আমাদের আশ্রয় কে দেবে?

Koros.jpg

বাবার লাশের জন্য হাসপাতাল মর্গের সামনে অপেক্ষমান চার সন্তান কাজল, সাজ্জাদ, কামরুল ও আসমাউল হুসনা।

ইমাম খাইর, সিবিএন:
একদিন আগেও আমাদের আব্বা ছিল। দুই দিন আগে কারাগারে আব্বার সাথে দেখা করে এসেছি। এখন থেকে আমরা এতিম। আমাদের আব্বা হঠাৎ না ফেরার দেশে চলে যাবেন -ভাবতে পারিনি। আব্বা স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন নি। কারা কর্তৃপক্ষ ও আইনজীবীর আবহেলার কারণে তিনি মারা গেছেন। এখন আমরা ঠিকানা, তরণীহীন। আমাদের আশ্রয় কে দেবে?
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুতকণ্ঠে কথাগুলো বলছিলো কক্সবাজার কারা হেফাজতে মৃর্যুবরণকারী মোহাম্মদ সোলতানের বড় ছেলে লুৎফুর রহমান কাজল। কাজলের বাড়ী কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল পালপাড়া এলাকায়।
সঙ্গে ছিলো কাজলের মা নূর আয়েশা, দুই ভাই মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসাইন, কামরুল হাসান ও একমাত্র বোন আসমাউল হুসনা। হাসপাতালের মর্গের সামনে অশ্রু ছেড়ে বাবার শোকের কথা বলছিলো সোলতানের ৪ সন্তান।
কাজল পেশায় কাঠমেস্ত্রি। অর্থদৈন্যতায় পড়ালেখা করতে পারেনি। বাবার সঙ্গে পরিবারের অন্ন যোগানে নেমে পড়ে ছোট কালেই। অন্য তিন ভাই-বোনকেও অর্থের অভাবে স্কুলে ভর্তি করাতে পারেনি। মা-বাবা ও চার ভাইবোনের সংসারটা কোন রকম চলছিল কাজলদের।
২৮ দিন আগে বাবা মোহাম্মদ সোলতান একটি মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন। মঙ্গলবার (১০ জানুয়ারী) রাতে কক্সবাজার জেলা কারাগারে তিনি মারা যান। রাত ১ টার দিকে সোলতানের মৃত্যুর সংবাদ স্বজনদের কানে পৌঁছে। বাবার শোক সংবাদ পেয়ে ঘুমন্ত সন্তানদের ঘুম ভেঙে যায়। তাদের শোর চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ-বাতাস। অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী নূর আয়েশা স্বামীর মৃত্যুর খবর সহজেই মেনে নিতে পারছিলেন না।
মৃত্যুর জন্য কারা কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে দায়ী করেছে স্বজনেরা। তবে অভিযোগের সিংহভাগই তাদের নিয়োজিত আইনজীবি মোহাম্মদ আলমের বিরুদ্ধে।
স্ত্রীর নূর আয়েশার অভিযোগ, আমার স্বামীকে জামিন করিয়ে দেবে বলে ২৬ হাজার টাকা দাবী করে আইনজীবি মোহাম্মদ আলম। তার বাড়ী আমাদের এলাকায়। আমরা গরীব। বিষয়টি তাকে বুঝিয়ে বলি। অবশেষে ২১ হাজার টাকা আদায় করে আমাদের কাছ থেকে। ৩ টি ধার্য তারিখে ‘হাজিরা ফিস’ নামে টাকা নেয়। আমার স্বামী আদালতে হাজির হলেও বিচারক হাজির নেই বলে তাকে চলে যেতে বলে। যথারীতি বিচারক কোর্ট করেন। আইনজীবীর মিথ্যা তথ্যের কারণে আমার স্বামীর বিরুদ্ধে ‘ওয়ারেন্ট’ ইস্যু হয়। পরবর্তী ধার্য তারিখ ২৬/১২/২০১৬ ইং। এদিন আসামী হাজির হলেও আইনজীবী হাজির নেই। অবশেষে তাকে কারাগারে যেতে হলো।
নূর আয়েশার আরো অভিযোগ করেন, আমার স্বামী খুবই অসুস্থ। তাকে উন্নত চিকিৎসার সুবির্ধার্থে ধার্য তারিখের আগে জামিন প্রার্থনা করার জন্য বললে উল্টো আমাদের সাথে অশালিন ব্যবহার করেন। এমন কী, যেদিন মারা গেলেন-সেদিনও আইনজীবীর শরণাপন্ন হয়ে কোন প্রতিকার পাইনি। মূলতঃ আইনজীবীর অবহেলায় আমার স্বামীর মৃত্যু হয়। তিনি আইনজীবী মোহাম্মদ আলেমের শাস্তি দাবী করেছেন।
মোহাম্মদ সোলতান খুরুশকুল পালপাড়া বাজারের দীর্ঘদিন পাহারাদার ছিলেন। ২০১৫ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি মামলায় তাকে ১ বছর সাজা দেয় ভ্রাম্যমান আদালত। এ মামলায় ৩ মাস কারাভোগ করে জামিনে বেরিয়ে আসেন সোলতান। আদালতেও হাজির ছিলেন। আইনজীবীর আবহেলায় তাকে কারা বরণ করতে হলো।
জেলা কারাগার থেকে মূমুর্ষ অবস্থায় মঙ্গলবার (১০ জানুয়ারী) রাত সোয়া ৯টার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আনা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
কক্সবাজার জেল সুপার মোহাম্মদ বজলুর রশীদ আখন্দ মৃত্যুর বিষয়টি খুবই দুঃখজনক জানিয়ে বলেন, সোলতানের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে আমাদের আগে অবগত করানো হয়নি। কারা চিকিৎসক কিংবা আদালতের নির্দেশনা পেলেই আমরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতাম।
এদিকে মোহাম্মদ সোলতানের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার (১১ জানুয়ারী) বিকালে স্বজনের কাছে হস্তান্তর করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। একই দিন বাদে আসর খুরুশকুল মামুন জামে মসজিদ মাঠে নামাজে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়। এতে স্থানীয় সমাজসেবক সাইফুল্লাহ নূর, মোহাম্মদ নূর কোম্পানী, মুহাম্মদ রাজু, মোহাম্মদ ইমরান, আলম মাঝিসহ মান্যগন্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

Top