বেসরকারী এমপিও ভুক্ত শিক্ষকদের চাকুরি ও জীবনমান (পর্ব-১)

jalal-ahmad-lohagara.jpg

জালাল উদ্দিন :

শৈশব কাল থেকেই শুনে আসছি শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। আর শিক্ষকগণ হলেন জাতি গড়ার কারিগর। হয় তো তাই মনে মনে ভাবতাম ভবিষ্যতে আমি একজন শিক্ষক হব।যখন আমি এস এস সি পাশ করি,তখন আমার দুঃসম্পর্কীয় একজন ভগ্নিপতি জানতে চাইলেন ভবিষ্যতে আমি কী হতে চাই?আমি বেশ আত্নবিশ্বাসের সাথে বললাম, ” আমি ভবিষ্যতে একজন আদর্শ শিক্ষক হতে চাই।” তখন তিনি আমায় বললেন, কথায় আছে না? “যার নাই চাকুরি সে করে মাষ্টারি, আর যার নাই কোন গতি সে করে নাকি উকেলাতি।
” তিনি পেশায় ছিলেন একজন আইনজীবী। তাই সেদিন তার কথার অর্থ জানার বা পাল্টা প্রশ্ন করার সুযোগ না হলে ও মনে মনে ভাবতাম এমন একটি মহান পেশা সম্পর্কে মানুষের এমন ধারনা কেন?যাক এ সব প্রশ্নের জবাব পেতে আমার বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। যথারিতি আমি স্নাতক পাশ করার পর অন্য কোন চাকুরির জন্য চেষ্টা না করে একটি বেসরকারি এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করলাম।তখন অনেক হত দরিদ্র হতাশাগ্রস্ত শিক্ষক মহোদয়গণ তাঁদের হতাশার কথা জানাতেন এবং আমাদের মত নবীন শিক্ষকদের শিক্ষকতা পেশায় নিরোৎসাহিত করতেন।আরও দেখলাম মাধ্যমিক স্তরের নবীন এমপিওভুক্ত অধিকতর মেধাবী শিক্ষকগণ চাকুরি ছেড়ে এর ছেয়ে নিন্মতর বেতন স্কেলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কিংবা সরকারি তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী পদে যোগদান করতেছেন।জানতে চাইলে উনারা বলতেন, বেসরকারি এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুধু স্কেলটাই; অন্য কোন সুযোগ-সুবিধা নাই বললেই চলে;যেমন: বেসরকারিতে নাম মাত্র বাড়ি ভাড়া তৎকালিন১০০ টাকা ( বর্তমান তা ১০০০টাকা) অথচ সরকারি চাকুরেদের বাড়ি ভাড়া মুলবেতনের ৪৫%-৬০%।চিকিৎসা ভাতা ছিল না (বর্তমান তা ৫০০ টাকা), তা সরকারি চাকুরেদের ১৫০০ টাকা।তাদের সন্তানদের জন্য শিক্ষাভাতা, বৎসরে দুইটি মূলবেতনের সমপরিমান উৎসব বোনাস ;যা বেসরকরি শিক্ষকদের দেওয়া হয় মূলবেতনের২৫%, নববর্ষ ভাতা এবং তারা চাকুরি থেকে অবসর নিলে তাদের যোগ্য সন্তান থাকলে তাদের জন্য পোষ্য কোটাসহ আরও বহুবিদ সুযোগ-সুবিদা। সবচেয়ে দুঃখজনক হল সরকার বর্তমান পে-কমিশনকে স্থায়ী পে-কমিশন হিসেবে ঘোষানা দিয়েছনএবং সাথে বলেছেন,ভবিষ্যতে আর কোন পে-স্কেল দেয়া হবে না। সরকারি চাকুরেদের মূলবেতনের সাথে বার্ষিক চক্রবৃদ্ধিহারে মূলবেতনের ৫% প্রবৃদ্ধিযুক্ত হবে।ফলে ৫ বছরে তাদের বেতন বেড়ে দ্বিগুণ হবে।আর বেসরকারি এমপিওভূক্ত শিক্ষকগণের বেতন ভাতা হিসেবে যা দেওয়া হয় তা নিয়ে সন্তোষ্ট থাকা ছাড়া কোন উপায় নেই। একদিকে বেসরকারী এমপিও ভুক্ত শিক্ষকতার দিকে মেধাবীরা যেমন আকৃষ্ট হচ্ছে না; অপর দিকে যারা পরিস্থিতির কারণে হউক বা এ পেশার প্রতি আন্তরিক হয়ে হউক, যারা এসেছেন তারাও পালাতে ব্যস্ত।যার দরুণ, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তর ক্রমান্বয়ে মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে।যিনি জ্ঞানদান করবেন, তিনি যদি নিজেই জ্ঞানহীন বা মেধাশূন্য হন তাহলে তিনি মেধাবীদের মনের খোরাক যোগাবেন কি ভাবে?বর্তমান সরকারকে শিক্ষাবিদগণ শিক্ষাবান্ধব সরকার হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন।কারণ, এ সরকার শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য অত্যন্ত আন্তরিক। তাই সরকার সমসাময়িক বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য নতুন নতুন ক্যারিকুলাম সংযোজন করলেও তা বাস্তবায়সন করতে অধিকাংশ শিক্ষক অপারগ।এমতাবস্থায় নতুন নতুন ক্যারিকুলাম প্রয়োগের আগে শিক্ষগণকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।আর কোন কোন ক্ষেত্রে কিছু শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিলেও নিজেদের শিক্ষাগত ভিত দুর্বল হওয়ার কারণে অনেকেই তা হৃদয়ঙ্গম করতে ব্যার্থ হন।আবার যারা কিছু কিছু হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন,তাদেরকেও অভাবের তাড়নায় বিকল্প চিন্তা করতে হয়। তাই তাঁর অর্জিত জ্ঞান শ্রেণী কক্ষে যথাযত প্রয়োগে ব্যার্থ হন।ফলে সরকার তথা জাতি শিক্ষার কাংখিত সুফল ঘরে তুলতে পারছেন না।

এ শিক্ষকতার মহান পেশাটিকে সামাজিক ভাবে কতটা ছোট (!)করে রাখা হয়েছে তা একটি ঘটনার উল্লেখ করলে পাঠক বৃন্দ সহজে অনুধাবন করতে পারবেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আমি শিক্ষকতায় যোগদানের বছর দুই এক পরের কথা। একদিন টাকা উঠাতে যে ব্যাংক থেকে আমাদের বেতন ভাতা হয়; সে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখায় গেলাম।একজন শিক্ষকের সাথে ঐ শাখার একজন ব্যাংক অফিসারের কি একটা বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি হচ্ছিল।তখন শিক্ষক মহোদয় অফিসার সাহেবকে বললেন, “ওভাবে বলছেন কেন? আমি একজন শিক্ষক।
“তখন অফিসার সাহেব বললেন,”যাদের বেতনের জন্য পত্রিকার পাতার দিকে চেয়ে থাকতে হয়; তারাই আবার গলা উঁচু করে কথা বলে।”পাঠক সে দিনই আমি আমার ভগ্নিপতির কথার জবাব পেয়েছিলাম এবং বুঝতে পেরেছিলাম উকেলাতির গতি ফিরলেও বেসরকারী এমপিও ভুক্ত শিক্ষকদের গতি হয় তো এখনও ফিরেনি।

লোখক:- সিনিয়র শিক্ষক, আধুনগর আখতারিয়া দাখিল মাদ্রাসা, লোহাগাড়া।

( চলবে )

Top