কক্সবাজার ভূমি অফিসে উমেদার নামধারী এরা কারা!

sadar-vomi.jpg

মোহাম্মদ শফিক, কক্সবাজার:
গোলাম হোছন কালু, পেশায় একজন কৃষক। নিজের প্রয়োজনে খতিয়ান তুলতে গেলেন সদর ভুমি অফিসে। এগিয়ে এলেন একজন উমেদার পদবিধারী যুবক। এদিক ওদিক না ভেবেই বললেন, খতিয়ান তুলতে দেড় হাজার টাকা চাই, পেয়ে যাবেন ১৫ দিনের মধ্যে। বেচারা কালু বিনয়ের সহিত জানতে চাইল, খতিয়ান তুলতে কয়টাকা লাগে? সরকারি ফি কত? জবাবে যুবক জানাল, “নির্দিষ্ট কোন টাকার সংখ্যা নেই। যার থেকে যা নিতে পারি। সরকরি ফি দিয়ে জীবনে খতিয়ানের দেখা মিলবে না। ভুমি অফিসে আসা-যাওয়া করতে পারবেন। মাগর খতিয়ান পাবেন না।” বেচারা এটেবিল- ওইটেবিল ঘুরে দেখলেন বিশ্বস্ত কাউকে মনে হল না। হতাশ হয়ে কোন উপায়ান্তর না দেখে ঘরে ফিরলেন কালু। খতিয়ান তো চাই, আর কি করার আছে। বাড়িতে তার আছে একটি ছাগল। সে ছাগলটি বিক্রি করে তার পরদিন ছুঁটলেন ভূমি অফিসে। ওই উমেদারকে দেড় হাজার টাকা দিয়েই দফারফা। পরে ১৫ দিনের জায়গায় ১মাসে মিলে খতিয়ান। এই হল কক্সবাজার ভূমি অফিসের হালচাল। অসহায় সেবাপ্রার্থী, অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতিবাজ উমেদার। এদের থামাবে কে?

সাধারণ মানুষের প্রশ্ন- সদর ভূমি অফিসে উমেদারনামধারী এরা করা? এদের পৃষ্টপোষক কে? অনুসন্ধানে জানা যায়, ভূমি অফিসের সরকার নিযুক্ত কোন কর্মচারী বা কর্মকর্তা নয় তারা। নিয়োগ প্রাপ্ত কেউ না হওয়া সত্বেও ভূমি অফিসে সরকারি ফাইলপত্র, দলিল-দস্তাবেজ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ সম্পাদন করে চলেছেন এরা দিনের পর দিন। অফিসের সমস্ত সুযোগ ব্যবহার করে সরকারি কর্মকর্তাদের ন্যায় দিব্যি অনৈতিক কাজ করে রাজার হালে চলছে এই উমেদার চক্র বছরের পর বছর। বহিরাগত হয়েও এতে তাদের অনেকে দাপট। এরাই যেনো অফিসের বস এবং তাদের ছাড়া অফিসের সব কাজ অচল। অবৈধ উমাদারের দখলে হয়ে যাওয়া সদর ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা মানুষের মাঝে ভোগান্তি-দুর্নীতি চরম পর্যায়ে পৌচেছে। এ নিয়ে সেবা প্রত্যাশীদের মধ্যে মিশ্র পতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

সদর ভূমি অফিস ও ইউনিয়ন ভূমি অফিস সরেজমিন ঘুরে দেখাযায়, বাহার ছাড়ার পান সাহাবুদ্দিন, সার্কেট হাউজ এলাকার আজিজ, মিঠাছড়ির জয়নাল, টেকপাড়ার সেলিম, খরুলিয়ার শহিদ, খুরুশকুলের সুজন, ছত্তার, ও উমেদার নিয়ন্ত্রক অফিস সহকারি জোবাইর রাসেল অধিনে, মো: ইকবালসহ প্রায় ১০/১৫ জন উমেদার সিন্ডিকেট অফিসে দিব্যি কাজ করে বেড়াচ্ছে। এছাড়া অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের টেবিলের উপর ফাইলপত্রের স্তুপ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দলিল দস্তাবেজ, পর্চাখতিয়ান। সরকারি এসব গুরুত্বপূর্ণ ফাইলপত্র দেখভাল করছে ওসব অবৈধ উমেদাররা। নাজিরের রুমেও এদের অবাধ বিচরণ। তাদরে দাপটে সেবাপ্রার্থীরাতো পিষ্ট হচ্ছে বটেই। খোদ বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছেন অফিসের অনেক সিনিয়র কর্মকর্তাও। এভাবে অফিসের প্রত্যেকটি দপ্তরে চলছে উমেদারের রাজত্ব। এতে অথিতে ভূমি অফিসে গায়েব হয়েছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথিও।

এসময় আরো দেখাযায়, উমেদারদের ঘিরে বিভিন্ন টেবিলে উদ্বিগ্ন মনে দাঁড়িয়ে আছে নিজ ফাইলের অগ্রগতি জানতে আসা সেবাপ্রত্যাশী অনেক লোকজন। যেন বালাই নেই নিয়ম-কানুনের। তাদের উৎপাতে খোদ অফিসের অনেক স্টাফও নাখোশ।

জমির খাজনা দিতে আসা মো: জামাল উদ্দিন বলেন, ঝিলংজা মৌজার জমির খাজনা দিতে গিয়ে সেখানেও ওমেদারদের খপ্পরে পড়তে হয়। তারা সরকারি নির্ধারিত ফি ছাড়াও বকসিশ নামের অতিরিক্ত অনৈতিক সুবিধা দাবি করে। না হয় নানা রকম আইনি জটিলতা দেখিয়ে হয়রানি করে। একই অভিযোগ একাধিক ভুক্তভোগীর।

জয়নাল, জাফর উল্লাহ, মিরকাশেম, সোলাইমানসহ অনেক ভুক্তভোগীরা জানান, ছৈয়দ নুর ভূমি অফিসের সহকারি তহসিলদার হলেও উমেদার পোষক এর শিক্ষক। তার অধিনে রয়েছে প্রায় ৩জন উমেদার। যিনি অন্যান্য ভূমি অফিসেও থাকা খালিন উমেদারদের লালন-পালন করে আসছিল। এতে বিভিন্ন পত্রিকার শিরুনামও হয়েছিল বির্তকিত এ ছৈয়দ নুর। এছাড়াও তিনি অনেক ভুক্তভোগিদের হুংকার দিয়ে বলে থাকেন, যে যায় বলুক আমাকে ঠেকাবে কে? তার নিকট আতœীয়-স্বজন সরকারি বড় বড় আমলা। এছাড়া সে স্থানীয়। তার খুঁটির জোর অনেক মজবুত। উপরের বসরাও নাকি তার অনৈতিক টাকার কাছে জিম্মি। এভাবে চাপাবাজি করে অবৈধ উমেদারদের পৃষ্ঠপোষক করছে এই মহাক্ষমতাধর ব্যক্তি। এছাড়া বলে তার পূর্ব পুরুষ জমিদার। সেই সুত্রে তিনিও জমিদার পরিবারের ছেলে। অতচ তার গ্রামের নিকট আতœীয়-স্বজনদের মতে তা সম্পূর্ণ বিপরিত। এক সময় ভূমি অফিসে পিয়ন পদে চাকুরি নিয়ে রাতা-রাতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ বনে যান। যা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখলে সব উঠে আসবে। ভুক্তভোগীরা আরো বলেন, ভূমি অফিসের আরেক উমেদার নিয়ন্ত্রক অফিস সহকারি আলোচিত জোবাইর রাসেল। যিনি সদর ভূমি অফিসটিকে দুর্নীতির বাসা বানিয়েছে। অফিস সহকারী হলেও থাকেন বিলাসবহুল বাড়িতে। চলেন নবাবী ধাচে। কিছু দিন সদর ভূমি অফিসে, পরে রামু ভূমি অফিসে। ওখানে পিছনের ইনকাম একটু ভাটা হওয়ায় নানা তদবির করে, পুনরায় মধুর হাঁড়িখ্যাত সদর অফিসে বহাল হয়ে শুরু করেছে টু-পাই। অফিস করে নিজের মর্জি মত, অনেকটা শশুড় বাড়ির ন্যায়। এ দুই ধুরন্ধর ছাড়াও আরো কয়েকজন অফিস সহকারি উমেদার পোষার কারণে, ভূমি অফিসে চলছে উমেদারের রাজত্ব।

অভিযোগ আছে, ভূমি অফিসে জনবলের অভাবের অজুহাত দেখিয়ে অসাধু ও দুর্নীতিবাজ কর্তাব্যক্তিরা ওই সব বহিরাগতদের অফিসে ঠাঁই দিয়ে তাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। জমি নিয়ে যেকোনো মামলা বা কাজ করতে হলে সংশিষ্ট লোকজনকে অনৈতিক চুক্তি করতে হচ্ছে জবাবদিহিতামুক্ত বহিরাগত ও উম্মেদারদের সাথে। ফলে হয়রানির শিকার হচ্ছে স্থানীয় লোকজন

কক্সবাজার সদরের কয়েকজন উপসহকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সদর উপজেলাসহ জেলার সব ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেও যোগসাজশেই যুগের পর যুগ চেয়ার-টেবিল নিয়ে উমাদাররা রাজত্ব চালাচ্ছেন। তাছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের রক্ষা করার জন্য উমেদার নিয়ে ঘুষ গ্রহণ থেকে শুরু করে অনেক অনৈতিক কাজের জন্য উমেদারকে জবাবদিহি করতে হয়না। তাঁরা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক সময় ওই সকল উমেদার’রা ক্ষেত্র বিশেষে ভূমিকর্তাদেরও কর্তা বনে যায়। প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা ভূমি মালিকদের জিম্মি করে পরগাছা পোষক উমেদার’রা সেবা প্রত্যাশীদের রক্তচুষকে পরিণত হয়েছে। তারা সরকারি ছুটির দিনেও অফিস খুলে মক্কেল ধরার কাজ করেন। এভাবে ভূমি অফিসের নিরাপত্তাও গোপনীয় তা হারাচ্ছে। তার পরও ভূমি কর্তারা তাদের টাকা কামানোর পাইপ-লাইন বন্ধ হয়ে যাবে, সে কারণে কর্তারা সময়-সুযোগ বুঝে ওমেদারদের সমীহ ও সমঝোতা হয়ে চলেন।

এ ব্যাপারে সদর ভূমি অফিসের অফিস সহকারি জোবাইার রাসেল বলেন, তিনি কোন ধরনের উমেদার নিয়ন্ত্রণ করে না। তার অধিনে কোন উমেদার নেই। উল্লেখিত অভিযোগুলো সর্ম্পূণ্য উদ্দেশ্য প্রনোদিত বলে দাবী করে।

সদর ভূমি অফিসের সহকারি তহসিলদার ছৈয়দ নুর জানান, তার অধীনে উমেদার নামধারী কেউ নেই। তিনি নিজেও উমেদারের দমনে কঠোর ভুমিকা রাখেছ। এছাড়া তার ব্যাপারে উপরে উল্লেখিত অন্যান্য অভিযোগ সর্ম্পূণ মিথ্যা বলে দাবি করেন।

সহকারি কমিশনার (ভূমি) পংকজ বড়–য়া জানান, ভূমি অফিসে সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তী এড়াতে তিনি নানা কর্মপ্লান তৈরি করেছেন। তার মধ্যে প্রথম কাজ হচ্ছে উমেদার মুক্ত করা। এছাড়া সরকারি স্টাফ কারা, সাধারণ মানুষ তা বুঝার জন্য অফিসের সরকারি ঝাঁড়োধার থেকে শুরু করে সবাইকে পরিচয়পত্রের আওতায় আনা হবে। ষীঘ্রই ওয়ান এস্টফ সার্ভিস চালু করা হবে। ভূমি অফিস সিসি ক্যামরা আওতায় আনা হবে। ভূমি অফিসের সরকারি কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী উমেদার নামধারী কাউকে সহযোগিতার সত্যতা মিললে তাদরে বিরুদ্ধে ব্যবস্থ্যা গ্রহণ করা হবেও বলে জানান এই কর্তা।

Top