম চৌধুরীসহ অন্যান্যরা।

তার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন অতিবাহিত হয়েছে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম ঘাটফরহাদবেগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল হাইস্কুল, সরকারি মুসলিম হাইস্কুল, চাঁদপুর মতলবগঞ্জ জেবি হাইস্কুল, চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ, যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সালাহউদ্দিন মাহমুদ রাজনীতির এই পুরোধা নিজ এলাকা বরইতলী উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির দুইবার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে বিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ উন্নতি সাধিত হয়। তিনি বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ ও ভবনের জমি বিদ্যালয়ের নামে রেজিষ্ট্রি করে নিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। একারণে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষ সবার কাছে স্মরণীয় ব্যক্তি।
পারিবারিক জীবনে সালাহ উদ্দিন মাহমুদের এক স্ত্রী, তিন মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। স্ত্রী সেনোয়ারা পারভীন গৃহিনী। তার শ্বশুরের নাম ডা. শামসুদ্দিন আহমদ চৌধুরী এমবিবিএস ।

কক্সবাজার জেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান এএইচ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ।

কক্সবাজার জেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান এএইচ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ।

সালাহ উদ্দীন মাহমুদের বড় মেয়ে শাহরীমা ইশরাত রীমা। তার স্বামী আরিফুর রহমান মেরিন ইঞ্জিনিয়ার ও অস্ট্রেলিয়ান প্রবাসী।
মেঝ মেয়ে সাবরীনা ইফফাত রীভা। স্বামী লে. কর্ণেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ সায়েম। ছোট মেয়ে আফরুনা রিশাত অবন্তি। স্বামী জিয়াউল আলম রাসেল এম.কম। একমাত্র ছেলে নাগীব আল-মাহমুদ গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে চাকুরিরত।
জেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান হলেও কক্সবাজার শহরসহ দেশের কোথাও তার নামে এক টুকরো জায়গা-জমি নেই। নির্লোভ এই মানুষটি গ্রামকেই সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন।

Top