তিন বই প্রেমির তিন উদ্যোগ

Ripon.jpg

তানভিরুল মিরাজ রিপন

১)

জীবনের জন্য বই নাকি বইয়ের জন্য জীবন। কথাটা আরো সহজ, প্রয়োজনীয় করে তুলতে গিয়ে কথাটা এভাবে বলা দরকার “বই কি জন্মের জন্য প্রয়োজন নাকি মৃত্যুকে জন্মের মতো আনন্দময় করে তুলতে প্রয়োজন।বই প্রতিজন মানুষের খুবই প্রয়োজন,বই জন্মকে আকাশের মতো সীমানাহীন করে তুলে, হ্যাঁ প্রথাগত,এবং ঐশ্বরিক নিয়মে আমি বিশ্বাস করি ও সবারই বিশ্বাস করতে হয় যে মৃত্যু বলতে কঠিন সত্য একটা নিয়ম  আছে,যে নিয়মের দ্বারা প্রতিটি প্রানের শেষ হয়।কিন্তু মৃত্যুর পর কি আমাদের সব শেষ হয়?শেষ বলতে কিছু আছে?একটু ভেঁবে দেখলে প্রতিটি শেষই, প্রতিটি ব্যর্থতাই (সবাই বাঁচতে চাই,কিন্তু মৃত্যুর সাথে লড়াই করে সবাই সর্ব প্রান পরাজিত হয়েই যাচ্ছে।এতে কিন্তু সবাই ব্যর্থ।) নতুন একটা কিছুর জন্ম দিয়ে যায়।মৃত্যু বা শেষ বলতে কিছু নেই।একটু যদি ভাবি, আদৌ মৃত্যু বলতে কিছু আছে কি?ভাবনার মতে, মৃত্যু বলতে কিছু নেই। কেনো নেই?মৃত্যু কি শুধুই একটি শব্দ?শব্দ নই,আমরা বেঁচে থাকি, যারা জন্ম নিবে তারা বেঁচে থাকবো।আশ্চর্য, এবং উদ্ভট কিছু বলেই যাচ্ছি। গড়গড় প্রলাপের মতো লাগলে ও আসলেই একটু ভেবে দেখুন,আমরা জন্ম গ্রহনের আগে অর্থাৎ মায়ের গর্ভে থাকা কালীন, পৃথিবীতে না আসার আগে মায়ের গর্ভে আমাদের একটি ভ্রুনীয় জন্ম হয়। পর্যায়ক্রমিকভাবে, আমরা দশ মাস দশদিন বা তার ও কম সময়ের একটা রক্ত মাংসে ও হাড়ে ঘেরা জীবন যাপন করি,সেবস্থা ও একটি জীবনকাল।সেই জীবনকালের শেষ হয় বা দশ মাস দশ দিনের জীবনের মৃত্যু ঘটে যখন আমরা আলোময় জগতে আসি অর্থাৎ পৃথিবীতে আসি। মায়ের গর্ভকালের মৃত্যু হওয়ার পর পর আবার জন্মহয় পৃথিবীতে।এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য আমাদের পৃথিবীর জীবন।একটা সময় পর আমাদের আলোকময় পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়।অর্থাৎ আমাদের মৃত্যু হয়, এরপর আমাদের কবরের জন্ম হয় যেটা দৈহিক নয় আত্মিক।এই আত্মিক জন্মের পর আমাদের এই পর্যায়টা শেষ করে আমাদের শেষ একটা বিচারের জন্য আরো একবার জন্ম হয় এরপর আমরা স্বর্গীয় সুখ বা নরকীয় দুঃখের মাধ্যমে আমাদের জীবন গুলো অশেষ থেকে যাবে।কিন্তু এই কয়েক পর্যায়ের  জন্ম মৃত্যুর মধ্যে আমাদের একটি পর্যায়ের জন্য একটা লোভ থেকে যায়। এই পৃথিবী তার নিজস্বতা নিয়ে অপরূপ সুন্দর।তাই এই পৃথিবী ছেড়ে কেউ যেতে চাইনা।এই নিয়ম করুণ,প্রানকে আঘাত করে কিন্তু আমাদের এই জীবন শেষ করে কবরের দিকে চলে যেতে হবে।

২)

বইয়ের সাথে জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়ানো।কারন বই মানুষকে বদলে দিতে পারে।যে মানুষ রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন বুনবে,অমানবিক,নৃশংস বা পৃথিবীর সব খারাপের দিকে ছুটে যাবে সে হঠাৎ বদলে যাবে,বদলে যায়।বই মানে জাদু।পৃথিবীর সব স্বপ্ন বুনে দেই একমাত্র বই।একটু শৈশব টেনে আনি, আমি যে গ্রামে জন্ম গ্রহন করি,সে গ্রাম অজপাড়া,অজপাড়া বলতে  গাড়ি নেই চলা ফেরার,নেই ভাল যথেষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।নেই রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ অবশ্য ননা থাকার বিশেষ একটা স্বার্থন্বেসী মহল এতোদিন করেছিল। মানুষ গুলো সুবিধাবঞ্চিত করে রেখেছিল।ভোগিয়েছে মৌলিক অধিকার বঞ্চিত, তার ওপর আবার স্বজনপ্রীতি, ধনীপ্রীতি,বাহুবলে ডর দেখিয়ে থমকে রাখতো গোটা এলাকার মানুষ গুলোকে।একেবারে বঙ্গোপসাগর এর কাছে-পাশে।বর্ষাকালের নান্দনিক সমুদ্রের রূপ যেমন আমি দেখেছি,ঠিক বঙ্গোপসাগর তেমন লোভাতুর ভাবে এক একটি প্রান কেঁড়ে নিতে দেখেছি,করেছে উদ্ভাস্তু কতোশতো মানুষকে।যে ঢেউ একজন মাকে বস্ত্রহীন,ঘরহীন,করেছে সে বঙ্গোপসাগর কে দিতে দেখেছি হাজার মানুষকে প্রান বাঁচাবার অবলম্বন।নিয়মিত খবরের কাগজ ছিল একটা স্বপ্নের আঁকা সবুজ মাঠে বাড়ি,অসম্ভব একটি কল্পনা যেটা বাস্তব হয়না,বই পড়ার অভ্যেস কেউ করতে দিতোনা।আমি শৈশব কাঁটিয়েছি আমাদের গ্রামে।বাবা শিক্ষক ছিলেন তবে আমি খুব ছোট বয়সে থাকা কালিন প্রয়াত হওয়ায় আমি হারাই আমার জীবনের সিংহপুরুষকে।কথা থেকে যায় বাবা থেকে সব কিছু পেয়ে থাকে, জীবন চলাকলা,জীবন বোধ,জীবন যুদ্ধ কোন কিছুর পাঠ আমি নিতে পারিনি।তারপর ও মা আমাদের গোটা পরিবার আগলে রেখে করেছেন প্রতিষ্ঠিত এবং আলোর পথযাত্রী।বই পড়া স্পৃহা খুবই ছিল,ঘরের পাশে বড় বাজার,আবার দুকদম পর স্কুল ও স্কুলের বিশাল মাঠ,কতো ছেড়া কাগজের টুকরো পড়ে থাকতো,সব মুদী দোকানের, বা খুলা চায়ের দোকানে ছোলা, বুট,বা ডালের বরা মাখিয়ে দিতো আর বাচ্চারা তা খেয়ে খেয়ে ওখানে সেখানে ফেলতো। আমি সারাবেলা পিড়াপিড়ি করতাম মাকে দুটা পয়সা পেতাম।আর এগুলো দিয়ে আমি দোকান থেকে এসব খোলা খাবার কিনে খেতাম।এবং কাগজ যেটি দিয়ে খাবার গুলো মুড়িয়ে দিতো সে কাগজটির পুরো লেখা গুলো পড়ে ফেলতাম,এবং মাঠে পড়ে থাকা কাগজগুলো ও কুড়িয়ে কুড়িয়ে পড়তাম।একসময় আমার বই, খবরের কাগজ ছিলনা,কিন্তু পড়ার স্পৃহা ছিল খুবই,আর এখন এসে আমার ঘর ভর্তি বই,প্রতিদিন পেপার ও পড়তে পারি।তবে গ্রামের ২০১৬ এর শেষের দিকে একটু পরিবর্তনের ছোয়া লেগেছে।-তার বিশেষ কারন হলো,একজন সফল সংস্কৃতি মনের মানুষ একজন দক্ষরাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধি। যে নিজেকে, নিজের সত্বাকে ভালবাসবেনা সে তো দুর্নীতিবাজ হবে।সংস্কৃতিমনা মানুষগুলো দেশকে সবার আগে, দেশের সংস্কৃতি কে ভালবাসে,তারা দুর্নীতিবাজ হয়না তার কারন হলো তারা গনমানুষের জন্য লড়ে ঠিক এতোটা বছর পর একজন বই পড়ুয়া, ও সংস্কৃতি মনের সফল রাজনীতিবিদ ও সংস্কৃতিকর্মী জনপ্রতিনিধি হয়েছে।ধলঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুল হাসান এর একটি ইন্টারভিউ এর জন্য আমি তার বাসায় গেলাম, যার ঘরভর্তি শুধু আলো,ঘর আলোকিত করার আলো নয়,জীবন পথের সবচেয়ে ফর্সা আলোই ভরা অর্থাৎ বই।যার ভাবনায় শুধু অবহেলিত মানুষগুলো নিয়ে স্বপ্ন ও কাটাকুটি খেলার মতোন একেবারে নিজ দ্বায়িত্বে, জনগনের পাশে থেকে উন্নয়নের পথে হাটছে।তার প্রধান উদ্দেশ্য তিনি বাস্তবায়ন করতেও পেরেছেন।তিনি এখন তার নেতৃত্বে জনগনেট মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে জনগনের কে সচেতন করে তুলেছেন যে সবুজ বনায়ন হলেই গ্রাম বাঁচবে তাই আমার যতোপারি পেরাবন এর যত্ন নিবো।এই উদ্যোগে তিনি খুব অল্পসময়ে সফল।এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে এলাকার মানুষকে উদ্ভুদ্ধ করেছেন।উদ্যোগ নিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ  এবং বঙ্গবন্ধু কে তাদের মন ও মস্তিষ্কে স্থাপন করে দেবার জন্য নিজ উদ্যোগে একটি লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করে দেবেন।যা অসচেতন মানুষের মনগুলোতে বাংলাদেশের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জন্মাতে সাহায্য করবে,এবং পথভ্রষ্ট নেতাদের চেনতে ও সাহায্য করবে।এদিক থেকে একজন বই পড়ুয়া নেতা,জনপ্রতিনিধি একটি ভূখন্ড কে সুকৌশলে জনগনকে সাথে নিয়ে উন্নয়ন করেন,এবং জনগন এদের ভালবাসেন।

৩)

কবিতার রাজপথ নামের একটি ম্যাগাজিন এর শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করি তাই বেশির ভাগ যাবার সুযোগ পেয়েছি।প্রায় ৮০ টা মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকের সাথে আমি বসার এবং একান্তভাবে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। আমারর প্রতিষ্ঠান (কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদার-প্রানের মিনার শহীদ মিনার,আসাদুজ্জামান এর জনক মুজিব) বই প্রায় ৮০ টা স্কুলে পাঠিয়েছিল। আমি ঐ বইগুলো নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলাম বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এমন ভাবে কথা বলেছেন যেনো আমরা বোম্ব পাঠিয়েছি বই না।বই পাঠিয়েছি দু মাস আগে, পার্সেলের মাধ্যমে বই গুলো পাঠিয়েছি।কোন কথা ছাড়া একটা প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়ে বই পাঠালো বই গুলো খুলে দেখি একটু পড়ে দেখি। না তা করেনি।শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর প্রধানদের এমন উদাস আচরন সত্যি জাতির জন্য ভয়ংকরতা ডেকে আনছে।এমন যদি হয় ভবিষ্যতেও বিপর্যয় ডেকে আনবে।শিক্ষার নামে জঙ্গীত্বপনা করার জন্য শিবির বা বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠন গুলো যেভাবে স্কুল গুলো টার্গেট করে বা প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে ছাত্র/ছাত্রীদের মগজ ধোলাই করতে পারার সুযোগ পায় এমন উদাসিনতা। জাতিসত্বার কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদার উত্থানের মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “ঈদগাহ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়” সকাল দশটা ত্রিশ মিনিটের দিকে পৌছুলাম।উদ্দেশ্য ২০ মিনিট কথা বলবো,আমার উদ্দেশ্য এবং কর্তব্যটা পূরন করে আসবো।আগে থেকে জানা ছিলনা স্কুলটির পরিবেশ বা স্কুলের অভ্যন্তরীন নিয়মকানুন গুলো কেমন।একটা দুটানার মাঝে থেকে গেলাম,স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা খুরশীদুল জান্নাত এর সাথে কথা বললাম,তিনি নিজের মতোন করে স্কুলটাকে সাজিয়েছেন কিন্তু সেই সাজানোটা আসলেই সবার মনকেঁড়ে নিবে।বিশাল শহীদ মিনার নির্মানের কথা শুনানেল।শুনালেন স্কুলের সফলতা,আমি বসে থেকে দেখেছি প্রতিজন অভিভাবকের সাথে কথা বলছেন কতোটা নমনীয় ভাবে।এবং তিনি স্কুলের এক সময়কার অভ্যন্তরীন বিশৃঙ্খলাকে একটা নিয়মের ভেতরে এনে প্রতিজন ছাত্র ছাত্রীর খবর নিচ্ছেন।এবং সেই সাথে তিনি এমন একটি সিদ্ধান্তে নিয়েছেন যে এবার থেকে তিনি প্রতিটা ছাত্র ছাত্রীকে বই পড়া অভ্যেস যেনো হয়ে যায়,বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রদান করা বই গুলো থেকে পরীক্ষার প্রশ্ন সম্পৃক্ত করবেন।এটা যে চমৎকার একটি উদ্যোগ যার ফলে প্রতিটা ছাত্র ছাত্রী বই গুলো পড়বে এবং মনোগঠন হবে তার সাথে প্রতিজন শিক্ষক ও ঐ বই গুলো পড়বে।একজন নারী যে দেশ, সমাজ,পরিবার বদলাতে পারেন চমৎকার এবং গ্রহনযোগ্য কিছু সিদ্ধান্তে তার সবচেয়ে উজ্জল একটি প্রমান বহন করেন তার এই সিদ্ধান্ত।

৪)

একজন সংস্কৃতি মননের, সাহিত্যপ্রেমী মানুষ একটি প্রতিষ্ঠানকে একটি শৃংঙ্খলের ভেতর নিয়ে এসে সাফল্যের উচু এবং অগনিত সোপানে আরোহন করাতে পারেন সুন্দর কিছু সিদ্ধান্তে।চকোরিয়া কেন্দ্রীয় উচ্চবিদ্যালয়ে এর প্রধান শিক্ষক মাহমুদুল হক তার শৈশব এর কথা টেনে এনে জীবনের সাফল্যের কথা তুলে ধরেছেন,বলেছেন বই পড়া খুবই জরুরী যতোক্ষন একজন মানুষ বই পড়বেনা ততক্ষন পর্যন্ত সে অসম্পূর্ন একটি দালান হয়ে থাকবে,যখন বই পড়বে সে দালানটি পরিপূর্নতা পাবে, পাবে রং ও। ঐ স্কুলের জায়গা সংকট খুবই,এবং স্থাপনা কম থাকায় গড়ে তুলতে পারছেন না একটি স্বপ্নের মতো সমৃদ্ধ লাইব্রেরী।এমন মানুষপ্রেমী মানুষগুলো মানবতা শেখেছে বই থেকে,এরাই আলোর মানুষ ছড়াবে যুগে যুগে যারা দেশ মাতৃকাকে বেওয়ারিশ এর হাতে তুলে দিবেনা।এমন মানুষগুলো, আলোক বাতি গুলো আগামীর বাংলাদেশে খুবই দরকার যারা মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির জনককে তুলে ধরবে সর্বপ্রানের সামনে।

বই ই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। আর বেঁচে থাকাই ভাল থাকা।

লেখক: তানভিরুল মিরাজ রিপন, কলামিস্ট, সিনিয়র আর জে রেডিওলাইভ বিডি।

Top